দূরের টানে বাহির পানে

হাসান আকবর

বুধবার , ৩ জুলাই, ২০১৯ at ৫:১৮ পূর্বাহ্ণ
41

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
কায়রো শহরের নানা পথ মাড়িয়ে আমাদের বাস হাজির হলো আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে। শহরের কিছুটা বাইরে সুউচ্চ দেয়াল ঘেরা একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বহুদিন ধরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম শুনে আসছি। অন্তত এক হাজার বছর ধরে পৃথিবীতে আলো ছড়ানো সেরা একটি বিদ্যাপীঠ। ইসলামি জগতের বহুল প্রত্যাশার এই শিক্ষাঙ্গনে দুনিয়ার মেধাবী ছাত্ররাই কেবল পড়ার সুযোগ পান। পান গবেষণার সুযোগ। এই বিদ্যাপীঠের ছাত্র সংখ্যা নাকি প্রায় চৌদ্দ লাখ।
কায়রো শহরের হোসাইনিয়্যাহ এলাকায় অবস্থিত আল আযহার। এলাকাটির নামকরণ করা হয়েছে হযরত ইমাম হোসাইন রাদিয়াল্লাহু তালা আনহুর নামের সাথে মিল রেখে। জামেউল আযহারের অপর পার্শ্বেই জামেউল হুসাইন নামে একটি মসজিদও রয়েছে। রাস্তার পাশেই রয়েছে আল্‌-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের আদি ও প্রধান ক্যাম্পাস এবং মসজিদুল আযহার। এই মসজিদ আযহারকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে পৃথিবীর এই প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়।
আমাদের বাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে দাঁড়ানোর সাথে সাথে সিকিউরিটিদের মাঝে বাড়তি একটি চাঞ্চল্য দেখা গেল। তারা কোনভাবেই বাস দাঁড়াতে দেবে না। আবার আমাদেরকে ভিতরেও যেতে দেবে না। গেট দিয়ে যতদূর চোখ যাচ্ছিল শুধু ভবন আর ভবন। আল আযহারের ক্যাম্পাসের অসংখ্য ভবনে ছাত্রদের অধ্যয়ন চলে। শুধু কি অধ্যয়ন? নানা ধরনের গবেষণাও। তাবত বিশ্ব থেকে আসা ছাত্ররা এখানে অধ্যয়ন এবং গবেষণা করেন। গত প্রায় এক হাজার বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি অত্যন্ত স্বকীয়তার সাথে ভূমিকা রেখে আসছে। এতে করে আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম আজো উচ্চারিত হয় অত্যন্ত শ্রদ্ধা এবং বিনয়ের সাথে।
আল আযহার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ফাতেমী বংশের খলীফা ময়েয-লি-দিনিল্লাহ্‌। ৩৬১ হিজরী সনের (৯৭২ ইংরেজি ) কোন এক আলোকোজ্জ্বল দিনে এই বিদ্যাপীঠের যাত্রা শুরু হয়। অবশ্য কারো কারো মতে ফাতেমী খলীফা ময়েয লি-দিনিল্লাহের শাসনামলে ৩৫৯ হিজরী সনের ২৪ জুমাদিউল আউয়াল ৯৭০ সালের ৪ এপ্রিল জামে আল আযহার নামের প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। ফাতেমী খলীফা ময়েয লি-দিনিল্লাহের ক্রীতদাস জাওয়ার আল কাতিব যখন কায়রো নগরীকে মানুষের বসবাসের উপযোগি করে গড়ে তোলেন তখন তিনি মসজিদুল আয্‌হার প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নাম অনুসারেই এই মসজিদ ও আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয়েছে। অবশ্য এই তথ্যের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। কারো কারো মতে হযরত ফাতিমাতুয যাহরা রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহার নামের ‘যাহা’ শব্দটি অবলম্বনে ‘আল আযহার’ নামকরণ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিশাল এই মসজিদে নাকি একই সাথে ৩০ হাজার মুসল্লী জামায়াতে নামায আদায় করতে পারেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীত পাশে জামেউল হুসাইনের পার্শ্বে চমৎকার একটি দৃষ্টিনন্দন মাজার। কারো কারো মতে ওখানে হযরত ইমাম হোসাইন (র.) মাথা মোবারক দাফন করা হয়েছে। ইরাকের কারবালা প্রান্তরে নির্মমভাবে শহীদ হওয়া হযরত ইমাম হোসাইনের (রঃ) পবিত্র মাথা মোবারক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে তা কুফায় প্রেরণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে কুফা থেকে মাথা মোবারক সিরিয়ার দামেস্কে ইয়াজিদের কাছে পাঠানো হয়। ইয়াজিদ মাথা দর্শন করার পর সেটি উমাইয়া মসজিদের মাঠে দাফন করা হয়। কারবালার ঘটনার বেশ কবছর পরে হযরত ইমাম হোসাইনের মাথা মোবারক কবর থেকে উঠিয়ে আস্কালানে নিয়ে দাফন করা হয়। ৫৪৮ হিজরিতে ক্রুসেডের যুদ্ধের সময় পবিত্র মাথা মোবারকের মর্যাদাহানি হতে পারে আশঙ্কায় সেখান থেকে উঠিয়ে মিশরের কায়রো নগরীতে দাফন করা হয়। একে কেন্দ্র করেই বিশাল এক মাজার ও সুদৃশ্য মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এই মাজার এবং মসজিদ পরিদর্শন করেন। দোয়া করেন। অবশ্য কায়রোতে ইমাম হোসাইনের মাথা মোবারক দাফন করার তথ্যটি নিয়ে মত পার্থক্য রয়েছে। কারো কারো মতে এই তথ্য সঠিক নয়।
আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় চৌদ্দ লাখ। এরমধ্যে চার লাখের মতো বিদেশি। শিক্ষক আছেন নাকি সত্তর হাজার। পৃথিবীতে এত বেশি ছাত্র-শিক্ষক আর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে ছাত্রদের কোন টিউশন ফি প্রদান করতে হয়না। হাজার হাজার ছাত্রের থাকা খাওয়াও ফ্রি। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ এই বিদ্যাপীঠের আরো নানা তথ্য আমরা শুনছিলাম। বলছিলেন আমাদের গাইড মোহাম্মদ আবদুল্লাহ।
আমরা গেটের কড়াকড়িতে পড়ে গেলাম। যতটুকু জানতে পারলাম তাতে নিশ্চিত হওয়া গেল যে, আগাম অনুমতি নিয়ে না আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের সুযোগ নেই। তাৎক্ষনিক অনুমোদন যোগাড় করা অসম্ভব। মিশরীয় গার্ড বেশ কঠোর। আমাদেরকে কোন অবস্থাতেই দাঁড়াতে দিতে রাজি নন। আমাদের দলে রয়েছেন সাবেক গভর্ণর মোস্তাক হোসাইন। ভাবীসহ তিনি এসেছেন এবং দারুণ উপভোগ করছেন। মোস্তাক হোসাইন গার্ডদের সাথে কথা বললেন। আমিও এগিয়ে গেলাম। গার্ডদের অনুরোধ করলাম। কিন্তু তাদের মন গললো না। আমাদের সাথে থাকা লায়ন কামরুজ্জামান লিটন গার্ডদের মধ্যে একজনের কাঁধে হাত তুলে দিয়ে বাংলা এবং ইংরেজি মিশিয়ে কি কি সব বললেন। পকেটে হাত দেয়ার মতো কিছুও ঘটতে পারে। গার্ড যেন কিছুটা সহনীয় হয়ে উঠলেন। অতপর আমরা বাস দাঁড় করলাম।
আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস কত বড় তা আমরা দেখিনি। তবে গেট থেকে দেখলাম,বিশাল ক্যাম্পাসের সামান্য একটি ধারণা পেলাম। বুঝতে পারছিলাম যে, দু্‌ই লাখ শিক্ষার্থী লেখাপড়া বা গবেষণা করতে ঠিক কতটুকু এলাকা লাগে। আমাদের চোখের সামনে দিয়ে গাড়ি ঢুকছে। গাড়ি বের হচ্ছে। বিশেষ কোন স্টিকার লাগানো আছে হয়তো গাড়িগুলোতে। গেটের গার্ডদের কড়াকড়ি দেখে আমাদের বঙ্গভবন বা গণভবনের মতো মনে হচ্ছিল। চারদিকে সুউচ্চ দেয়াল। তার উপরে কাঁটা তারের বেড়া। শত শত সিসি ক্যামেরা চারদিকে। গার্ডতো বলেই ফেললেন, আপনাদের বিশেষ সুবিধা দিতে গেলে আমাকে চাকরি হারাতে হবে। সিসি টিভিতে সবই কর্তৃপক্ষ দেখছেন। আবুল ফাত্তাহ আল সিসি বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও বিক্ষোভ ঠেকাতে আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়কে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে নিয়ে আসা হয় বলেও জানতে পারলাম। তবে একটি চুপ চুপ ভাব মিশরের চারদিকে। কেউ যেন প্রাণ খুলে কথা বলে না।
ইতিহাস ঘাটতে গিয়ে জানা গেল যে, জামি‘আতুল আল্‌-আযহার নামের আল্‌-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি সাহিত্য, ইসলামিক স্টাডিজ, কুরআনিক সায়েন্স, হাদিস, ইসলামী আইন শিক্ষাসহ যুক্তি বিদ্যা, ব্যাকরণ প্রভৃতি বিষয় পড়ানো হয়। দেয়া হয় উচ্চতর ডিগ্রি। বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন এবং মিশরের প্রথম ডিগ্রি গ্র্যান্টিং ইউনিভার্সিটি। ইসলাম ধর্মের আদর্শ প্রচার এবং ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ ঘটানোর লক্ষ্য সামনে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। যা গত এক হাজার বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি করে চলেছে। আল-আযহারের উপাচার্য