(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
হংকংয়ের কাম সেয়ুং স্টেশনে দাঁড়িয়ে কফি খেতে খেতে আমার ট্রেন এসে হাজির হলো। কফির মগটি একটি বিনে রেখে আমি ট্রেনে চড়ে বসলাম। বন্ধু স্বপন আমাকে সবকিছুই লিখে দিয়েছে, কোন স্টেশনে নামতে হবে, আমার স্টেশন থেকে কত স্টেশন পার হলে সেটি আসবে ইত্যাদি। তারপর ট্রেন পাল্টে অন্য একটি স্টেশনে গেলে স্বপনকে পাওয়া যাবে। সবই পানির মতো পরিষ্কার, সবই ঘড়ির কাঁটা ধরে চলে। কোথাও কোন গোলমাল নেই, সময়ের কোন হেরফের নেই। আমি নিশ্চিন্তমনে জানালার পাশে একটি সিটে বসে বাইরের প্রকৃতি দেখতে দেখতে এগুতে থাকলাম।
ট্রেন ছুটছিল, বেশ গতি। স্টেশনে পৌঁছার আগ দিয়ে গতি কমে, ট্রেনের গতি কমলে আমি বুঝতে পারি যে একটি স্টেশন সামনে এসেছে। ট্রেনের দরোজার ঠিক উপরে ডিজিটাল ডিসপ্লেতে কোন স্টেশনে ট্রেনটি দাঁড়াচ্ছে, পরের স্টেশনগুলোর নামও দেখা যাচ্ছিলো। আমি যে স্টেশনে নামবো সেই স্টেশনের নামও দেখা যাচ্ছে। আরো বেশ কয়েক স্টেশন পর সেটিতে ট্রেন থামবে।
আমি বাইরের পাহাড় ও উঁচু উঁচু কাচঘেরা ভবন দেখতে দেখতে সময় পার করছিলাম। হংকংয়ের ট্রেন জার্ণি যিনি করেননি তিনি বুঝবেন না যে, ট্রেনে চড়ার আরাম কাকে বলে। কোন শব্দ নেই, যেনো নীরবেই ছুটে চলা। যাত্রীরাও কারো সাথে কারো কোন কথাবার্তা নেই। সবাই নিজের কাজে ব্যস্ত। কেউ মোবাইলে, কেউ ল্যাপটপে আবার কেউবা মোটা মোটা বই হাতে নিয়ে ব্যস্ত। ট্রেনের ফ্লোরে বসে খাতায় লেখালেখি করার মতো দৃশ্য যদি দেখেন তাহলে বুঝবেন যে, আপনি হংকং পৌঁছে গেছেন! নির্ধারিত স্টেশনে নেমে আমার ভিমরি খাওয়ার অবস্থা। হাজার হাজার যাত্রী, নারী পুরুষ। এতো মানুষ যায় কোথায়! পরের ট্রেনেই বা চড়বো কি করে! স্বপনকে ফোন দিলাম। বললাম, দোস্ত, হাজার হাজার মানুষ। ট্রেন চিনবো বা ধরবো কি করে। সে কতক্ষণ হাসলো, পরে বোর্ড দেখার পরামর্শ দিলো। আমার পরবর্তী ট্রেনটি কখন আসবে তা খুঁজে স্বস্তির নিঃশ্বাস নিলাম।
নির্দিষ্ট ট্রেনটি আসলো, যাত্রীরা সবাই লাইন ধরে উঠতে লাগলো। আমিও লাইনে। কোন হুড়োহুড়ি নেই, ধাক্কা–ধাক্কি নেই, আগে ট্রেনে উঠার প্রতিযোগিতা নেই। আহা, কী শান্তিতে যে ট্রেনে চড়লাম। অবশ্য, ঠিক ট্রেনে চড়েছি কিনা বুঝতে পারছিলাম না। কিছুটা ডর ডর লাগছিলো। কাউকে যে জিজ্ঞেস করবো তাও পারছিলাম না। ট্রেন চলতে শুরু করলে আমি দরোজার উপরের ডিজিটাল বোর্ড দেখলাম। পরবর্তী স্টেশন এবং তারপরের স্টেশনগুলো দেখতে গিয়ে বুকের উপর থেকে ভারী একটি পাথর নেমে গেলো। আমার গন্তব্যের স্টেশন জর্ডানের নাম লেখা রয়েছে। মাত্র কয়েকটি স্টেশন পরই সেটিতে পৌঁছে যাবো।
