ড. মঈনুল ইসলামের কলাম

| বৃহস্পতিবার , ২৩ জুন, ২০২২ at ৬:২২ পূর্বাহ্ণ

আয়কর সংগ্রহে সরকারের চরম ব্যর্থতার কারণ
অর্থ মন্ত্রণালয়ে নেতৃত্বের ঘাটতি

৯ জুন ২০২২ তারিখে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামালের ডিজিটাল বাজেট প্রেজেন্টেশান থেকে ২০২২-২৩ অর্থ-বছরের বাজেট সম্পর্কে যেটুকু ধারণা পাওয়া গিয়েছিল, সেটাকে খুব অতৃপ্তিকর মনে হলেও পরবর্তীতে বাজেটের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মিডিয়ায় যেসব বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপিত হয়ে চলেছে তা থেকে বলা যায় যে আগামী অর্থ-বছরের বাজেট চলমান মূল্যস্ফীতি সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণ এবং বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে এনে মারাত্মক ডলার সংকটকে মোকাবেলাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে। এই দুটো উদ্দেশ্যকেই যথাযথ বলা চলে, কারণ বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এগুলোকেই সংকটজনক ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। বেশ কয়েক বছর বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে এক ডলারের দাম ৮৫ টাকার আশেপাশে ধরে রাখায় সফল হয়ে সারা বিশ্বকে তাক্‌ লাগিয়ে দিলেও গত ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে বাংলাদেশ এক অভূতপূর্ব ডলার সংকটে নিমজ্জিত হয়ে গেছে, যার শুরুটা হয়েছিল আমদানি ব্যয়ের বেলাগাম বৃদ্ধির মাধ্যমে। ২০২১-২২ অর্থ-বছরের প্রথম দশ মাসে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বেড়েছে ৪৬ শতাংশ। ঐ দশ মাসে দেশের রফতানি আয়ও ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রাথমিকভাবে মনে করা হয়েছিল ঐ দুটো বৃদ্ধির প্রবণতা হয়তো কোভিড-মহামারির অবদমিত চাহিদার মহামারি-উত্তরণ-পর্বের উল্লম্ফনের স্বাভাবিক প্রতিফলন। কিন্তু, ঐ ভুল ভাঙতে দেরি হয়নি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর। যুদ্ধের অভিঘাতে বাংলাদেশের প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ আমদানি পণ্যের দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়া অব্যাহত থাকায় আমদানি ব্যয়ের মারাত্মক উল্লম্ফন ঘটেছে। কার্ব মার্কেটে ডলারের দাম বেড়ে যখন এক’শ চার টাকায় পৌঁছে গেলো তখন পুঁজিপাচার নিয়েও উদ্বিগ্ন হওয়াই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ ব্যাংক দ্রুত আমদানি-নিয়ন্ত্রণ পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করলো এপ্রিল মাস থেকেই, যার ধারাবাহিকতায় ২০২২-২৩ অর্থ-বছরের প্রস্তাবিত বাজেটেও প্রধান অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ডলার সংকট নিরসন এবং আমদানি নিরুৎসাহিত করার মাধ্যমে বাণিজ্য ঘাটতি দ্রুত কমিয়ে আনা। কিন্তু, এবারের বাজেটের সবচেয়ে দুর্বল দিক্‌ হলো প্রত্যক্ষ করের অবদানের গুরুতর অবনমন। আজকের কলামে এটাকেই ফোকাসে নিয়ে আসা হবে।

