ড. মইনুল ইসলামের কলাম

রবিবার , ২০ অক্টোবর, ২০১৯ at ২:৫৩ পূর্বাহ্ণ
51

ব্যাংকিং খাত নিয়ে উল্টোপাল্টা পদক্ষেপ বন্ধ করুন : গঠন করুন ব্যাংকিং সংস্কার কমিশন
(গতকালের পর)
কয়েকটা উদাহরণ: ১) ব্যাংক মালিক, পরিচালক ও বড় ঋণখেলাপিদের অন্যায় প্রভাব খাটিয়ে যেসব খেলাপিঋণ রিসিডিউলিং (পুনঃতফশিলীকরণ) এর নিয়মানুগ সীমা তিনবারের বেশি, এমনকি নয়/দশবার পর্যন্ত, রিসিডিউল করা হয়েছে সেগুলো লুকিয়ে ফেলা হয়েছে; ২) যেসব খেলাপি ঋণের মামলা অর্থঋণ আদালতে বিচারাধীন সেগুলোকে খেলাপি ঋণ বলা যায় না; ৩) যেসব পুরানো মন্দঋণ অবলোপন করা হয় সেগুলোর ওপর সুদ ধার্য হলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে অবলোপনকৃত মন্দঋণের সুদাসলে পরিমাণ প্রকাশিত হয় না; ৪) খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে রায় হওয়ার পর যারা উচ্চতর আদালতে আপিল করে আপিল মামলাগুলোকে নিজেদের অর্থ ও প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখতে সমর্থ হচ্ছে তাদের খেলাপিঋণকে আপিল মামলা চলার সময়ে খেলাপিঋণ অভিহিত করা যায় না। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি, দেশের সিংহভাগ খেলাপিঋণ এই কয়েকটি কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্লাসিফাইড লোনের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয় না। এর মানে, খেলাপিঋণ সমস্যা প্রকৃতপক্ষে অনেক বেশি সংকটজনক পর্যায়ে চলে গেছে। উপরন্তু, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখের দি ডেইলী স্টার পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে যে ২০১৮ সালে যেখানে পুরো বছরে ২৩,২১০ কোটি টাকা ঋণ রিসিডিউল করা হয়েছিল সেখানে ২০১৯ সালের প্রথম ছয় মাসেই ২১,৩০৮ কোটি টাকার ঋণ রিসিডিউল করে ফেলেছে ব্যাংকগুলো, এবং মাত্র তিনবার কোন ঋণ রিসিডিউল করার নিয়ম থাকলেও সেটা মানা হয়নি। আরো মারাত্মক হলো, তৃতীয়বার রিসিডিউল করার জন্যে ঋণের ৫০ শতাংশ ফেরত দেওয়ার শর্ত থাকলেও তা মানা হয়নি। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯ তারিখের দি ডেইলী স্টার পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠার হেডলাইন খবরে জানা যাচ্ছে, আইএমএফ ২০১৯ সালের জুনের শেষে বাংলাদেশের খেলাপিঋণ ২,৪০,১৬৭ কোটি টাকা অতিক্রম করেছে বলে জানিয়েছে, যার মধ্যে উল্লিখিত ১,১২,৪২৫ কোটি টাকা ক্লাসিফাইড লোনের সাথে আদালতের ইনজাংশানের কারণে ঝুলে থাকা ৭৯,২৪২ কোটি টাকা, স্পেশাল মেনশান একাউন্টের ২৭,১৯২ কোটি টাকা এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে রিসিডিউলিং করা ২১,৩০৮ কোটি টাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই অংকের সাথে রাইট-অফ করা মন্দঋণ যোগ করলে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ তিন লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যাবে। সেজন্যেই সংশ্লিষ্ট মহলের কাছে আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ, প্রকৃত খেলাপিঋণের পরিমাণ লুকানোর অপপ্রয়াস বন্ধ করুন।
প্রয়োজনাতিরিক্ত সংখ্যক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক অর্থনীতি
