প্রফেসর ড. মো. আহসানুল হক (রোকন) তেমনই একজন শিক্ষাবিদ, যাঁর তিন দশকের কর্মজীবনে জ্ঞান ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষা সংস্কার, মানবিকতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন। ভেটেরিনারি এপিডেমিওলজি, ওয়ান হেলথ, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স এবং উচ্চশিক্ষা সংস্কারে তাঁর অবদান তাঁকে অনন্য একাডেমিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। তিনি চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়ান হেলথ ইনস্টিটিউটের পরিচালক, ভেটেরিনারি এপিডেমিওলজির প্রফেসর (গ্রেড–১) ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য। বাংলাদেশের প্রথম নিবেদিত ভেটেরিনারি এপিডেমিওলজি অধ্যাপক হিসেবে তিনি এমন সময়ে এই বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণার পথ নির্মাণ করেন, যখন দেশে এটি স্বতন্ত্র বিশেষায়িত ক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল না। তাঁর প্রচেষ্টায় এপিডেমিওলজি আজ প্রাণিস্বাস্থ্য, জনস্বাস্থ্য, রোগনিয়ন্ত্রণ, খাদ্যনিরাপত্তা ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব ভেটেরিনারি মেডিসিন ও ফার্মাকোলজিতে এমএস করার পর তিনি যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ভেটেরিনারি কলেজ ও লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন থেকে ভেটেরিনারি এপিডেমিওলজিতে এমএস এবং অস্ট্রেলিয়ার জেমস কুক ইউনিভার্সিটি থেকে এপিডেমিওলজিতে পিএইচডি অর্জন করেন। তিনি Australian and New Zealand College of Veterinary Scientists-Gi Veterinary Epidemiology Chapter–এর সদস্য।
১৯৯৫ সালে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভেটেরিনারি সার্জন হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে ১৯৯৮ সালে তৎকালীন চট্টগ্রাম সরকারি ভেটেরিনারি কলেজে শিক্ষকতায় যোগ দেন। পরে সহকারী ও সহযোগী অধ্যাপক হয়ে অধ্যাপক গ্রেড–১ হন। তিনি সিভাসুর ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদের ডিন, ফিজিওলজি, বায়োকেমিস্ট্রি ও ফার্মাকোলজি এবং জেনোমিক্স ও বায়োইনফরমেটিক্স বিভাগের প্রধান এবং উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা সমন্বয়ক ছিলেন। বিভিন্ন একাডেমিক, গবেষণা, নৈতিকতা, পরিকল্পনা, ভর্তি ও পদোন্নয়ন কমিটিতে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দেশি–বিদেশি বৈজ্ঞানিক জার্নালের রিভিউয়ারও তিনি।
তাঁর ১২০টির বেশি peer-reviewed গবেষণা ৩,৪০০ বারের বেশি উদ্ধৃত হয়েছে। তাঁর য–রহফবী ৩৫–এর বেশি এবং র১০–রহফবী ৮১। জুনোটিক রোগ, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, অগজ, রোগ সংক্রমণের গতিবিদ্যা, পোল্ট্রি ও প্রাণিস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু–সহনশীল প্রাণিসম্পদ, One Health policy ও veterinary education reform তাঁর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র। তাঁর নেতৃত্বে দেশে ৫.৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি গবেষণা–শিক্ষা অর্থায়ন এসেছে।
২০১২ সালে FAO–এর সহায়তায় মানুষ ও পাখির মধ্যে Highly Pathogenic Avian Influenza–এর সংক্রমণ নিয়ে গবেষণা শুরু করেন তিনি। গত তিন দশকে ZOLA Project, H5N1 Transmission Dynamics, Zoonotic Influenza Preparedness Project, One Health Poultry Hub, BALZAC Project, Veterinary Education Twinning Project, Sustainable Water Buffalo Dairy Chain, Udder Health Control Programme ও HEAT–সহ বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রকল্পে তিনি গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বস্থানীয় দায়িত্ব পালন করেছেন। FAO, UKRI, GCRF, INRAE France, City University of Hong Kong, Swedish Research Council, WOAH, DANIDA, Swedish Government, LANSA, CIVME, European Commission, Australian Bio security CRC ও UGC সহ বহু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর গবেষণা সহযোগিতা রয়েছে। এসব প্রকল্প তরুণ গবেষকদের প্রশিক্ষণ, যৌথ গবেষণা ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সুযোগও তৈরি করেছে।