বাংলাদেশের কর-জিডিপি’র বর্তমান অনুপাত আট এবং নয় শতাংশের মাঝামাঝি, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম। চার বছর আগেও এই অনুপাত দশ শতাংশের উপরে ছিল, কিন্তু বর্তমান অর্থমন্ত্রী ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসে দায়িত্ব গ্রহণের পর ক্রমান্বয়ে এই হার কমতে কমতে এখন আট শতাংশের কাছাকাছি চলে এসেছে। এটা বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের চরম ব্যর্থতার পরিচায়ক, কারণ কোন দেশে যখন মাথাপিছু জিডিপি বাড়তে থাকে তখন কর-জিডিপি’র অনুপাতও দ্রুত বাড়াই হলো স্বাভাবিক প্রবণতা। বাংলাদেশের কর-জিডিপি’র অনুপাতের এই অস্বাভাবিক অবনমন দেশের সরকারী রাজস্ব-জিডিপি’র অনুপাতকেও নিচে নামিয়ে ফেলেছে। এর অবশ্যম্ভাবী পরিণাম হিসেবে সরকারের ঋণ দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। মনে রাখতে হবে, সরকারী ঋণ-জিডিপি’র অনুপাত পাঁচ শতাংশের বেশি হতে থাকলে তা ক্রমেই বাজেটে ঋণ পরিশোধের জন্য বাজেট-বরাদ্দকে বাড়িয়ে বিপজ্জনক স্তরে নিয়ে যায়। ২০২১-২২ অর্থ-বছরের বাজেটে ঋণের সুদাসল পরিশোধ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৬৮,৫৮৮ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থ-বছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ঋণের সুদাসল পরিশোধের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮০,৩৭৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৬৩ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ ঋণ পরিশোধের জন্য। বৈদেশিক ঋণে অর্থায়িত বাস্তবায়নাধীন মেগা-প্রজেক্টগুলোর ঋণ শোধের ‘গ্রেস-পিরিয়ড’ শেষ হলে আগামী অর্থ-বছরগুলোতে ঋণ-পরিশোধ খাতে বরাদ্দ আরো অনেক দ্রুতগতিতে বাড়বে। হয়তো ২০২৩-২৪ বছরের বাজেটেই তা এক লক্ষ কোটি টাকা অতিক্রম করবে। মনে হচ্ছে, ঋণ শোধের বার্ষিক কিস্তির বিষয়টি কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক বোঝায় পরিণত হতে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে মনে করিয়ে দিতে চাই, সরকারের কর-জিডিপি’র অনুপাত যেখানে ৯ শতাংশের নিচে কিংবা ৮ শতাংশের কাছাকাছি চলে এসেছে সেখানে ঋণ পরিশোধের জন্য এত দ্রুত বর্ধমান বাজেট-বরাদ্দ ‘অশনি সংকেতের’ শামিল।

বাংলাদেশ বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধির বিচারে বাংলাদেশকে সবচেয়ে গতিশীল অর্থনীতির দেশ বিবেচনা করা হচ্ছে। এই প্রবৃদ্ধিকে শক্তিশালী করার পেছনে ২০০৯ সাল থেকে সরকারী খাতের বিনিয়োগের দ্রুত প্রবৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। বেসরকারী খাতের বিনিয়োগ বেশ কয়েক বছর ধরে জিডিপি’র ২৪-২৫ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু, সরকারী খাতের বিনিয়োগের এই গতিশীলতার জন্য অর্থায়নের যোগান দিয়ে চলেছে সরকারী খাতের ক্রমবর্ধমান ঋণ। অভ্যন্তরীণ ঋণ যেমনি দ্রুতগতিতে বেড়ে চলেছে তার চাইতেও দ্রুতগতিতে বাড়ছে বৈদেশিক ঋণ। ২০২০-২১ অর্থ-বছর পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের মোট ঋণ জিডিপি’র ৪২.৫ শতাংশ ছিল, কিন্তু এর মধ্যে জিডিপি’র ১৭.৫ শতাংশ ছিল ৬২.৪৩ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ। বাংলাদেশে গত এক দশকে অনেকগুলো মেগা-প্রজেক্ট বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে যেগুলোর কয়েকটিকে স্বল্প-প্রয়োজনীয় অথবা অপ্রয়োজনীয় আখ্যা দেওয়া চলে। আমার মতে চলমান প্রকল্পের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, ঢাকা থেকে পদ্মাসেতু হয়ে যশোর এবং পায়রা বন্দর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প এবং চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী হয়ে কক্সবাজার ও ঘুনধুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প ‘সাদা হাতি’ প্রকল্পের উদাহরণ। একইসাথে, ঢাকা মেট্রোরেল প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প এবং ঢাকা এলিভেটেডএক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের ঋণশোধও প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের জন্য বোঝা সৃষ্টি করবে। চলমান মেগা-প্রজেক্টগুলোসহ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ব্যয়ের ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যেই বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ৯১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে বলে ওয়াকিবহাল মহল থেকে দাবি করা হচ্ছে, যদিও সরকার এ-সম্পর্কে কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করছে না। অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রায় সবই নেয়া হচ্ছে ব্যাংকিং খাত থেকে এবং বিভিন্ন সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে। সঞ্চয়পত্রে সুদের হার অনেক বেশি। সেজন্যই আশংকা করা হচ্ছে যে ২০২৪-২৫ অর্থ-বছর থেকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদাসলে বার্ষিক কিস্তি পরিশোধের জন্য বাজেটে এক লক্ষ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ রাখতে হতে পারে।