ব্যাংকিং খাতের গুরুতর সমস্যার সমাধানে পদক্ষেপ না নিয়ে বরং ২০০৯ সাল থেকে শেখ হাসিনার সরকার দফায় দফায় নূতন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে চলেছে। দেশে এখন ৬০ টি ব্যাংক চালু রয়েছে, এবং আরো তিনটি ব্যাংক খোলার লাইসেন্স পাওয়ার পর ওগুলো পাইপলাইনে রয়েছে। আওয়ামী লীগের পাঁড় সমর্থক ও শেখ হাসিনার অন্ধভক্ত নেতা-কর্মী ব্যতিরেকে দেশের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ এক বাক্যে স্বীকার করবেন যে দেশে এখন প্রয়োজনাতিরিক্ত সংখ্যক ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে, এবং যে সব বিবেচনায় ২০০৯ সালে মহাজোট ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকে দফায় দফায় ব্যাংকের লাইসেন্স দেয়া হয়েছে তাতে অর্থনীতির স্বার্থ কিংবা জনগণের আর্থিক লেনদেনের যুক্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্যাংকের সেবা পৌঁছে দেওয়ার জন্যে নূতন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার চাইতে বিদ্যমান ব্যাংকগুলোর শাখা বিস্তারকে উৎসাহিত করা হলে অনেক কম ব্যয়ে ঐ সুবিধা অর্জন করা যেতো, আসলে প্রয়োজনাতিরিক্ত জেনেও নূতন নূতন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে স্রেফ স্বজনপ্রীতির তাগিদে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তিকে বারবার অগ্রাহ্য করা হয়েছে। এমনকি, সদ্য-প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের প্রকাশ্য আপত্তিকেও পাত্তা দেয়া হয়নি। ব্যাংকের মালিকানার লাইসেন্স অনেক ভাগ্যবানের জন্যে কোটিপতি হওয়ার সহজ পথ করে দিয়েছে। ১৯৯৮ সাল থেকে তিন বছর বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) এর মহাপরিচালক থাকার সময় থেকেই বাংলাদেশের ব্যাংকিং বিষয়ে আমার গবেষণা অব্যাহত রয়েছে। সেজন্যেই প্রাইভেট ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের হাঁড়ির খবর আমার জানা আছে।
অনেকেই হয়তো খেয়াল করেন না যে এদেশের ব্যাংকিং খাতের খেলাপিঋণ সংকট যত গুরুতরই হোক্‌, দেশের প্রায় প্রতিটি প্রাইভেট কমার্শিয়াল ব্যাংক প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ মুনাফা করে যাচ্ছে। অতএব, ব্যাংকের লাইসেন্স যাঁরা বাগাতে পেরেছেন তাঁরা এদেশে অতি সহজেই কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে যান ঐ মুনাফার ভাগ পাওয়ার কারণে। সেজন্যেই ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের’ ক্লাসিক নজির হলো ব্যাংকের মালিকানা বণ্টনের এই রাজনৈতিক দুর্নীতি। আর, এই ব্যাংক-উদ্যোক্তাদের অনেকেই তাঁদের রাজনৈতিক কানেকশনের জোরে বা প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়তার পরিচয়ে কিংবা তাঁর প্রিয়পাত্র হওয়ায় ব্যাংক প্রতিষ্ঠার লাইসেন্স পেয়ে বিনা মূলধনে অন্যান্য ব্যবসায়ীদের অর্থে তাঁদের ব্যাংকের উদ্যোক্তা-পরিচালক বনে গেছেন। মানে, তাঁদের শেয়ারের জন্যে বিনিয়োজিত পুঁজিও হয়তো ব্যাংকের অন্যান্য পরিচালকরা পরিশোধ করে দিয়েছেন। এই পরিচালকদের সিংহভাগ আবার দেশের বড় বড় ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, যাঁরা ব্যাংকের মালিকানা পেয়ে এদেশের ব্যাংক ঋণের ওপর এক ধরনের নিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জন করে ফেলেছেন। ব্যাংক কোম্পানি আইনে নিজেদের ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়ার ব্যাপারে তাঁদের ওপর নানা বিধি-নিষেধ আরোপ করা হলেও একে অপরের ব্যাংক থেকে দেদারসে ঋণ গ্রহণের সংস্কৃতি (লোন সোয়াপ) এদেশে ভয়াবহ পর্যায়ে উন্নীত হয়ে গেছে। দেশের কয়েকজন রাঘব বোয়াল