আমি স্বপনকে ফোন করলাম, বললাম আর মাত্র দুই স্টেশন পরই জর্ডান স্টেশনে পৌঁছাচ্ছি। তুই তাড়াতাড়ি আয়। স্বপন আমাকে আশ্বস্ত করে বললো সে স্টেশনেই দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেন থেকে নেমেই তাকে পেয়ে যাবো।
ট্রেন থেকে নেমে এদিক ওদিক তাকালাম। স্বপন অনেকটা লম্বা মানুষ। হংকং বা চীনা মানুষদের গড় উচ্চতার চেয়ে বেশ বেশি। তাই এদিক ওদিক তাকাতেই তাকে খুঁজে পেতে আমার কষ্ট হলো না। স্বপন আমার হাত ধরে স্টেশনের এক্সিট পথের দিকে এগুতে লাগলো। বললো, এখান থেকে বের হওয়াটাই সমস্যা। অনেকগুলো পথ, কোন পথ ভুল করলে অনেক পথ হাঁটতে হয়, ঘুরতে হয়।
স্বপনকে পাওয়ার পর আমার আর টেনশন নেই। এখন থেকে বাকি সব টেনশনই তার। হংকং আমার হাত ধরে সামনে নিয়ে যাচ্ছিলো, যেনো কোন পথহারা পথিককে সে পথ দেখাচ্ছিলো। বললো, কিছু খাবি, নাকি এখান থেকে আগে বাইরে চলে যাবো। আমি বললাম, কোথায় ঘুরতে যাবো সেখানে নিয়ে চল। খাওয়া দাওয়া পরে হবে। দুপুরে ভাবী যা খাইয়েছে তা হজম হতে বহু সময় লাগবে। তাছাড়া স্টেশনেই কফি খেয়েছি। সুতরাং খাওয়ার চিন্তা সাইডে রেখে কিছু দেখানোর চিন্তা কর।
স্বপন আমাকে বললো, তোকে আজ রাতের হংকং দেখাবো। আমি বললাম, ভাইরে নাইট ক্লাব ট্লাবে যাবো না, অন্য কিছু দেখাস। সেই জিভ কাটলো। বললো, আমিও কখনো যাইনা। চিন্তা করিস না।
মাত্র মিনিট তিনেক হাঁটার পর আমরা টেম্পল স্ট্রিট নাইট মার্কেটে পৌঁছালাম। স্বপন বললো, এটি নাইট মার্কেট। কাউলুনের ব্যস্ত অফিস পাড়া কিভাবে রাতের বেলা জেগে উঠে তা দেখলে আশ্চর্য হবি।
হংকংয়ের এই এলাকাটিকে দিনে দেখলে মনে হবে সবই কর্পোরেট হাউজ। কাচ আর স্টিলের তৈরি এক একটি আকাশ ছোঁয়া ভবন। কিন্তু সূর্য ডুবে যাওয়ার পর এই এলাকাটি পুরোপুরি বদলে যায়, অন্য রূপ ধারণ করে। আজ আমরা সেটিই দেখবো। নাইট মার্কেটের প্রবেশমুখ বলে কিছু আছে কিনা কে জানে, তবে আমরা একদিক দিয়ে ঢুকে পড়লাম। হাজার হাজার মানুষ, অগুনতি দোকান। পরিকল্পিত নগরজীবনে যেনো জায়গা করে নিয়েছে অন্যরকমের এক আয়োজন। নাইট মার্কেটের কিছুটা দেখে আমার মনে হলো, এটি চাকচিক্যে ভরা হংকংয়ের রাস্তার জীবন। মানুষের ব্যস্ততার যেনো শেষ নেই। স্ট্রিট ফুডের খাবারের গন্ধ ভাসছে সর্বত্র। রাস্তার অস্থায়ী দোকানগুলোতে চলছে বিকিকিনি, একদিকে দেখলাম ভবিষ্যৎ গণনা চলছে। এটিই নাকি শত সহস্র বছরের ঐতিহ্য। রাতের নগরসংস্কৃতির অপরূপ সৌন্দর্য মিলে নাইট মার্কেট পরিণত হয়েছে নানা আয়োজনের এক অনন্য মিলনস্থলে।
