দেশ হতে দেশান্তরে

সেলিম সোলায়মান

রবিবার , ২৬ মে, ২০১৯ at ১০:২৯ পূর্বাহ্ণ

রোমান্টিকতার বিড়ম্বনা : ড্রেসিং রুমে রাখা ছিল সুটকেসটা আমার। ওখানেই বসে ঐটি গোছানোর কাজ শুরু করবো ভাবছি যখন, তখন রুম থেকে ভেসে এলো লাজুর গলা। রুমে বসে সুটকেস গোছাতে গোছাতে বলল,
“আমি তো বুঝলাম না, কি বেআইনি চিঠি নিয়ে কথা বলছিল দীপ্র”?
ও কিছু না। হোটেল থেকে একটা চিঠি দিয়েছে আমাদের রুমগুলোতে। যদিও আমার ধারনা ঐ চিঠি, যে সব রুমে গেস্ট আছে সবাই পেয়েছে। চিঠিতে, তারা বলেছে সবাই যেন আগামিকাল দশটার আগেই রুম খালি করে দেয়; কারণ এখানে একটা সরকারি অনুষ্ঠান হবে। তাই সরকার থেকে তারা এরকম আদেশ পেয়েছে।
“আমরা তো তার আগেই চলে যাবো’ বলল লাজ-তা তো যাবই, কিন্তু দীপ্রর পয়েন্ট সেটা না, তার কথা হলো নিয়মমাফিক তো হোটেল কাউকে বারোটার আগে রুম ছাড়তে বলতে পারে না। আর যদি বলে, তবে তা হবে বেআইনি। আর এই হোটেল সে কাজটিই করেছে । যুক্তি কিন্তু দীপ্রর ঠিকই আছে । এছাড়া দেখলাম চিঠির ভাষাটাও কেমন যেন কাঠখোট্টা, অনেকটা আদেশ জারি করার মতো । বুঝতে পারছি না, এটা কি তাদের ইংরেজির দৌড় কম বলেই হলো, নাকি ওরা যেভাবে সরাকারি আদেশ পেয়েছে, সেটাই তারা হোটেলের প্যাডে ছাপিয়ে, আমাদের উপর চাপিয়ে দিল, তড়িঘড়ি। সব দেশেরই সরকারি চিঠি কি একই রকম নাকি? কে জানে! আমাদের দেশের সরকারি অফিস শুধু আদেশই জারি করে সব সময় । যদিও বক্তৃতা বিবৃতি দেয়ার সময় ঘোরতর নাক উঁচু আমলাও গলা কাঁপিয়ে বলে, আমরা জনগণের সেবক , কিন্তু কাজের বেলায় তো নিপীড়ক ও খাদক। আর চিঠির বেলায় তো ওরা, এক্কেবারে সমনক; মানে সমন জারি করা লোক । মনে আছে একবার, আমি ছাত্র থাকা অবস্থায় বি সি এস বাদে, যে আর একটিমাত্র সরকারি অফিসে চাকুরির আবেদন করেছিলাম সেটি ছিল টি বোর্ড । ওখানে আবেদন করার কারণ ছিল, পদটির নাম। যেটি ছিল বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ।
মনের কোন গহীন কনে বৈজ্ঞানিক হবার বাসনা লুকিয়ে ছিল হয়তো বা; তাই পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখেই আবেদন করে দিয়েছিলাম, সেখানে। মানে টি বোর্ডে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, পদের জন্য আবেদন করেছিলাম। যদিও জানতাম না টি বোর্ডে বা আমাদের নানান সরকারি সংস্থার বৈজ্ঞানিকেরা কি আবিষ্কারের কাজ করে, বা করেছে আবিষ্কার তখন পর্যন্ত । তবে ভেবেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার আগেই যদি আমি চাকরিটি পেয়ে যাই, তবে তিনটি লাভ আমার। প্রথমত, ততদিনে অবসরে যাওয়া আব্বাসহ গোটা পরিবারের জন্য তা হবে স্বস্তির ব্যাপার । দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করলে, বিশেষত আমার বিষয়ের মত , ম্যাড়ম্যাড়ে বিষয় থেকে; তবে বছরের পর বছর বেকার থাকতে হবে বলে যে প্রথাগত ধারণা আছে, সেটিকে ভুল প্রমাণ করতে পারি। আর তৃতীয়ত, এ পর্যন্ত সরকারি বৈজ্ঞানিকেরা কিছু আবিষ্কার করতে পারুক না পারুক, আমি যুগান্তকারী কিছু না কিছু একটা আবিষ্কার করে, বাংলার দ্বিতীয় জগদীশচন্দ্র হয়ে উঠবোই, উঠবো।