ব্যবসায়ী বিভিন্ন পন্থায় এসব রাজনৈতিক কানেকশনওয়ালা ব্যাংক-লাইসেন্সধারীর কাছ থেকে নানা নামে একাধিক ব্যাংকের বিপুল শেয়ার কিনে নেয়ার মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যাংকঋণ নিজেদের ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানগুলোর দখলে নিয়ে যাচ্ছেন। চট্টগ্রামের একজন ব্যবসায়ী নাকি এখন সাতটি ব্যাংকের উপর মালিকানা প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন! (ব্যাংকগুলোর ঋণ নিয়ে ঐ ব্যবসায়ী নয় ছয় করছেন বলে ব্যাংকারদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে, বেনামী ঋণে নাকি সয়লাব হয়ে যাচ্ছে ব্যাংকগুলো।) একজন ব্যক্তিকে এতগুলো ব্যাংকের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে দিয়ে পুরো ব্যাংকিং খাতকে বড়সড় ঝুঁকিতে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের অভিমত। ব্যাংকের মালিকানায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এত সহজ সুযোগ অন্য কোন দেশে চালু আছে কিনা আমার জানা নেই।
প্র্রকৃত প্রস্তাবে ব্যাংকের এসব মালিকদেরকে অভিহিত করা উচিত ‘কথিত মালিক’, কারণ ব্যাংকের আসল মালিক আমানতকারীরা। ব্যাংকের উদ্যোক্তারা কিংবা পরিচালকরা এমনকি শেয়ার হোল্ডাররা ব্যাংকের ‘প্রকৃত মালিক’ নন, কারণ একেকটি ব্যাংক যে হাজার হাজার কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করে ঋণপ্রদানের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে তার তুলনায় সম্মিলিতভাবে উপর্যুক্ত তিন ধরনের মালিকদের বিনিয়োজিত পুঁজি (ঢ়ধরফ-ঁঢ় পধঢ়রঃধষ) দশ শতাংশের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। একটি আধুনিক অর্থনীতির সুস্বাস্থ্যের জন্যে সুস্থ ও সবল (ৎড়নঁংঃ) ব্যাংকিং সিস্টেম যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ সেটা ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার পর এখন বিশ্ববাসীর জানা হয়ে গেছে। বিশেষত, আমাদের দেশে পুঁজিবাজার যেহেতু অনুন্নত এবং গুরুত্বহীন রয়ে গেছে তাই ব্যাংকিংকে এদেশে এখনো স্বল্পমেয়াদী ঋণের পাশাপাশি মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী ঋণের প্রধান যোগানদাতার ভূমিকাও পালন করে যেতে হচ্ছে। দেশের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধির যে সুবাতাস বইতে শুরু করেছে সেটাকে বেগবান করতে হলে জাতীয় সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়াকে আরো জোরদার করতেই হবে। আর, এজন্যে প্রয়োজন সবল ও স্বচ্ছ ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরো বেশি শৃঙ্খলাধীন ও সুনিয়ন্ত্রিত করার প্রক্রিয়াকে জোরদার করা। নূতন নূতন ব্যাংক চালু হওয়ায় এখন আমানত নিয়ে যে অসুস্থ কাড়াকাড়ি পরিদৃষ্ট হচ্ছে তার ফলে ব্যাংকাররা মরিয়া হয়ে নানা ফন্দি-ফিকিরের আশ্রয় নিচ্ছেন, যা ব্যাংকিং খাতের পরিবেশ দূষিত করে চলেছে। আমানত সংগ্রহের প্রতিযোগিতার ফলে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন ব্যাংক আমানতের উপর নয় শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিয়ে যাচ্ছে বলে পত্র-পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে ব্যাংক ঋণের সুদের হার বাড়ানোর জন্যে পুরো ব্যাংকিং খাতে আবার প্রবল চাপ সৃষ্টি হয়েছে। (ঋণের উপর ‘সিঙ্গল ডিজিট’ সুদের হার কি তাহলে শুধুই ‘নির্বাচনী স্টান্ট’ ছিল?)