ভেটেরিনারি শিক্ষায় তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান পরিবর্তনের সাহস। তিনি সিভাসুর উঠগ পাঠ্যক্রমে প্রথম Problem-Based Learning চালু করেন। Professional Development Course, দেশের প্রথম simulated Clinical Skills Laboratory, মাঠপর্যায়ের ভেটেরিনারিয়ানদের Continuous Education Programme ও প্রথম National DVM Intern Conference চালু করেন। DVM Internship আধুনিকায়ন, MS in Epidemiology ও MS in Applied Epidemiology প্রোগ্রাম উন্নয়ন, MPH curriculum আন্তর্জাতিক মানে হালনাগাদ এবং credit-bearing One Health Certificate Course প্রবর্তনেও তিনি অগ্রণী। Research Intern, Scientific Report and Thesis Guideline এবং সিভাসুর প্রথম Split PhD Programme প্রবর্তনেও তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
গবেষক তৈরিকে তিনি অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে ১১ জন পিএইচডি গবেষক (একজন বিদেশি) কাজ করেছেন। এছাড়া তিনজন এমফিল, ৪১ জন MS ও MPH শিক্ষার্থীকে তিনি তত্ত্বাবধান করেছেন। তাঁর অধীনে ৪০টির বেশি DVM Intern Report সম্পন্ন হয়েছে। বিষয় নির্বাচন, proposal, তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, লেখা, নৈতিকতা ও প্রকাশনার প্রতিটি পর্যায়ে তিনি শিক্ষার্থীদের পাশে থেকেছেন।
যোগাযোগ, নেতৃত্ব, দলগত কাজ, পেশাগত নৈতিকতা, সমস্যা সমাধান, অভিযোজনশীলতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকেই তিনি পূর্ণাঙ্গ পেশাজীবীর ভিত্তি মনে করেন। শিক্ষক তাঁর কাছে মেন্টর ও পথপ্রদর্শক। One Health Young Voice Bangladesh, International Veterinary Students’ Association Bangladesh, IAAS Bangladesh ও CVASU Epidemiology Alumni Association–এর উপদেষ্টা হিসেবে তিনি তরুণদের গবেষণা, নেতৃত্ব, যোগাযোগ ও স্বেচ্ছাসেবায় উৎসাহিত করছেন; National Debate Federation Bangladesh–এর সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
গবেষণার ফলাফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়াও তাঁর কর্মদর্শনের অংশ। পোল্ট্রি স্বাস্থ্য, biosecurity, vaccination, antimicrobial use, খাদ্যনিরাপত্তা, ওলান–স্বাস্থ্য, হাঁস পালন ও জুনোটিক রোগ প্রতিরোধে তিনি ভেটেরিনারিয়ান, শিক্ষার্থী, খামারি ও কমিউনিটি কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। Stakeholder Meeting, Policy Dialogue ও Roundtable–এ সরকারি কর্মকর্তা, গবেষক, খামারি, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের যুক্ত করেছেন।
শিক্ষা ও গবেষণার পাশাপাশি অসচ্ছল পরিবারের মাঝে খাদ্য ও ইফতারসামগ্রী বিতরণ, শীতবস্ত্র ও শিক্ষা উপকরণ প্রদান, ভেটেরিনারি মেডিকেল ক্যাম্প, প্রাণিস্বাস্থ্য ও টিকাদান সচেতনতা, রক্তদান, বৃক্ষরোপণ এবং সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশেও দাঁড়িয়েছেন।
তিনি South Asia Veterinary Education Establishments and Veterinary Statutory Bodies Network–এর বিশেষজ্ঞ সদস্য। Agriculturists Association of Bangladesh–এর চট্টগ্রাম শাখা, Bangladesh Veterinary Association, World’s Poultry Science Association Bangladesh, One Health Bangladesh ও Bangladesh Society for Veterinary Education and Research সহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনে নেতৃত্ব বা সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন।
প্রফেসর হকের মিশন গবেষণাকে দেশের বাস্তব সমস্যা সমাধান, সরকারি নীতি, রোগ প্রতিরোধ, নিরাপদ খাদ্য ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করা। তাঁর One Health দর্শনে মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্য পরস্পরনির্ভর। AMR মোকাবিলায় তিনি দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার, Surveillance, Biosecurity, Antimicrobial Residue Control ও Evidence-Based Policy–তে গুরুত্ব দেন। তাঁর স্বপ্ন গবেষণানির্ভর, আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত, প্রযুক্তিসমৃদ্ধ ও শিক্ষার্থী–কেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে Quality Assurance, Academic Integrity, Digital Transformation, Interdisciplinary Research, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব ও Graduate Employability হবে ভিত্তি।
তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার প্রকাশনা, সাইটেশন, প্রকল্প কিংবা পদ–পদবিতে নয়; তা নিহিত শিক্ষা সংস্কার, গবেষক তৈরি, শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব বিকাশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ নির্মাণে। জ্ঞানের সঙ্গে মানবিকতা, শৃঙ্খলার সঙ্গে মমত্ব এবং ব্যক্তিগত অর্জনের সঙ্গে দেশ ও সমাজের দায়বদ্ধতার এই সমন্বয়ই তাঁকে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও ওয়ান হেলথ অঙ্গনের এক আলোকিত পথিকৃতে পরিণত করেছে।
লেখক : শিক্ষক ও ফিচার লেখক।