কিন্তু সন্দেহ ছিল, তারা আমার আবেদন গ্রহণ করে কি না, তা নিয়ে। কারণ আমার তখনো মাস্টার্স পরীক্ষার মাত্র লিখিত অংশ দেয়া হয়েছে। আর পদটির জন্য তারা চেয়েছে স্নাতকোত্তর ডিগ্রির প্রার্থী। তারপরও কি মনে করে যেন আবেদন করে ফেলেছিলাম। সে যাক, চা বোর্ডে অসিম দয়ায়, আমার আবেদন গৃহীত হয়েছিল। অতএব আমাকে তারা মৌখিক পরীক্ষায় হাজির হবার জন্য একটা কড়া নির্দেশ জারি করে চিঠি ইস্যু করেছিল। হলে বসে ঐ চিঠি পেয়ে প্রথমে বেশ আনন্দিত হলেও , চিঠি পড়ে মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল আমার ভীষণ! ভাবছিলাম, আমি তো এখনো চাকরি নিয়ে চাকর হইনি, তুমি বেটা কে হে আমাকে আদেশ দেবার ? যাবই না শালা, মৌখিক পরীক্ষা দিতে, দেখি তোমার অমন কড়া আদশের কি হয় । আসলে রোমান্টিক সময় তো ছিল ওটা ।
এতগুলো কথা বললাম, যাতে আমার দিয়াঞ্চি লেইকে রাতে যাওয়া নিয়ে , লাজুর মনে যে অহেতুক ক্ষোভ টি জমে আছে সে ই তখন থেকে, তা যেন হালকা হয়ে যায় । কিন্তু অতি উৎসাহে বেশী কথা বলতে গিয়ে পড়লাম আবার ঝামেলায় শেষ বাক্যটির দ্বিতীয় পদ, “রোমান্টিক” শব্দ নিয়ে
“ওহ তাই নাকি রোমান্টিক ছিলা তখন! তা কার কার সাথে প্রেম করলা তখন, তা তো বলোনি কখনো । এতদিন পর হঠাৎ বেরিয়ে গেল সেই গোপন কথা। তা কোথায় আছে তোমার সেই প্রেমিকারা । যোগাযোগ আছে নাকি এখনো তাদের সাথে ? আমার সাথে কোনদিন সামান্যতম কোন রোমান্টিকতা করতে দেখি নাই এতদিনেও”। একটানা বলে গেল লাজু তীব্র শ্লেষ নাকি অভিমানে ঠাহর করতে পারলাম না। অবশ্য ঠাহর করার মতো অবস্থায়ই তো ছিল না আমার মনে । আমি তখন ব্যস্ত প্রাণপন অবস্থা যাতে আর গুরুতর দিকে মোড় না নেয় তা নিয়ে।
নিজেকে নিজেই ঝেড়ে গালি দিলাম, ঐ “রোমান্টিক” শব্দ উচ্চারন করার জন্য; যখন নিজেই জানি যে “রোমান্টিক” শব্দটি নিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের বদ্ধমূল ধারনা হলো, বাস্তব জীবনে এ হলো কিশোর কিশোরী, ত্রুন তরুণীদের লুকিয়ে লুকিয়ে স্কুল কলেজ পালিয়ে, সিনেমা দেখা, বাদাম খাওয়া বা কোন ঝোপঝাড়ের আড়ালে বসে লুতুপুতু প্রেম করা , মানে এক আধটু জড়িয়ে টরিয়ে ধরা, চকিতে চুমু খাওয়া ইত্যাদি। আর রোমান্টিক বাংলা সিনেমার মানে হলো, সে সিনেমা যেটিতে এক নায়ক কম পক্ষে দুই নায়িকা নিয়ে ক্ষনে ক্ষনে নাচ গান করে, জড়াজড়ি করে । আর নাচ গান বাদে বাকী সময়টায় নায়ক ভিলেনের সাথে মারপিট করে বা হুমকির পাল্টা ধামকি নিয়ে ব্যস্ত থাকে।