খেলাপিঋণ কেন হয়: একটি গবেষণার ফলাফল
১৯৯৮ সালে তিন বছরের ডেপুটেশানে আমি বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের মহাপরিচালক হিসেবে যোগদানের পর আমার নেতৃত্বে চারজনের একটি গবেষক টিম বাংলাদেশের প্রাইভেট সেক্টরের খেলাপিঋণের ওপর একটি গবেষণা প্রকল্প শুরু করি। ১৯৯৭ সালে তদানীন্তন অর্থমন্ত্রী শাহ এ, এম, এস, কিবরিয়া সংসদে যে ২১১৭ জন ঋণগ্রহীতার এক কোটি টাকার বেশি ঋণ অনাদায়ী ছিল তাদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছিলেন। ঐ তালিকা থেকে দৈব চয়নের মাধ্যমে বাছাই করা ১২৫ টি ঋণখেলাপি ব্যাংকঋণ-গ্রহীতা ফার্মের ওপর জরিপের মাধ্যমে পরিচালিত গবেষণাটির প্রাথমিক পর্ব সম্পন্ন হওয়ার পর ১৯৯৯ সালের মে মাসে প্রাথমিক ফলাফলগুলো একটি জাতীয় সেমিনারে উপস্থাপনের পর ফলাফলগুলো নিয়ে দেশে-বিদেশের মিডিয়ায় প্রচণ্ড আলোড়ন সৃষ্টি হয়। ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদানীন্তন গভর্নর প্রয়াত লুতফুর রহমান সরকারের সুনির্দিষ্ট আশ্বাস পেয়ে আমরা গবেষণা প্রকল্পটি শুরু করলেও দুঃখজনকভাবে ১৯৯৯ সালের মে মাসের ঐ সেমিনারের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের নবনিযুক্ত গভর্নর গবেষণা টিমের সাথে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে, প্রায় ছয় মাস গবেষণা বন্ধ রাখার পর বাধ্য হয়ে আমি গবেষণা পদ্ধতি পরিবর্তন করে ‘কেইস স্টাডি’ অনেক বাড়িয়ে দিয়ে ২০০১ সালে গবেষণা সম্পন্ন করি। কিন্তু, আমার ডেপুটেশনে নিয়োগের এক্সটেনশান বাতিল সহ আবার নতুন ঝামেলা সৃষ্টি হওয়ায় কয়েক বছর ‘গবেষণা প্রতিবেদন’ রচনা বন্ধ রাখতে হয়। এরপর বহু বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে ২০০৭ সালে আমি এবং আমার সহ-গবেষক (ও ছাত্র) মহিউদ্দিন সিদ্দিকী গবেষণা প্রতিবেদন রচনা সম্পন্ন করি। কিন্তু, প্রতিবেদনটি বই হিসেবে প্রকাশে আবারো নানারকম সমস্যা সৃষ্টির কারণে দীর্ঘ বিলম্বের পর ২০১০ সালে আমাদের নিজের উদ্যোগে অ চৎড়ভরষব ড়ভ ইধহশ খড়ধহ উবভধঁষঃ রহ ঃযব চৎরাধঃব ঝবপঃড়ৎ রহ ইধহমষধফবংয নামে বইটি প্রকাশিত হয়। ব্যাংকিং সেক্টরে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টিকারী বইটি এদেশে খেলাপি ঋণের ওপর একমাত্র পূর্ণাঙ্গ গবেষণাগ্রন্থ। বোধগম্যভাবে ঝামেলাও পোহাতে হয়েছিল হয়তো বিষয়টির স্পর্শকাতরতার কারণেই! নিচে গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলগুলো উপস্থাপন করা হলো:
