নারীমুক্তি !

শনিবার , ২ নভেম্বর, ২০১৯ at ৫:১১ পূর্বাহ্ণ
74

এক
২০১৮’র মাঝামাঝিতে পৃথিবী নড়েচড়ে বসে দুর্দান্ত এক খবরের সূত্র ধরে। নবীজীর দেশের মাতা কন্যা ভগ্নিগণ মক্কা মদিনার রাজপথে গাড়ী হাঁকিয়ে চলছে। সারা পৃথিবীতে বয়ে যাচ্ছে আনন্দের বন্যা। নারীমুক্তির পথে বিশাল মাইলফলক স্থাপিত হোল বলে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ঝড়। মুক্ত নারীদের চালকের আসনে বসা রঙিন ছবিতে সয়লাব খবরের কাগজ, টেলিভিশনের পর্দা। বিপ্লব ঘটে গেছে ইথারে ইথারে। বাহবা লুটছেন বিপ্লবের নায়ক যুবরাজ, ভবিষ্যৎ সৌদি বাদশাহ। ইতিহাস কেউ মনে রাখেনা; চৌদ্দশ বছর আগেই যে মা আয়েশা ঘোড়া হাঁকিয়ে চলতেন মদিনার পথে প্রান্তরে, উট ছুটিয়ে অংশ নিতেন সম্মুখ সমরে।
সড়কে মহাসড়কে গাড়ী চালিয়ে সভ্যতার উন্নয়নে নিঃসন্দেহে অনেক অবদান রাখবেন এইসব নারীসকল। ঘরের বাইরে কাজে যাবার জন্য বাবা, ভাই, স্বামী কিংবা পুত্রের হাতে পায়ে ধরতে হবেনা। কর্মজীবী নারীদের জন্য এ এক বিরাট আশীর্বাদ। গৌরবের বিষয় নিঃসন্দেহে। ধীরে ধীরে নতুন কতকী যোগ হয়েছে তাদের প্রাপ্তির খাতায়! প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে চলচ্চিত্র উপভোগ, নৈশক্লাবে আনন্দ উল্লাসের অধিকার……
প্রশ্ন হচ্ছে, কত শতাংশ নারী এই গৌরবের অংশীদার? তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে যেমন নগরে নগরে অগুনতি আকাশ ছোঁয়া ঘরবাড়ি, বিপণিবিতান, যত্রতত্র আলোকসজ্জা, সড়ক, মহাসড়ক আর উড়াল সড়কে বিদেশ থেকে আমদানি করা চকচকে গাড়ী, নদীর দুই কিনার এক করে দেওয়া সেতু উন্নয়নের বারতা নিয়ে আসে। প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এই উন্নয়নের অংশীদার হওয়া তো দূরে থাক, ওরা জানেইনা আলাদিনের চেরাগের জাদুর মতো কত কি ঘটে যায় দূরের শহরে। উন্নয়নের নামে বলিদান হয় হাজার হাজার তরুণ প্রাণ। সৌদি নারীদের এই কাগুজে মুক্তিও কি তেমন কিছু? মরুভুমির বেদুইনদের কথা না হয় বাদ দেই। আলো ঝলমল শহরে ধনকুবেরদের প্রাসাদসম বাড়িতে কন্যা জায়া মাতা ভগ্নি নানান পরিচয় নিয়ে বসবাস করেন নারীসকল। আমার বঙ্গদেশ থেকে গৃহকর্মী হিসেবে যান শত শত হাজার হাজার নারী। ওঁদের সবার কাছে কি পৌঁছেছে সে আনন্দ বার্তা?
রাজপরিবারের জনাকয় রাজকুমারী, হাতে গোনা কজন ধনকুবের তনয়া এই সুযোগ আর অধিকার উপভোগ করেন। অনেকে এই সুযোগের অপব্যবহারও করেন, তেজপাতার মতো করে বাতাসে উড়িয়ে দেন রিয়াল, দিনার-কি ডলার, পাউণ্ড। শুধু কি তাই? গাড়ী চালিয়ে পৃথিবী উদ্ধার করে বাড়ী ফিরে আসার পর মুক্ত সৌদি নারীদের অনেকে অবলীলায় চড়াও হন গৃহকর্মির উপর। তাঁদের শিক্ষা, সংস্কার, মূল্যবোধ গাড়ীতেই বন্দি করে রেখে আসেন। স্বামী কিংবা সন্তানের অপকর্ম, আর বীভৎস রূপ ঢেকে দিয়ে খড়গ চালান অসহায় রমণীর উপর। কখনও বরখাস্ত করেন, কখনওবা নতুন মাত্রায় নির্যাতন করেন। বুক কাঁপেনা ঐ মুক্ত নারীদের।
দুই
সৌদি নারী দেশের রাজপথে গাড়ী হাঁকানোর অনুমতি পান যে সপ্তাহে, সেই সপ্তাহেই শত শত নারীকে আকাশ পাড়ি দিয়ে পালিয়ে আসতে হয়েছিল ঐ মৃত্যু উপত্যকা থেকে, যেখানে একদিন পাড়ি দিয়েছিল ওরা ভাগ্য বদলের আশায়, সর্বস্ব ছেড়েছুঁড়ে। আফসোস, অগুনতি বঙ্গনারী আছেন এই দুর্ভাগাদের দলে। ঢাকা বিমানবন্দরে ওদের মুখমণ্ডলের ঝাপসা ছবি ছাপিয়ে ন্যূনতম সম্মান প্রদর্শন করেন কাগজওয়ালারা। ওদের দুর্ভোগের ফিরিস্তি প্রকাশ করেন। চোখে পানি রাখা দায় পাঠক সকলের। যে মুহূর্তে ‘আগমন’ ফটক দিয়ে দিয়ে দেশে ফিরে আসে সর্বস্ব খুইয়ে আসা গুটি কয় নারী, সেই মুহূর্তেই ‘বহির্গমন’ দরজা দিয়ে অজানার পথে দেশের সীমানা ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে অনেকে। দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটে বারবার। তবু শিক্ষা হয়না, বদলায়না কিছু, শেষ হয়না কাগজের ঝাপসা ছবি আর কান্নার গল্প। তবুও চলে নারীমুক্তির নামে আস্ফালন।
প্রাণহীন যেসব মেয়ে ফিরে আসে দেশের মাটিতে, তাদের কথা বলে আর কী হবে? খুলনার মেয়ে আবিরন বোনদের পড়াতে আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে পাড়ি জমিয়েছিল নবীর দেশে। সাতসাতটি মাস হাসপাতালের মর্গে থেকে সম্প্রতি ফিরে এসেছে দেশের বুকে। চকচকে পালিশ করা কফিন দেখে মনে হতে পারে ভেতরে বোধহয় কোন রাজকুমারী ঘুমিয়ে আছে। এমন কত শত আবিরনের গল্প ফুরিয়ে যায় এভাবে! আমাদের এতো খবরে কাজ নেই। আমরা কেবল জয়োধ্বনি করেই যাব; নারীবাদের নামে কখনও বেগুনি, কখনও গোলাপি পোশাকে সজ্জিত হয়ে সভা সমিতির সৌন্দর্য বর্ধন করে যাবেন মুক্ত নারীগণ। জগতের সবটুকু আলো এসে পড়বে তাঁদের ওপর। ঐসব আবিরন, করিমন, নসিমনদের কথা তাই না ভাবলেও চলে যায় আমাদের।