অতএব এখনি দ্রুত ব্যাপারটাকে ঠিক না করলে কতদিন এর জের থাকে, তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। বললাম এই শব্দটা নিয়ে এই এক যন্ত্রনা দেখি। যখনই কাউকে বলি এটা, তখনই সবাই মনে করে আমি বুঝি কোন লুতুপুতু প্রেমকাহিনীর অবতারনা করতে যাচ্ছি। কেউ বুঝতে চায় না যে এর মানে অনেক ব্যাপক। আমার কাছে এর সোজা মানে হলো স্বাপ্নিক মানুষ। আর সে জন্য রোমিও বা মজনু বা ফরহাদ কে আমি রোমান্টিক পুরুষ মনে করি না মোটেই। আমার কাছে পৃথিবীর সেরা রোমান্টিক পুরুষ হলো চে গুয়েভারা, আর সেরা রোমান্টিক বাঙালি হলেন বংগবন্ধু । এছাড়া তুমি যেমন আমার মধ্যে রোমান্টিকতার রঙ ও খুঁজে পাও নি এতদিনে, তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে, অন্য কেউ আমার মধ্যে তা পায়নি খুঁজে কখনো। তার উপর বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি ছিলাম খ্যাংরা কাঠি চেহারা শুন্য পকেটের ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়ানো একজন। এখনকার মেয়েদের কথা জানি না, তখন অন্তত মেয়েরা আমার মতো শুন্য পকেটের খ্যাংরা কাঠি ভূতের সাথে প্রেম করার মতো বোকা ছিল না।
নাহ , বুঝলাম না কাজ হলো কিনা রোমান্টিকতা নিয়ে আমার বয়ানে। কারণ অনেকটা স্বগতোক্তির মতো লাজু বলল
“যাক যাক হয়েছে , আর বোঝাতে হবে না আমাকে । দীপ্র হয়েছে, তা হলে হয়েছে যুক্তিবাদি বাপ কা বেটা “। তারপরই জারি হল আদেশ -“এই শোন সুটকেস গোছাতে গিয়ে দলা মোচড়া করে কাপড় ঢুকিও না, তুমি তো তাই করো । এরকম করলে জায়গা হবে না সুটকেসে । এখানকার দেয়া ফলগুলোর কিছু তোমার সুটকেসে ও নিতে হবে “
হাফ ছেড়ে বাঁচলাম এতে। কারণ বোঝা গেল যে বেকুবের মতো আমার“রোমান্টিক” শব্দ ব্যবহার নিয়ে যে আসন্ন ঝড়ের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল কেটে গেছে তা। কিন্তু এক মহাবিপদ থেকে রক্ষা পেতে না পেতেই , গাড়লের মতো আবারো মহা ভুল করে প্রায় বলতে যাচ্ছিলাম মুখ ফস্কে, আমার সুটকেস তো সবসময় আমিই গোছাই , অতএব ওটা নিয়ে চিন্তা না করে, নিজেরটা গোছাও । কপাল ভাল, অবচেতন মন আমাকে রক্ষা করলো ভয়াবহ ঐ দুর্যোগ থেকে। বললাম,
ঠিক আছে, শীতের কাপড় আর ক্যাজুয়াল কাপড় ভাজ করা তেমন জটিল কিছু না। অফিসিয়াল শার্ট প্যান্ট , সুট কোট , তাই ওগুলোকে ভাজ করতে হলে তো এতক্ষনে বিছানায় বসেই ওগুলো করতে হতো, তারপরও ঠিক করতে পারতাম না । এখন তো সে ঝামেলা নাই । তার উপর আজ যে গুলো গায়ে দিয়েছি ঐ কাপড়গুলো তো ঢোকাবোই না, কারণ কাল এগুলিই পড়ে যাবো । এছাড়া বাড়তি কিছু গরম কাপড় বের করেও গায়ে দিয়ে নিতে হবে, কারণ বেইজিং এ কিন্তু ঠাণ্ডা প্রচণ্ড। তুমিও, বের করে রেখ বাড়তি গরম কাপড় , দীপ্র অভ্র আর তোমার জন্য । হয় সে কাপড়গুলো এই হোটেল থেকেই পড়ে যাবে, না হয় হাতে বা হাতের ব্যাগে রাখতে হবে , যাতে বেইজিং এয়ারপোর্ট থেকে বেরুবার আগে পড়ে নিতে পারো সবাই । অতএব ফলের জন্য জায়গা যথেষ্টই থাকবে সুটকেসে।