২১১৭ জন কোটি টাকার বেশি ঋণ আটকে রাখা ঋণখেলাপিদের উল্লিখিত তালিকা থেকে দৈব চয়নের মাধ্যমে ১২৫ টি ঋণগ্রহীতা ফার্ম বাছাই করে তাদের ওপর জরিপটি পরিচালিত হয়েছিল, জরিপের নাম দিয়েছিলাম ্তুঅ চৎড়ভরষব ড়ভ ঈৎবধঃরাব ঊহঃৎবঢ়ৎবহবঁৎং ড়ভ ইধহমষধফবংয্থ। ১৯৯৮-৯৯ সালে দেশের ব্যাংকঋণের প্রায় ৫০ শতাংশই ছিল ক্লাসিফাইড, আর ক্লাসিফাইড ঋণের ৮৭ শতাংশই ছিল মন্দঋণ, মানে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে খেলাপিঋণ। জরিপের মূল জবাবদাতা (ৎবংঢ়ড়হফবহঃ শবু-ঢ়বৎংড়হ) ১২৫ জনই ছিলেন মন্দঋণ-গ্রহীতা ফার্মের মালিক। ২০০০ সালে সংজ্ঞা পরিবর্তনের মাধ্যমে ক্লাসিফাইড লোনের অনুপাত কৃত্রিমভাবে কমানোর কৌশল অনুসরণ শুরু হয়, ২০০২ সালে ‘রাইট-অফ’ প্রক্রিয়া চালু করার মাধ্যমে মন্দঋণের পরিমাণ লুকিয়ে ফেলার ব্যবস্থা গৃহীত হয়। তখন থেকে বারবার নিয়মবহির্ভূতভাবে মন্দঋণ রিসিডিউলিং করার কালচার ব্যাংকগুলোতে গেড়ে বসতে শুরু করে, এবং নতুন ঋণ অনুমোদন দিয়ে পুরানো ঋণকে নতুনের সাথে এডজাস্ট করার বদখাসলতও কালচার হিসেবে বিস্তার লাভ করে।
১৯৭২-৭৫ পর্বে যেহেতু ব্যাংকঋণের মাত্র ৪ শতাংশ প্রাইভেট সেক্টরে ঋণ হিসেবে প্রদত্ত হয়েছিল, তাই ঐ সময় খেলাপিঋণ সমস্যা উল্লেখযোগ্য ছিল না। ১৯৭৫-৮১ পর্বে সমরপ্রভু জিয়াউর রহমানের শাসনকালে ব্যাংকঋণের ৯৬ শতাংশ প্রাইভেট খাতের ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে বিতরণ করা হয়, যার বেশিরভাগই ছিল নির্দেশিত ঋণ (ফরৎবপঃবফ ষড়ধহং)। জিয়ার কেনা-বেচার রাজনীতির প্রয়োজনেই সরাসরি তাঁর নির্দেশে এই ঋণগুলোর অধিকাংশ অনুমোদিত হয়েছিল, যার ফায়দা লুটেছে বিএনপি’তে যোগদানকারী ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, সিভিল আমলা, সামরিক অফিসার এবং রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা। ঐ সময়ের সিংহভাগ ঋণ মন্দঋণে পরিণত হয়েছে। সমরপ্রভু এরশাদ একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছেন তাঁর প্রায় পৌনে নয় বছরের শাসনামলে। তাঁর সময়ে আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংকের চাপে দ্রুত আমদানি উদারীকরণের নীতিমালা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কারণে দেশের শিল্পখাতে ‘রুগ্ন শিল্প’ সমস্যা বিস্তার লাভ করে, যেটা খেলাপি ব্যাংকঋণ সমস্যায় ঘৃতাহুতি দেয়। রুগ্ন শিল্পের অজুহাতে ঋণ ফেরত না দেওয়ার সমস্যা (ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি সমস্যা) আশির দশকের শেষে ব্যাংকিং খাতের গুরুতর সমস্যা হিসেবে জনগণের মনোযোগের কেন্দ্রে চলে আসে, এবং সমস্যাটি সমাধানের উদ্দেশ্যে এরশাদ আমলেই একটি ব্যাংকিং সংস্কার কমিটি গঠিত হয়।