স্বপন বললো, দিনের আলোয় টেম্পল স্ট্রিট শহরের আর দশটি সাধারণ রাস্তার মতোই একটি রাস্তা থাকে। কিন্তু সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামতে শুরু করলে এখানের চারপাশের দৃশ্যপট পাল্টাতে শুরু করে। রাস্তার দুই পাশে একের পর এক দোকান খুলতে থাকে। পসরা সাজানো হয় ফুটপাতজুড়ে। কোথাও ঝুলছে রঙিন জামাকাপড়, কোথাও ঘড়ি, ব্যাগ, গয়না, খেলনা কিংবা ছোটখাটো উপহারসামগ্রী। দোকানের ওপরে জ্বলে ওঠে লাল, হলুদ, সাদা আর নীল আলোর সাইনবোর্ড। রাস্তার উপরও ঝুলতে থাকে নানা রঙের বাতি। এই সময় রাস্তায় মানুষের চলাচল বাড়ে। পর্যটকেরা ক্যামেরা হাতে ঘুরে বেড়ান, স্থানীয় বাসিন্দারা দরদাম করেন, দোকানিরা ক্রেতা ডাকেন। পাশের খাবারের দোকান থেকে ভেসে আসে রান্নার শব্দ, গরম তেলের গন্ধ আর মসলার মিশ্র সুবাস।
বাজারের ভেতরে আরও খানিকটা এগোতেই চোখে পড়ে সারি সারি ছোট দোকান। কোথাও রঙিন টি–শার্ট, কোথাও হাতঘড়ি, কোথাও ব্যাগ আর অলংকার। ছোট ছোট জিনিসের বিশাল সমাহার। দোকানিরা ক্রেতার অপেক্ষায় বসে আছেন, আবার কেউ কেউ পথচারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যস্ত। কোন কোন দোকানে কেনাকাটার বেজায় ভিড়!
একটি দোকানে দেখলাম, একজন পশ্চিমা পর্যটক একটি ব্যাগ হাতে নিয়ে দাম জানতে চাইছেন। দোকানি তাঁর হিসাব বলছেন, ক্রেতা পাল্টা দাম প্রস্তাব করছেন। শুরু হচ্ছে দরদাম। হাসিমুখে কথা বলা, ইশারায় বোঝানো, ক্যালকুলেটরে সংখ্যা লিখে দেখানো–ভাষা আলাদা হলেও বাণিজ্যের ভাষা যে প্রায় সর্বজনীন, তা বেশ বুঝতে পারলাম।
টেম্পল স্ট্রিটে পোশাক, ব্যাগ, ঘড়ি, গয়না, স্মারকসামগ্রী ও পুরোনো জিনিসপত্রের অসংখ্য দোকান রয়েছে। অনেকটা অন্যান্য দেশে গড়ে উঠা চায়না মার্কেটের মতোই। দোকানগুলোতে দরদাম করার সুযোগ আছে।
বাজারটির নাম আগে নাকি ‘মেনস স্ট্রিট’ ছিলো। শুধু পুরুষ ক্রেতাদের জন্য নানা পণ্যের দোকান বসতো সন্ধ্যার সময়। ক্রমে সময় পাল্টিয়েছে। বাজারের পরিধি ও পণ্যের বৈচিত্র বেড়েছে। এখন নারী–পুরুষ নির্বিশেষে স্থানীয় মানুষ ও বিদেশি পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকে। পুরুষ ক্রেতার চেয়ে নারী ক্রেতাই যেনো এখন বেশি, বিক্রেতাও। (চলবে)
লেখক : চিফ রিপোর্টার, দৈনিক আজাদী।