ও পাশ থেকে আর কোন কথা শোনা গেলো না, আমার মন্তব্যের জবাবে । ধরে নিলাম মৌনতা সম্মতির লক্ষন , যদিও সেটাও মোটামুটি বিরল ঘটনাই । হয়তো, গোছগাছে খুব বেশী মনোযোগী হয়ে পড়ায় উত্তর দেবার ফুরসৎ পাচ্ছে না লাজু । এদিকে আমার সুটকেস খুলে দেখলাম , এ কয়দিন যে, হোটেলের দেয়া স্যাম্পু, লোশন, কন্ডিশনার আর সাবান গুলো কোন মতে সুটকেসের ডালা ফাঁক করে ঢুকিয়ে দিয়েছি প্রতিদিন, সে গুলো মনে হলো গোটা সুটকেসেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, সুটকেসের তলার দিকে । আর কিছু কিছু গোপনে মনে হলো জায়গা করে নিয়েছে নানান কাপড়ের ভাজে আর ফাঁকে। কারণ ঢুকানোর সময় তো, তড়িঘড়ি ওগুলোকে কোন মতে ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম।
এখন এগুলোকে, বিশেষত শ্যাম্পু, কন্ডিশনার আর লোশন গুলোকে, একটা পলিথিনের প্যাকেটে ঢুকিয়ে মুখ বেঁধে, তারপর রাখতে হবে সুটকেসে; না হয় ওগুলোর যে কোনটা থেকে থেকে ঘন তরল পদার্থ সব বের হয়ে, যাচ্ছে তাই করে ফেলবে ভেতরের কাপড় চোপড়ের অবস্থা। এ হয় আমার সবসময়ই। মানে হোটেল থেকে চেক আউট করার আগের রাতে সুটকেস গোছানোর সময় প্রতিবারই পড়ি এ ঝামেলায়। প্রতিবারই শেষ মুহূর্তে কপাল কুঁচকে সুটকেসের নানা কোনা কাঞ্চি থেকে হোটেলের দেয়া এই সব টয়লেট্রিজ, খুঁজে বের করে পলিথিনের নিরাপত্তায় প্যাক করতে করতে ভাবি পরের বার রাখার সময়ই ওগুলোকে ওভাবে গুছিয়ে রাখবো; যাতে শেষদিন সুটকেস প্যাক করার সময় এ রকম ঝক্কিতে না পড়তে হয়। কিন্তু পরেরবার সেটা ভুলে যাই যথারীতি, ব্যস্ততার কারনে নাকি বদভ্যাসের কারনে তা জানি না। অতএব আমার এ বিষয়ে আমার প্রতিজ্ঞা করা আর প্রতিজ্ঞা ভাঙ্গার ব্যাপারটি ঘটতে থাকে চক্রাকারেই ।
ফলস্বরূপ এই মুহূর্তেও পড়লাম সেই একই যন্ত্রণায়। এদিকে মনে করেছিলাম যে, ক্যাজুয়াল সব কাপড় চোপড় , আর শীতের গরম কাপড়, ওগুলোর ইস্ত্রি ঠিক রাখার তেমন ঝুট ঝামেলা নাই যেহেতু, সেহেতু দ্রুতই হয়ে যাবে সুটকেস গোছানোর কাজ। তারপর দাঁত টাত মেজে সোজা গাঁ এলিয়ে দেবো বিছানায় । তা ঘুম আসুক আর না আসুক। কিন্তু অতো দ্রুত তা তো হবার নয় দেখছি! কারণ এখন কাপড় চোপড় সব নামিয়ে, কোথায় কোন ভাজে বা কোন কোনায় পড়ে আছে স্যাম্পু , লোশন বা কন্ডিশনারের ছোট্ট বোতল একটা, একটা একটা করে তা খুঁজে বের করে, ঢোকাতে হবে একটা পলিথিন ব্যাগে, তারপর গোছাতে হবে কাপড় । এটা মনে হতেই আবার বিরক্তি চেপে বসলো মনে। লেখক : প্রাবন্ধিক ও সংগঠক

x