১৯৯০-৯১ সালের বিচারপতি সাহাবউদ্দীনের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রথম দেশের ঋণখেলাপিদের একটি তালিকা প্রণয়ন করে, যেটা ১৯৯১-৯৬ মেয়াদে ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের সময় সংসদে উপস্থাপিত হয়। সাহাবউদ্দীন সরকার ফাইনেন্সিয়াল সেক্টর রিফর্মস প্রজেক্ট (ঋঝজচ) গ্রহণ করে, যেটা পরবর্তী বিএনপি সরকারের সময় প্রতিবেদন জমা দেয়। ১৯৯১ সালে ব্যাংক কোম্পানি আইন প্রণীত হয়, এবং এর পরবর্তীতে অর্থঋণ আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব পদক্ষেপের ফলে ১৯৯২-৯৩ সালে খেলাপিঋণ সমস্যা বাড়ার প্রবণতা শ্লথ হলেও দলের নেতা-কর্মীদের চাপে ১৯৯৪ সালে বিএনপি সরকার আবার ঋণ প্রদানের নিয়মনীতি শিথিল করতে বাধ্য হয়, যার ধারাবাহিকতায় ১৯৯৫-৯৮ পর্বে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রদত্ত ঋণের প্রায় সবই অনাদায়ী হওয়ায় খেলাপি ঋণ সমস্যা মহাসংকটে পরিণত হয়। ১৯৯৮ সালের জুলাইয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত হিসাবে ক্লাসিফাইড লোনের অনুপাত নির্ধারিত হয় ৪১.১৮ শতাংশ। বিশ্ব ব্যাংক দাবি করে যে ১৯৯৯ সালের মার্চে ব্যাংকঋণের ৫০ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছিল (দি বাংলাদেশ অবজার্ভার, ৩ মে ১৯৯৯, পৃঃ ১৯)। এরপর থেকে খেলাপিঋণের অনুপাত লুকিয়ে ফেলার নানা কায়দা-কানুন অনুসরণের ফলে এখন যদিও ক্লাসিফাইড লোনের অনুপাত মোট ঋণের ১২ শতাংশের সামান্য কম দেখানো হচ্ছে, কিন্তু খেলাপিঋণের সত্যিকার অনুপাত এখন ৩০ শতাংশের কাছাকাছি বা বেশি হতে পারে (তিন লক্ষ কোটি টাকার কাছাকাছি), যে ব্যাপারটা প্রবন্ধে ইতোমধ্যেই বলেছি। (প্রবন্ধের ভূমিকায় খেলাপিঋণের সংকটকে লুকিয়ে ফেলার কায়দা-কানুনগুলো উল্লিখিত হয়েছে।)
গবেষণার পাঁচটি হাইপথেসিস ছিল: ক) খেলাপিঋণের জন্যে ঋণগ্রহীতা, ব্যাংকার এবং তাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকরাই দায়ী; খ) ব্যাংকারের সক্রিয় যোগসাজশ ও অংশগ্রহণ ঋণ খেলাপ হওয়ার জন্যে অপরিহার্য উপাদান; গ) অতি দ্রুত বাণিজ্য উদারীকরণ রুগ্ন-শিল্প সমস্যা সৃষ্টির মাধ্যমে ঋণখেলাপি সমস্যায় বিশাল ইন্ধন যুগিয়েছে; ঘ) খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের রাজনৈতিক প্রতিপত্তি ও সামাজিক প্রতাপ ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলোর ব্যর্থতার জন্যে প্রধানত দায়ী; এবং ঙ) চোরাচালান ও বিদেশে পুঁজি পাচারের (পধঢ়রঃধষ ভষরমযঃ) জন্যে ঋণের অর্থ সরিয়ে ফেলায় খেলাপি ঋণ সমস্যা সংকটজনক পর্যায়ে চলে গেছে।
গবেষণার তাত্ত্বিক অবস্থান হলো: বাংলাদেশের নব্য-ঔপনিবেশিক (হবড়-পড়ষড়হরধষ), প্রান্তীয় পুঁজিবাদী (ঢ়বৎরঢ়যবৎধষ পধঢ়রঃধষরংঃ), আমলাতান্ত্রিক (নঁৎবধঁপৎধঃরপ) ও পুঁজি-লুন্ঠনমূলক (বীঃৎধপঃরাব) রাষ্ট্রচরিত্রই খেলাপিঋণ সমস্যা গুরুতর হওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান খলনায়কের ভূমিকা পালন করছে। মানে, রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন মহলের পৃষ্ঠপোষকতা ব্যতিরেকে খেলাপিঋণ-গ্রহীতারা এত দীর্ঘকাল ব্যাংকঋণ লুন্ঠন কিছুতেই চালাতে পারে না।
