জনগণের প্রত্যাশার মর্যাদা রক্ষা করাই হবে আগামী নেতৃত্বের বড় দায়িত্ব

| রবিবার , ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ

নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ে দেশের আপামর জনসাধারণ অভিনন্দন জানিয়েছে। বিজয়ীদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা থাকবে একটাইতারা বাংলাদেশকে এগিয়ে নেবে সামনের দিকে, সব ক্ষেত্রে। ’২৪এর জুলাই গণ অভ্যুত্থানের পরও এ দেশের মানুষ নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। বৈষম্যহীন এক ঐক্যের বাংলাদেশ চেয়েছিল। শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসও আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, ‘আর বিভক্তি নয়, বাংলাদেশ হবে এক পরিবার।’ তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশ হবে বিশ্বের উদাহরণ।’ কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, গত ১৮ মাসে এসব সুন্দর কথার বাস্তবায়ন শত চেষ্টার পরও হয়নি। বরং হিংসার আগুনে দগ্ধ হয়েছে বাংলাদেশ। নানা অদূরদর্শিতা আর ভুল সিদ্ধান্তের কারণে প্রায় সব ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। শুরু থেকেই মব সংস্কৃতি এমনভাবে চলেছে এবং তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে একটি শক্তির কাছে সরকার আত্মসমর্পণ করেছে। বাংলাদেশে গত দেড় বছরের বেশি সময়ে মানবাধিকার সংগঠক ও সংস্থাগুলোর কাছে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে অজ্ঞাতনামা লাশের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, কারা ও নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যু আর মব সন্ত্রাস। এ সময়ে বারবার সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে। দেশের মানুষ প্রত্যাশা করে, নির্বাচনের মাধ্যমে যারা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন, তারা মব সন্ত্রাস থেকে জাতিকে মুক্ত করবেন। সন্ত্রাসমুক্ত এক বাংলাদেশের যাত্রা হবে এখন।

এক বছর আগে ২০২৫ সালের শুরুতেই প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, ২০২৪ সালের ৪ আগস্টের পর থেকে পরবর্তী পাঁচ মাসে দেশের ৪০টি মাজারে (মাজার/সুফি কবরস্থান, দরগা) ৪৪ বার হামলা চালানোর অভিযোগ পেয়েছিল পুলিশ। এর পরেও সেই পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। জনগণের আশা, নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেই এসব অরাজকতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেবে। এ ধরনের অপকর্মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারএর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকারের ১৪ মাসে দেশে অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এসেছে। দেশের মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ চায়। সেই আশা নিয়েই আজ তারা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন।

ইতোমধ্যে বিচারের ক্ষেত্রে ‘বিচার নাকি প্রতিশোধ’ সেই প্রশ্ন ওঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে। সরকারের শুরু থেকেই ঢালাও হত্যা মামলা এবং এসব মামলায় ব্যবসায়ী, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে জড়িত করা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। যেসব মামলায় বিচার হচ্ছে, তাও কতটা প্রভাবহীন ও স্বচ্ছ সেই প্রশ্নও আছে। দেশবাসীর প্রত্যাশা, মামলা বাণিজ্যের ভয়াবহ ব্যাধি থেকে জাতিকে মুক্তি দেবে আগামী সরকার।

দেশবাসীর প্রত্যাশা, এখন থেকে অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তির সূচনা দিন হবে। নতুন সরকার এসে বেসরকারি খাতকে আস্থায় নিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন পথে যাত্রা করবে।

বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও ছিল আতঙ্ক আর উদ্বেগ। উগ্রবাদীদের হুমকির মুখে বাতিল হয়েছে কনসার্ট, নাটক। হেনস্তার শিকার হয়েছেন শিল্পীরা। এ দমবন্ধ অবস্থার অবসান চান দেশের সাংস্কৃতিক কর্মীরা। তাই সবার কামনা নতুন সরকার হোক সংস্কৃতিবান্ধব।

নতুন সরকারের কাজ হোক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর পক্ষে। শিক্ষা, চাকরি, খেলাধুলা, মতপ্রকাশ, বাকস্বাধীনতা, সংস্কৃতি ও স্বাধীন চলাচলের পক্ষে। সংগীত, নৃত্য, নাটক, চারুকলা, ভাস্কর্য ও স্থাপত্যের পক্ষে। পহেলা বৈশাখ, বসন্তবরণ, ভালোবাসা দিবস, লালন মেলা, উরস, সাধুসঙ্গের পক্ষে। মুক্তচিন্তার পক্ষে। প্রশ্ন করার অধিকারের পক্ষে। যুক্তি, বিজ্ঞান ও বিবর্তনের পক্ষে। ধর্মীয় উগ্রবাদ, জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে। সন্ত্রাস, মব ও সহিংসতার রাজনীতির বিরুদ্ধে। মানবিক রাষ্ট্রের পক্ষে। মানুষের মর্যাদা, স্বাধীনতা ও অধিকারের পক্ষে। তাদের সামনে থাকবে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক পুনর্মিলনের চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বিভক্ত সমাজে সমঝোতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা সবচেয়ে কঠিন কাজ হবে। আন্দোলনের পর আবেগকে স্থিতিশীল নীতিনির্ধারণে রূপান্তর করা একটি বড় পরীক্ষা। বাংলাদেশের মানুষ আজ যে প্রত্যাশা নিয়ে ভোট দিয়েছে, সেই প্রত্যাশার মর্যাদা রক্ষা করাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।

পূর্ববর্তী নিবন্ধ৭৮৬
পরবর্তী নিবন্ধএই দিনে