ঢাকার কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দিয়ে গণঅধিকার পরিষদের একটি মিছিল যাওয়ার সময় সংঘর্ষে জড়িয়েছেন দুই পক্ষের নেতাকর্মীরা। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় সেখানে বেশ কিছুক্ষণ ঢিল ছোড়াছুড়ির পর পুলিশ ও সেনাবাহিনী গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। সংঘর্ষে গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর আহত হয়েছেন। খবর বিডিনিউজের।
পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেন, মশাল মিছিলের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লাঠিপেটায় নুরুল হক নুর গুরুতর আহত হয়েছেন। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এর আগে আহত নুরকে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নেওয়ার তথ্য দেন রাশেদ।
গণ অধিকার পরিষদের দাবি, তাদের মিছিলের পেছন থেকে হামলা করেছে জাতীয় পার্টি। অন্যদিকে জাতীয় পার্টির পাল্টা অভিযোগ, তাদের প্রধান কার্যালয়ে হামলা হয়েছে ওই মিছিল থেকে। গণ অধিকার পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য আবু হানিফ এক বার্তায় বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে সন্ধ্যায় তাদের বিক্ষোভ কর্মসূচি ছিল। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় দিকে পল্টন মোড়ে তাদের মিছিলের পেছনের অংশে হামলা করা হয়। জাতীয় পার্টির অফিসের সামনে থেকে দুই–তিনশ লোক এই হামলায় অংশ নেয় এবং হামলাকারীদের মধ্যে আওয়ামী লীগ, যুবলীগও ছিল বলে হানিফের দাবি। তিনি বলেন, এক পর্যায়ে গণ অধিকার পরিষদের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা প্রতিরোধ করলে সেখানে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এদিকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের প্রেস সচিব খন্দকার দেলোয়ার জালালী এক বার্তায় দাবি করেন, জাতীয় পার্টি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ‘সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা’ ঘটেছে।
রমনা থানার পরিদর্শক আতিকুল আলম খন্দকার ছিলেন ঘটনাস্থলে। তিনি বলছেন, সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে দুই পক্ষের মধ্যে ঢিল নিক্ষেপের ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে যায়। পুলিশ ও সেনাসদস্যরা ঘটনাস্থলে রয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে।
জাতীয় পার্টির কার্যালয়ের সামনে বিজয় নগর সড়কে মিছিলের নেতৃত্বে দেয়া নেতাদের একজন গণঅধিকার পরিষদের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সহ সভাপতি ওমর ফারুক বলেন, ‘জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের দোসর, তাদের নিষিদ্ধ না করা পর্যন্ত এখান থেকে যাব না।’
বাংলানিউজের খবরে বলা হয় : গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর ও দলটির নেতাকর্মীদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। পাশাপাশি এ ঘটনার তদন্ত করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি। গতকাল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নুরকে দেখতে গিয়ে এ কথা জানান শফিকুল আলম।
তিনি বলেন, আমি কর্তব্যরত চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেছি। ডাক্তাররা জানিয়েছেন, নুরের নাক ও চোখের কাছে আঘাত লেগেছে, ইন্টার্নাল ব্লিডিং হচ্ছে এবং তিনি সেমি–কনশাস অবস্থায় আছেন। চিকিৎসকরা কিছুক্ষণের মধ্যে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেবেন পরবর্তী পর্যবেক্ষণের জন্য। পাশাপাশি কিছু টেস্টও করবেন। শফিকুল আলম আরও বলেন, নুরের ওপর হামলা খুবই ন্যাক্কারজনক একটি ঘটনা। আমরা এটার নিন্দা জানাই। এই পুরো ঘটনা আমরা তদন্ত করব।
প্রেস সচিব আরও বলেন, যখন দেশে মানুষের সাহসের অভাব ছিল, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে কেউ দাঁড়ায়নি, তখন ২০১৮ সালে নুরুল হক নুর কোটাবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার সাহস আপনারা দেখেছেন। ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে নুরসহ গণঅধিকার পরিষদের সবাই ছিলেন। ১৯ জুলাই রাতে নুরকে গ্রেপ্তার করে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। তার ওপর আজকের হামলার ঘটনাটিও তদন্ত করা হবে।
এদিকে বাসস জানায় : রাজধানীর কাকরাইলে জননিরাপত্তা রক্ষার্থে আইন–শৃঙ্খলা বাহিনী বল প্রয়োগে বাধ্য হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। এ ঘটনায় সেনাবাহিনীর ৫ জন সদস্য আহত হয়েছে বলেও জানানো হয়। গতকাল শুক্রবার রাতে সহকারী পরিচালক রাশেদুল আলম খান স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এতথ্য জানায় আইএসপিআর।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাত আনুমানিক ৮ টায় রাজধানীর কাকরাইল এলাকায় দুটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া–পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এ সময় বেশ কয়েকজন আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়। প্রথমে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। তবে একপর্যায়ে সংঘর্ষ বেড়ে গেলে তারা সেনাবাহিনীর সহযোগিতা কামনা করে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে তাদের ওপর আক্রমণ চালানো হয় এবং এতে কয়েকজন সদস্য আহত হন।
বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, ঘটনার শুরুতে আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উভয় পক্ষকে শান্ত থাকতে এবং শান্তিপূর্ণ ভাবে স্থান ত্যাগ করার জন্য ও দেশের বিদ্যমান আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়া নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য দূর করার অনুরোধ জানায়। তবে বারংবার অনুরোধ সত্ত্বেও কতিপয় নেতাকর্মীরা তা উপেক্ষা করে মব ভায়োলেন্সের মাধ্যমে পরিস্থিতি অশান্ত করার চেষ্টা করে। তারা সংগঠিতভাবে আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায় এবং আনুমানিক রাত ৯ টার দিকে মশাল মিছিলের মাধ্যমে সহিংসতা আরও বৃদ্ধি করে। এ সময় তারা ইট–পাটকেল নিক্ষেপ করে এবং বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দেওয়ারও চেষ্টা চালায়। এছাড়াও বিজয়নগর, নয়াপল্টন ও তৎসংলগ্ন এলাকায় সাধারণ জনগণের চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং জনদুর্ভোগ বৃদ্ধি পায়।
উদ্ভূত ঘটনায় সেনাবাহিনীর ৫ জন সদস্য আহত হয় উল্লেখ করে আইএসপিআর জানায়, তারা আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর শান্তিপূর্ণ সমাধানের সকল চেষ্টা অগ্রাহ্য করে। ফলে, জননিরাপত্তা রক্ষার্থে আইন–শৃঙ্খলা বাহিনী বল প্রয়োগে বাধ্য হয়। এতে আরো বলা হয়, সরকার সকল ধরনের মব ভায়োলেন্সের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। সেনাবাহিনী সরকারের এই সিদ্ধান্ত পুনর্ব্যক্ত করছে এবং জনমনে স্বস্তি ও নিরাপত্তা আনয়নে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে সদা প্রস্তুত রয়েছে। জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা ও শান্তি বজায় রাখতে সেনাবাহিনী সর্বদা বদ্ধপরিকর।