দফায় দফায় মেয়াদ বাড়ানো হলেও এখনো শেষ হয়নি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল সংলগ্ন ১৫ তলা বিশিষ্ট নির্মাণাধীন ক্যান্সার ভবন (ক্যান্সার ইউনিট) নির্মাণ কাজ। ফলে চট্টগ্রামসহ আশপাশের বিভিন্ন জেলা উপজেলার রোগীদের দুর্ভোগ সহসা কমছে না। প্রকল্পটি ২০১৯ সালে নেয়া হলেও এরমধ্যে পঞ্চম দফায় মেয়াদ বাড়ানো হলো। সর্বশেষ চলতি বছরের ২০২৬ সালের জুনে মেয়াদ শেষ হলেও আরো দুই বছর মেয়াদ বাড়িয়ে তা ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অর্থছাড় সংক্রান্ত জটিলতায় প্রকল্পের গতি কিছুটা কমে গিয়েছিল। এছাড়া এরমধ্যে করোনার ধকল ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনও অন্যতম কারণ ছিল। তবে এই মেয়াদে নির্মাণ কাজ শেষ হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, চট্টগ্রামসহ ৮টি বিভাগীয় শহরের (ঢাকা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল ও খুলনা) মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একশ শয্যার একটি করে ক্যান্সার ইউনিট স্থাপনে একটি প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। প্রকল্পের ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পায় ২০১৯ সালে। ডিপিপি অনুযায়ী একশ শয্যার ক্যান্সার ইউনিট স্থাপনের জন্য ২টি বেজমেন্ট বাংকারসহ ১৫ তলা বিশিষ্ট একটি করে ভবন নির্মাণের কথা ছিল। তবে পরবর্তীতে একশ শয্যার বিশেষায়িত ক্যান্সার ইউনিটের পরিবর্তে সমন্বিত ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগ বিভাগের জন্য এ ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। প্রাথমিকভাবে ভবনটিতে মোট ৪৬০ শয্যা সংস্থানের কথা উল্লেখ করা হয়। বেজমেন্ট–দ্বিতীয় হতে ৭ম তলা পর্যন্ত ১৮০ শয্যা বিশিষ্ট ক্যান্সার ইউনিট। ৮ম হতে ১১ তলা পর্যন্ত ১৬৫ শয্যার কিডনি ও কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার। ১২ হতে ১৫ তলা পর্যন্ত ১১৫ শয্যার কার্ডিওলজি বিভাগ। ভবনে ৯টি লিফটের সংস্থানের কথা উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া দেড় হাজার কেভিএ ক্ষমতা সম্পন্ন ২টি সাব–স্টেশন এবং ৫০০ কেভিএ ক্ষমতা সম্পন্ন দুটি অটো জেনারেটর, ফায়ার হাইড্রেন্ট, গভীর নলকূপ প্রভৃতি থাকছে এ ভবনে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে গণপূর্ত বিভাগ।
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রামে পুরুষদের মধ্যে নাক কান গলা ও মুখগহ্বর সংশ্লিষ্ট ক্যান্সার বা হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সারের রোগী বাড়ছে। অন্যদিকে নারীদের মধ্যে স্তন ক্যান্সারের প্রবণতা বেশি। আবার নারীদের মধ্যে মুখ গহ্বরের ক্যান্সারের রোগীও বাড়ছে। জর্দা, পানসহ বিভিন্ন ধরনের তামাক সেবনের কারণে মুখগহ্বর গলা ও খাদ্যনালীর ক্যান্সারের ঝুঁকি আরও বেড়েছে। অনেকেই প্রাথমিক উপসর্গ সম্পর্কে সচেতন না হওয়ায় দেরিতে চিকিৎসা নিতে আসেন, ফলে রোগ জটিল আকার ধারণ করে। তাছাড়া হাসপাতালের বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় চট্টগ্রামে হেড অ্যান্ড নেক ক্যান্সারের হার তুলনামূলক বেশি। এক্ষেত্রে স্থানীয় খাদ্যাভ্যাস বিশেষত অতিরিক্ত লবণযুক্ত ও সংরক্ষিত খাবার যেমন শুঁটকি মাছ খাওয়ার প্রবণতা বেশি হওয়ায় খাদ্যনালী ও পাকস্থলীর ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত লাল মাংসের কারণে কোলন বা কোলোরেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ছে। তামাকজাত দ্রব্যের উচ্চ ব্যবহার এবং লবণাক্ত খাদ্যাভ্যাস চট্টগ্রামে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ানোর প্রধান কারণ। তবে নারীরা স্তন ও জরায়ুমুখ ক্যান্সারে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন নানা কারণে।
চমেক হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি ও রেডিওথেরাপি বিভাগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩০ থেকে ১৫০জন রেডিওথেরাপি নিচ্ছেন চমেকে। ক্যান্সার চিকিৎসা আধুনিকায়ন হলেও চমেকে পুরানো রেডিওথেরাপি মেশিন দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। নতুন আধুনিক ও যুগোপযোগী চিকিৎসার জন্য আধুনিক রেডিওথেরাপি মেশিন বসানো দরকার হয়। এক্ষেত্রে নতুন ক্যান্সার ইউনিট চালু হলে রোগীরা আরো উন্নত ও আধুনিক সেবা পাবে।
চমেক হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল অনকোলজি ও রেডিওথেরাপি বিভাগের চিকিৎসকরা বলছেন, ভবনের নির্মাণ কাজ পুরোপুরি শেষ হলে নতুন যন্ত্রপাতি বসানো, যন্ত্রপাতি পরিচালনায় নতুন লোকবল নিয়োগসহ অনেক কাজ বাকি রয়েছে। তবে ইতোমেধ্য বাংকারের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। চারটি মেশিনের জন্য চারটি বাংকার করা হয়েছে। এখানে স্থাপন করা হবে কোবাল্ট, লিনাক এবং ব্র্যাকিথেরাপির মেশিন। এসব মেশিন চালু হলে ক্যান্সারের চিকিৎসায় অনেক দূর এগিয়ে যাবে চট্টগ্রাম।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, ক্যান্সার ইউনিটের প্রকল্পের মেয়াদ আরো দুই বছর বাড়ানো হয়েছে। আশা করি ২০২৮ সালে জুনে কাজ সম্পূর্ণ শেষ হবে।