যে ২১১৭ জন ঋণগ্রহীতা ফার্মের নাম প্রকাশিত হয়েছিল তার বিভাগওয়ারী বিন্যাসে তখনকার ছয়টি বিভাগের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬৫.৭১ শতাংশ খেলাপি ছিল ঢাকা বিভাগের, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৮.০৯ শতাংশ ছিল চট্টগ্রাম বিভাগের, তৃতীয় খুলনা বিভাগের হিস্যা ছিল ৭.৬৫ শতাংশ, চতুর্থ রাজশাহী বিভাগের হিস্যা ছিল ৫.৯৫ শতাংশ, পঞ্চম বরিশাল বিভাগের হিস্যা ছিল মাত্র ১.২৮ শতাংশ, আর সবচেয়ে কম মাত্র ১.০৮ শতাংশ হিস্যা ছিল সিলেট বিভাগের। দেখা যাচ্ছে, ঢাকা এবং চট্টগ্রামের ফার্মগুলোই প্রায় ৮৪ শতাংশ বড় ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। (তার মানে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকতা ঢাকা ও চট্টগ্রামের ঋণগ্রহীতারা অনেক বেশি পেতে সক্ষম!) ফলে, আমরা প্রথম ১০০০টি ফার্মকে ংধসঢ়ষরহম ভৎধসব হিসেবে ব্যবহার করে ওখান থেকে আমাদের গবেষণায় দৈব চয়নের ভিত্তিতে ১২৫ টি ফার্ম বাছাইয়ে (জবাবদাতা) ঢাকা ও চট্টগ্রামের উপরে উল্লিখিত অনুপাতই ব্যবহার করেছি।
১২৫ টি ফার্মের মধ্যে ৮৩.২ শতাংশ ছিল উৎপাদনে নিয়োজিত ফার্ম, ৬.৪ শতাংশ বাণিজ্যিক ফার্ম, আর ১০.৪ শতাংশ সেবাখাতের ফার্ম। ফার্মগুলোর ৫২ শতাংশ পারিবারিক মালিকানার প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি, আর ৪৩ শতাংশ পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি। ৭১ শতাংশ জবাবদাতার আরো একাধিক ব্যবসা-বাণিজ্য রয়েছে। ৫৪.৪ শতাংশ জবাবদাতার ক্ষেত্রে ৩-৫ জন পারিবারিক সদস্য-সদস্যা ফার্মের পরিচালনা বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত। আর, ৫৯ শতাংশের ক্ষেত্রেই বোর্ডের পরিচালকরা ৫-১০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে পরিচালক রয়েছেন।
প্রায় ৭৭ শতাংশ জবাবদাতা এক থেকে তিনবার পর্যন্ত রাজনৈতিক দল পরিবর্তন করেছেন। ৭৭.৬ শতাংশ জবাবদাতাই স্বীকার করেছেন যে তাঁরা ঋণ পাওয়ার জন্যে তাঁদের রাজনৈতিক সম্পর্ক ব্যবহার করেছেন। তাঁদের মধ্যে ৪৬.৪ শতাংশ প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী, ৩৫.১ শতাংশ সংসদ সদস্য এবং ১৩.৪ শতাংশ ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় নেতার প্রত্যক্ষ সহায়তায় ঋণ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
(চলবে)
লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ; চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের
অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর

x