সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের পুনর্বহালের দাবিতে চলা ২১ দিনের টানা আন্দোলনের মধ্যে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) প্রবেশ করেছেন নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। ছাত্রদল নেতাদের সহায়তায় প্রশাসনিক ভবনের তালা ভেঙে তার দপ্তরে প্রবেশের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গতকাল সোমবার দিনভর চুয়েট ক্যাম্পাসে উত্তেজনা, উপাচার্য ভবনে তালা, ভবনের বিদ্যুৎ–পানি সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ এবং শিক্ষক–কর্মকর্তা–কর্মচারীদের যৌথ অসহযোগের ঘটনা ঘটে। উপাচার্য এখনো অবরুদ্ধ অবস্থায় আছেন।
এদিকে পদত্যাগ করলে উপাচার্য ভবনের তালা খুলে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নিরাপদে ক্যাম্পাস ত্যাগ করার সুযোগ দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন চুয়েটের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। পদত্যাগ না করলে তাকে অবরুদ্ধ রাখা হবে বলেও ঘোষণা দেন তারা।
বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, ২১ সেপ্টেম্বর কুয়েটের তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর থেকে সাবেক ভিসিকে পুনর্বহালের দাবিতে শিক্ষার্থীরা কমপ্লিট শাটডাউন এবং শিক্ষক–কর্মকর্তারা কর্মবিরতি পালন করে আসছিলেন। ২১ দিন ধরে চলা এই আন্দোলনের মুখে এতদিন তিনি ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারেননি।
গতকাল সকালে একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে ক্যাম্পাসে পৌঁছান নতুন উপাচার্য। প্রধান ফটকে নিজেকে কেবল শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করার পর চুয়েট শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান আল সাবিত ও সাংগঠনিক সম্পাদক বিপ্লব হোসাইনসহ কয়েকজন নেতাকর্মীর সহযোগিতায় প্রশাসনিক ভবনের তালা ভেঙে তিনি নিজ দপ্তরে গিয়ে চেয়ারে বসেন। পরে ছাত্রদল নেতাদের সঙ্গে নিয়ে ভেতরে প্রবেশের বিষয়টি গণমাধ্যমের সামনে স্বীকার করেন শাখা ছাত্রদলের নেতারা।
ছাত্রদল নেতাদের সহায়তায় ভিসির এমন গোপন ও আকস্মিক প্রবেশের খবর ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ২১তম আবর্তের শিক্ষার্থীদের ব্যানারে দুপুর ১২টার মধ্যে ভিসিকে সসম্মানে ভবন ত্যাগ করার চূড়ান্ত আলটিমেটাম দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ে উপাচার্য ভবন না ছাড়ায় ১২টার পর বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনের মূল ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন। একই সঙ্গে ভবনের বাইরে থেকে বিদ্যুৎ ও সুপেয় পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। ভবনের ভেতরে উপাচার্যের সাথে চুয়েট শাখা ছাত্রদলের সভাপতিসহ বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আটকা পড়েন। দিনভর ‘নতুন ভিসি প্রত্যাখ্যান’ স্লোগানে মুখর ছিল প্রশাসনিক ভবন চত্বর।
ভবনের ভেতরে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম। তিনি বলেন, হলের কিছু সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ব্যাচের পক্ষ থেকে ক্লাস শুরুর আকুল আবেদন জানানোয় তিনি ক্যাম্পাসে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সাবেক ভিসি অধ্যাপক সায়েমকে একজন ভালো শিক্ষক ও গবেষক হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, সবার সঙ্গে আলোচনা করেই তিনি প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিতে চান। শিক্ষার্থীদের দেওয়া পদত্যাগের আলটিমেটাম বা দাবি নাকচ করে তিনি জানান, সরকারি সিদ্ধান্তেই তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
এদিকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও ভবন অবরুদ্ধ করার প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, সরকার নিয়োগ দেওয়ায় তিনি অফিস করেছেন। আর এটি ছাত্র–শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে আন্দোলনকারীরা ফৌজদারি অপরাধ করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি এবার আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে চুয়েটের শিক্ষক সমিতি, কর্মকর্তা সমিতি ও কর্মচারী সমিতি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে তিন সমিতির জরুরি সভা হয়। সভা শেষে যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, বহিরাগত ও ছাত্রদল নেতাদের সহায়তায় নবনিযুক্ত উপাচার্যের এই বলপ্রয়োগমূলক প্রবেশকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছে সমিতিগুলো। ক্যাম্পাসের বর্তমান অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্পূর্ণ দায়ভার উপাচার্যকে নিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। এছাড়া পূর্বঘোষিত দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের দায়িত্ব থেকে বিরত থেকে পূর্ণ কর্মবিরতি ও সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় তিন সংগঠন। সভা শেষে বিক্ষোভ মিছিলও বের করেন তারা।