বাংলাদেশে এখনো আয়কর সরকারের কর-রাজস্ব আহরণের তৃতীয় সর্বোচ্চ সূত্র রয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি কর-রাজস্ব আসে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) থেকে, দ্বিতীয়-সর্বোচ্চ কর-রাজস্বের সূত্র আমদানী শুল্ক ও সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি, যেগুলোকে পরোক্ষ কর বলা হয়। (মানে, এসব কর প্রদান করছেন সাধারণ মানুষ, যদিও এগুলো আদায় করা হচ্ছে ব্যবসায়ী এবং আমদানিকারকদের মাধ্যমে)। এবারের ২০২২-২৩ অর্থ-বছরের ঘোষিত বাজেটকে ইতোমধ্যেই ব্যবসায়ী-বান্ধব আখ্যায়িত করা হয়েছে, সাধারণ জনবান্ধব তেমন কিছু বাজেটে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কর্পোরেট কর হারকে যেভাবে এবারের বাজেটে কমিয়ে ফেলার প্রস্তাব করা হয়েছে সেটা কি আদৌ প্রয়োজন ছিল? বলা হচ্ছে, বিনিয়োগ উৎসাহিত করার জন্য কর্পোরেট করহার হ্রাস করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু, এর ফলে সরকারী রাজস্ব আয়ের শতাংশ হিসেবে প্রত্যক্ষ করের অবদান বর্তমানে যতখানি অকিঞ্চিৎকর রয়েছে সেটা আরো সংকুচিত হয়ে যাওয়ার বিষয়টা কি অর্থমন্ত্রী মহোদয় বিবেচনা করেছেন? প্রস্তাবিত চার লাখ তেত্রিশ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আয়ের মধ্যে কর্পোরেট করসহ আয়করের প্রাক্কলিত অবদান হবে মাত্র এক লাখ বারো হাজার কোটি টাকা–২৫.৮৭ শতাংশ। অর্থনীতির ছাত্র হিসাবে আমাদেরকে জানানো হয়েছে, কোন দেশ যদি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয় তাহলে সে দেশের সরকারী রাজস্ব আয়ে প্রত্যক্ষ করের অবদান ক্রমেই বাড়তে থাকবে এবং পরোক্ষ করের অবদান দ্রুত কমে আসবে। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা কী দেখছি? বর্তমান অর্থমন্ত্রী ২০১৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর গত তিন বছর ধরে এদেশে কর-জিডিপি’র অনুপাত কমতে কমতে এখন ৮ শতাংশের কাছাকাছি চলে এসেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। আরো দুঃখজনক হলো, মোট কর-রাজস্বের মধ্যে প্রত্যক্ষ করের অবদানও কমে যাচ্ছে। কর-জিডিপি অনুপাত এবং প্রত্যক্ষ করের অবদানের অবনমন অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের নেতৃত্বের দুর্বলতা নয় কি?