বা প্রধান ব্যক্তির পদের নাম শায়খুল আযহার। যিনি পদাধিকার বলে মিশরের গ্র্যান্ড ইমাম বা ইমামুল আকবর। শায়খুল আযহার একটি সাংবিধানিক পদ এবং এই পদে নিয়োগ পার্লামেন্টের মাধ্যমে দেশের প্রেসিডেন্ট দিয়ে থাকেন। বুঝতে পারলাম যে, লাখ দুয়েক শিক্ষার্থীর অভিভাবক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া বেশ কঠিন। অতি অভিজ্ঞ এবং জ্ঞানী মানুষকেই এই পদে নিয়োগ দেয়া হয়। বর্তমানে যিনি শায়খুল আযহারের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি বেশ প্রবীণ একজন মুরব্বি বলেও জানতে পারলাম। অত্যন্ত পরহেজগার এবং জ্ঞানী মানুষ।
আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে চার লাখেরও বেশি বিদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করলেও বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর নাকি মাত্র ১৫ জনের মতো শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ পান। একটি কোটায় এই সুযোগ দেয়া হয়। এই সংখ্যা অত্যন্ত কম। এমনকি প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকেও এর থেকে বহু বেশি ছাত্র আল আযহারে পড়ার সুযোগ পান। ইন্দোনেশিয়া থেকে প্রতিবছর ১৫ হাজারের মতো ছাত্র এই বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান। অথচ একটু চেষ্টা করলে বাংলাদেশ থেকে আরো বহু বেশি ছাত্রের আল আযহারে পড়ার সুযোগ করে দেয়া যায়। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম প্রধান রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ অনায়াসে এই সুযোগ দাবি করতে পারে। এজন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যথাযথ উদ্যোগ নিতে পারে বলেও আমাদের সাথের কয়েকজন মন্তব্য করলেন। সরকারি প্রচেষ্টা থাকলে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে নিজেদের জীবন গড়তে পারেন আমাদের দেশের বহু শিক্ষার্থী।
আমরা যাত্রা করলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট থেকে কিছুদূর এগুতেই অতি নান্দনিক একটি মসজিদের গেটে তালা এবং সশস্ত্র সেনা প্রহরা দেখা গেল। মিশরের মতো ইসলামি একটি রাষ্ট্রে মসজিদের গেটে তালা। আজান নামাজ বন্ধ? আশ্চর্য হলাম। গাইড আবদুল্লাহ যেন এখানে মুখ খুলতে রাজি নন। তবুও যতটুকু জানা গেল, মসজিদটির নাম ‘মসজিদে রাবিয়াহ আল-আদউয়্যাহ’। ২০১৩ সালে রমজান মাসে সংঘটিত আবুল ফাত্তাহ সিসি বিরোধী বিক্ষোভ টানা ৪৫ দিন ধরে চলতে থাকে। মিশরের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে কারাগারে পাঠিয়ে সেনা সমর্থনে গদিতে বসা প্রেসিডেন্ট আবুল ফাত্তাহ আল সিসির বিরুদ্ধে লক্ষ লক্ষ মানুষ, ছাত্র-ছাত্রী অবস্থান নিয়েছিলেন এ মসজিদ চত্ত্বরে। এক পর্যায়ে কমান্ডো স্টাইলে মসজিদে অভিযান চালানো হয়। ক্ষয়ক্ষতি হয় বিপুল জান মালের। একদিনেই গুলি করে হত্যা করা হয় অন্তত পাঁচ হাজার বিক্ষোভকারী। যাদের রক্তে এই মসজিদ রক্তাক্ত হয়েছিল। আর ওদিন থেকে মসজিদটির গেটে তালা ঝুলছে। মাইকে আর আজান হয়না। হয় না নামাজও। হায়রে ক্ষমতা। হায়রে রাজনীতি।
আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস ডানে ফেলে আরো কিছুদূর এগুতেই রাস্তার বাম পাশে দেখা গেল সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত এর মাজার। পিরামিড আকৃতির বেশ নান্দনিক এক সমাধিক্ষেত্র। আশেপাশে চমৎকার বাগান। সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা সব গাছগাছালি। হঠাৎই আমার মনে হলো, আনোয়ার সাদাতকেওতো খুন করা হয়েছিল। গাইড আবদুল্লাহ মাথা নাড়লেন। হ্যাঁ, এবং এখানেই। যেখানে প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতকে খুন করা হয়েছিল সেই স্থানটিতে তাকে সমাহিত করে চমৎকার এক সমাধিক্ষেত্র গড়ে তোলা হয়েছে। আমার মুখ দিয়ে একেবারে অনাহুতভাবে বেরিয়ে পড়লো, হায়রে রাজনীতি! (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।

x