এ সময় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. মো. আবুল হাছান অভিযোগ করেন, ২১ দিনের সুশৃঙ্খল আন্দোলনের মধ্যে গতকাল সকালে মদুনাঘাট এলাকায় শিক্ষার্থীদের বাসে ন্যক্কারজনক হামলা চালানো হয়েছে।
শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ জানান, বিষয়টি হাটহাজারী থানার ওসি ও বিভাগীয় কমিশনারকে জানানো হয়েছে।
সারা দিন উত্তেজনা, তালাবদ্ধ ভবন ও বিদ্যুৎ–পানিবিহীন অবস্থায় অবরুদ্ধ থাকার পর সন্ধ্যায় মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। দিনভর আন্দোলন ও স্লোগান চললেও দীর্ঘ সময় ধরে তালাবদ্ধ ভবনের ভেতরে আটকে থাকা উপাচার্য ও অন্য লোকজনের কথা বিবেচনা করে সন্ধ্যার পর তাদের জন্য ভেতরে খাবার পৌঁছে দেন শিক্ষার্থীরা।
পদত্যাগ করলে তালা খুলবে : পদত্যাগ করলে উপাচার্য ভবনের তালা খুলে অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নিরাপদে ক্যাম্পাস ত্যাগ করার সুযোগ দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন চুয়েটে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। যতক্ষণ পদত্যাগ করবেন না ততক্ষণ তাকে রাখা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন তারা।
গতকাল রাত ৮টায় শিক্ষার্থীরা গণমাধ্যমের সামনে তাদের এই দাবি তুলে ধরেন। শিক্ষার্থীদের পক্ষে একজন আন্দোলনকারী লিখিত বক্তব্যটি পাঠ করেন। তিনি বলেন, আপনারা অবগত আছেন, নিজের পদ টিকিয়ে রাখতে মদুনাঘাট ও চান্দগাঁও টার্মিনালে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাসে ন্যক্কারজনক হামলা চালানো হয়েছে। শিক্ষার্থীদের উপর হামলাকারী এই ব্যক্তিকে আমরা আর কোনোভাবেই উপাচার্য হিসেবে বিবেচনা করছি না। তথাকথিত উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম আজ ক্যাডার বাহিনী নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেছেন। তিনি আমাদের কাছে একজন সম্পূর্ণ অবৈধ অনু্প্রবেশকারী এবং ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি বড় হুমকি। এই অনুপ্রবেশকারী ও তার সহযোগীদের দুপুর ১২টার মধ্যে ভিসি ভবন ত্যাগের আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা সেটি অমান্য করে ভেতরে অবস্থান করায় আমরা বাধ্য হয়ে ভিসি ভবন তালাবদ্ধ করে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছি।
নিজেদের সাধারণ শিক্ষার্থী দাবি করে তিনি বলেন, আমাদের যৌক্তিক অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করছি। আমরা সংঘাত চাই না বা মানবাধিকার লঙ্ঘনেও বিশ্বাসী নই। কাউকে ভবনে অবরুদ্ধ করে অত্যাচার করাও আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তাই আজ দেশের সকল গণমাধ্যমের উপস্থিতিতে প্রমাণ হিসেবে আমরা শরীফুল আলমকে নিরাপদে বের হয়ে যাওয়ার একটি চূড়ান্ত সুযোগ দিচ্ছি, যাতে পরবর্তীতে কেউ আমাদের বিরুদ্ধে কোনো মিথ্যা অপপ্রচার চালাতে না পারে। আমাদের প্রস্তাব স্পষ্ট। শরীফুল আলম যদি এই মুহূর্তে তার পদত্যাগ আমাদের কাছে হস্তান্তর করেন অথবা আপনাদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে পদত্যাগের ঘোষণা দেন, তবে এখনই ভবনের তালা খুলে তাকে ও তার ক্যাডারদের নিরাপদে ক্যাম্পাস ত্যাগ করার সুযোগ দেব।
তিনি বলেন, কিন্তু যদি পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানান, তবে আমাদের এক দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ সায়েম স্যারকে (অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম) উপাচার্য পদে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত তিনি ভেতরেই অবরুদ্ধ থাকবেন। গণমাধ্যমের সামনে আমরা তাকে নিরাপদে বের হওয়ার সুযোগ দিচ্ছি। এটি প্রত্যাখান করলে নিজেই প্রমাণ করবেন যে তিনি স্বেচ্ছায় অবরুদ্ধ থাকতে চান। এরপর উদ্ভূত যেকোনো পরিস্থিতির জন্য তিনি সম্পূর্ণভাবে দায়ী থাকবেন।
বিকালে ভবনের নিচে তালা দেওয়া গেটে এসে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করেন উপাচার্য শরীফুল আলম। তবে এতে শিক্ষার্থীরা সাড়া দেননি। কিছুক্ষণ সেখানে অবস্থান করে নিজের রুমে ফিরে যান উপাচার্য। রাত পর্যন্ত উপাচার্য বা তার সঙ্গে থাকা কেউ নিচে নামেননি। ভবনের প্রধান ফটকসহ চারপাশ ঘিরে রেখেছেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা।