তিন
মরুর বুকে জন্ম নিয়েছিল এক নাইটিংগেল। একুশ/বাইশ বছর আগে। রাজন তার নাম। হাজারো মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছিল সে চিকিৎসা ও সেবা দিয়ে। সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তি বাঁচতে দেয়নি রাজনকে।
ইটের ভাটায় কাজ করে ছেলেকে পড়িয়ে যাচ্ছেন রাজশাহীর পুঠিয়ার নওপাড়া গ্রামের মা হাজেরা বেগম। গায়ে দেবার মতো একটাই জামা ছেলের, কিনে দিয়েছিলেন মা বছর পাঁচেক আগে। এই মা হাজেরা মরুর বুকের সেই মায়ের কথা মনে করিয়ে দেয়না, শিশুপুত্র ইসমাইলকে বাঁচাতে যিনি সাফা আর মারওয়া পর্বতে ছুটেছিলেন দু হাজার বছর আগে?
তিব্বতের পাহাড়ি গ্রামে মায়েদের ঘুম ভাঙে চড়ুই পাখির কিচির মিচিরে। মাইল খানেক পাহাড়ি আঁকাবাঁকা উঁচানিচা পথ হেঁটে পাথুরে নদী থেকে পরিবারের জন্য পানি বহন করে আনেন। ঘরকন্না সামলান, সন্তান স্বামীর দেখভাল করেন, খামারের গরু, ঘোড়া, শুকরের যত্ন নেন। নিজের দিকে ফিরে তাকানোর ফুরসত মেলেনা সেই নারীদের। রানি এলিজাবেথের নাতবৌ কেট মিডলটন আর মেগান মার্কেল কি আরও ভাল মা?
আফ্রিকার ঘানায় একবিংশ শতকেও আছে কিশোরী বলিদান। পরিবারের সুখ শান্তি আর রোগমুক্তির জন্য ঈশ্বরের বউ হয়ে জীবন কাটাতে হয় তাদের। পুরুত মশাইদের উপর যখন তখন ভর করেন সেই ঈশ্বর। ওঁদের সেবা দিতে দিতে বালিকা থেকে বৃদ্ধা বনে গিয়ে সার্থকতা খুঁজে পান ঈশ্বর পত্নীগণ।
পশ্চিমা সভ্যতা নিষিদ্ধ করার নামে নাইজেরিয়াতে তাণ্ডব চালাচ্ছে বোকো হারেম নামের নব্য প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী। হায়, যত ক্ষোভ ওদের নারীজাতির উপর। খেয়ালখুশি মতো ওদের ভোগদখল করবে ধর্মনেতারা, কেবল ওরা কিছু করতে পারবেনা খেয়ালখুশি মতো। বিশ্বমোড়লদের কেউতো ওদের থামাতে পারেনা।
সাহারা মরুভুমিতে বেদুইন নারীরা পোশাক পাল্টানোর চেয়ে বেশী পাল্টান ঘর। তাঁবু থেকে তাঁবু, যেতে যেতে ফুরিয়ে যায় জীবন। সে জীবনেও হাসি থাকে, থাকে গান। মায়ের মেয়ে, মেয়ের মেয়ে, তার মেয়েরও একই জীবন, একই ইতিহাস। মুক্তির কথা বলেনা ওরা। সীমানার ওপারে বড় পৃথিবী নিয়ে বড় ভয় ওদের। সভ্যতার নামে সেখানে বিস্তার লাভ করছে প্রতিহিংসা, জিঘাংসা, দানবীয় পাশবিকতা।

x