অর্থমন্ত্রী সুযোগ পেলেই তাঁর ব্যবসায়ী বন্ধুদেরকে সুবিধা প্রদান করেন, সেটা সাড়ে তিন বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে। এবারের বাজেটেও তার ব্যতিক্রম দেখা যায়নি, কিন্তু দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত জনগণ যে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রা নির্বাহের দৈনন্দিন সংগ্রামে পর্যুদস্ত হয়ে যাচ্ছে তাদের জন্য বিশেষ কোন ব্যবস্থা বাজেটে নেই কেন? এদেশের ধনাঢ্য ব্যক্তিরা কিংবা উচ্চ-মধ্যবিত্তরা কর-ফাঁকির দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার সুবিধাভোগী রয়েই যাচ্ছেন। গত কয়েক বছর ধরে সবচেয়ে বেশি ব্যক্তিগত আয়কর পরিশোধকারী ব্যক্তি হয়ে চলেছেন হাকিম জর্দার মালিক। তাহলে প্রশ্ন উঠবে, বাংলাদেশের যে চার’শ দশ জন ধনাঢ্য ব্যক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা সংস্থা ওয়েলথ এঙের ২০১৮ সালের প্রতিবেদন মোতাবেক ত্রিশ মিলিয়ন ডলার মানে দু’শ সত্তর কোটি টাকা সম্পদের মালিক হিসেবে চিịিত হয়েছেন তাঁদের নাম কোটি টাকার বেশি আয়কর প্রদানকারীদের তালিকায় পাওয়া যাচ্ছে না কেন? স্বাধীনতার ৫২ বছর পার করছে বাংলাদেশ, অথচ এদেশের কয়েক হাজার ধনাঢ্য ব্যক্তিকে এখনো আয়করের আওতায় সঠিকভাবে আনতে না পারার দায়ভার কি অর্থমন্ত্রী এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাঁধে অর্পণ করা যাবে না? এসব ধনাঢ্য ব্যক্তির তালিকা প্রণয়ন কি এতই দুঃসাধ্য কাজ যে এনবিআর তা সঠিকভাবে করতে পারছে না? বাংলাদেশে এখন টিআইএন (ট্যাঙপেয়ার আইডেনটিফিকেশন নাম্বার) ধারী ব্যক্তির সংখ্যা পঁচাত্তর লক্ষ অতিক্রম করেছে, অথচ আয়কর-রিটার্ন জমাদানকারীদের সংখ্যা এখনো পঁচিশ লাখের নিচে রয়ে গেছে। বাকি পঞ্চাশ লাখ টিআইএনধারীদের মধ্যে পঁচিশ লাখের নাকি কোন হদিশই খুঁজে পাচ্ছে না এনবিআর! এই ব্যর্থতা কোনমতেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রশ্ন উঠবে, তাহলে কি আয়কর অফিসার ঘুষের বিনিময়ে এনআইডি নম্বরের সত্যতা যাচাই না করে টিআইএন ইস্যু করেছে? এনবিআর প্রয়োজনে আরো কয়েক’শ আয়কর অফিসার নিয়োগ করুক যাতে টিআইএনধারীদের হাঁড়ির খবর সঠিকভাবে তদন্ত করে বের করা যায়। এসব অফিসারকে প্রত্যেক বছরের জন্য সুনির্দিষ্ট টার্গেট প্রদান করা হোক্‌, ব্যর্থ হলে তাদেরকে চাকুরিচ্যুত করার শর্ত আরোপ করা হোক্‌। দুদক আয়কর বিভাগের জন্য আলাদা সেল গঠন করুক্‌।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে যে মূল্যস্ফীতর আগুন প্রজ্বলিত হয়েছে সেটা আগামী বছরেও প্রশমিত না হওয়ার আশংকা রয়েছে। এই সংকট আমাদের আমদানি ব্যয়কে আগামী বছরেও দ্রুতগতিতে বাড়াতে থাকবে। সুতরাং, বাজেট ঘোষণার আগে এবং প্রস্তাবিত বাজেটে আমদানি নিয়ন্ত্রণের যেসব পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে সেগুলো আরো সম্প্রসারিত করতে হতে পারে। না হলে আগামী বছরের আমদানি ব্যয় ৯০-৯৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যাওয়ার আশংকাকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। দেশের রফতানি আয়ও ২০২১-২২ অর্থ-বছরে ৩৪ শতাংশ বেড়ে ৩০ জুন নাগাদ ৫০-৫১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যাবে, কিন্তু ২০২২-২৩ অর্থ-বছরে রফতানি আয়ের টার্গেটকে ৬০ বিলিয়ন ডলারে নির্ধারণ করে সর্বশক্তি প্রয়োগে ঐ টার্গেট পূরণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে আমাদেরকে। একইসাথে, ফর্মাল চ্যানেলের রেমিট্যান্স এবছর যে ২২ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যাচ্ছে সেখান থেকে ঐ প্রবাহকে আগামী বছর কমপক্ষে ২৫-২৬ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যেতেই হবে। তারপরও আগামী বছর আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতনকে থামানো যাবে কিনা সন্দেহ! আগামী বছর জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি নিয়ে মাতামাতি করার তেমন যৌক্তিকতা থাকবে না। বাজেটে যদিও আগামী অর্থ-বছরে ৭.৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন ঘোষিত হয়েছে সেটাকে আমি খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি না। আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্ববহ ব্যাপার হলো আগামী বছরের মূল্যস্ফীতির হারকে দশ শতাংশের নিচে রাখতে আমরা সক্ষম হবো কিনা এবং বাণিজ্য ঘাটতি রেমিট্যান্স দিয়ে মেটানো যাবে কিনা।

লেখক : সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়