তিলোত্তমা মজুমদার, একজন ভারতীয় বাঙালি মহিলা উপন্যাসিক, গল্পকার, ছোটগল্পকার, কবি, গীতিকার ও প্রবন্ধকার। তার উপন্যাস ‘চাঁদের গায়ে চাদ‘। যেখানে তিনি দেখিয়েছেন
মানুষের অন্তর্গত আত্মার চন্দ্রিমা প্রকৃতিকে এভাবে, আত্মনির্ণয় বিপন্নতাই মানুষের সবচেয়ে বড় অসুখ। যে অসুখ শ্রুতি বসুকে নিরন্তর অপূর্ণতার দিকে ঠেলে দিয়েছে। গ্রাম্য সহজ সরল স্কুলের একজন ভাল ছাত্রী শ্রুতি বসু কোলকাতায় পড়তে এসে আত্মবিস্মৃত হয়েছিল এই বিপন্নতার ই অজ্ঞাত হস্তক্ষেপে। তারই ঘূর্ণাবর্তে শ্রুতি বসু বন্যায় বিধ্বস্ত নৌকার মত টুকরো টুকরো ভাঙছিল। অথচ এই ভাঙন হন্তারক ছিল না। শ্রুতি নিজেই একদিন নির্ণয় করেছিল নিজেকে। সংসারের সুখ দুঃখ, আনন্দ বেদনা, কর্ম জীবন তাকে দিয়েছিল মানবজীবনের বহুমাত্রিক অস্তিত্বের খবর। অনেক ভাঙনের পর, দর্শনের পর সে নিজের অন্তর্গত আত্মার চান্দ্রপ্রকৃতিকে বুঝতে পেরেছিল। নিজের ভিতর দৃষ্টি রেখে, সত্যের খোঁজে, মানুষের স্বাভাবিক প্রকৃতিতে শ্রুতির ছিল অমোঘ নির্ণয়।
এই যে আত্মনির্ণয়, বিষণ্নতা, নিরন্তর অপূর্ণতা, বিস্মৃতি, জীবনের ভাঙাগড়া, সংসারের দুঃখ সুখ, কর্মজীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাত শ্রুতি কে মানবজীবনের বহুমাত্রিক অস্তিত্বের খবর দিয়েছিল তা তার নিজেরই অন্তর্গত আত্মার চান্দ্রপ্রকৃতি।
যে চান্দ্রের স্পর্শে সদা জাগরুক থাকে রূপ, সৌন্দর্য, শুভ, আশা, শান্তভাব, ঝিলমিল ছন্দ যা প্রেমের প্রতীক, যুগে যুগে যা মানুষের হৃদয় মনকে করেছে পুলকিত। কিন্তু আবার যখন শুনি– ‘চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে / আমরা ভেবে করব কি? এ কি কথা! একি তত্ত্ব! এটি আধ্যাত্মিক ও তত্ত্বকথা সম্বৃদ্ধ একটি বাউল গান। যেমন দেহতত্ত্ব্, সৃষ্টিতত্ত্ব, সাধনতত্ত্ব । যেখানে অন্তরঙ্গের নানা জঠিল ও গভীর বিষয়ে বাউলতত্ত্বের এ ব্যাখ্যা রূপক ও ধাঁধার মাধ্যমে পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার মিলনের এক অপূর্ব বর্ণনার উপস্থাপন। অনেকে সবিস্ময়ে বলেন এ গান যতই বোঝার চেষ্টা করি ততই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায়। তাইতো গান উপাসনা।
যেহেতু এ গানের গূঢ়তত্ত্ব ও মর্ম অনেক গভীর ও বিপুল রহস্যময় তবুও অনেক তাত্ত্বিক, গবেষক ও বাউলতত্ত্ববিদ এ গানের অনেক ব্যাখ্যা দিয়েছেন নিজেদের মত করে।
বাউলতত্ত্বে চাঁদ হল মানব দেহের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বা শক্তি। বাউলতত্ত্বের এ গান চাঁদকে অনেকে মানব দেহের শুক্র বা সূক্ষ্ম সত্তা বলে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। যা বাঙলার গুপ্ত এক সম্প্রদায়ের তত্ত্ব। এ এক অনিবার্য সত্যকে তারা ধারণ করে আছে।
বাউলদের গানে মানুষ এবং তার দেহভাণ্ডারই মুখ্য। তারা বিশ্বাস করেন সকল মানুষের মাঝে বাস করে এক ‘মনের মানুষ’‘।আর সেই ‘মনের মানুষ’ এর সন্ধান পাওয়া যায় আত্ম এবং আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে। দেহের ভেতরেই ‘মনের মানুষ’ এর অবস্থান যাকে কেউ কেউ ‘অচিন পাখি’ বলেছেন। সেই পাখীর সন্ধান মেলে পার্থিব দেহ সাধনার ভেতর দিয়ে দেহোত্তর জগতে পৌঁছানোর মাধ্যমে। আর এটাই বাউলতত্ত্বে নির্বাণ বা মোক্ষ বা মহামুক্তি লাভ।
বাউলরা সকল কিছুর ঊর্ধ্বে মানবতাবাদকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছেন। তারা বিশ্বাস করেন মনের মানুষের কোন ধর্ম, জাত, বর্ণ, লিংগ, কুল নেই। মানুষের দৃশ্যমান শরীর এবং অদৃশ্য মনের মানুষ পরষ্পর বিচ্ছিন্ন কিন্তু শরীরেই সে মনের বাস। সকল মানুষের হৃদয়ে বা মনে ঈশ্বর বাস করেন।
বাউলরা মানবাত্মাকে বিবেচনা করেছেন এক রহস্যময়, অজানা এবং অস্পৃশ্য সত্তা রূপে। তাদের ভাষার বয়ান ও প্রকাশভঙ্গির অসাধারণত্বই এ গানের মূল আকর্ষণ ।
চাঁদ, চন্দ্র বা চান্দ্র হচ্ছে পৃথিবীর উপগ্রহ যা পৃথিবীকে মাসে একবার প্রদিক্ষণ করে। এর অন্য নাম চন্দ্রমা, চন্দ্রিমা, নিশাকর, নিশিকান্ত, শশধর, হিমাংশু, সুধাংশু, সুধাকর, ইন্দু, বিধু, শশী, সোম, শ্রেষ্ঠ, কুলচন্দ্র।
চাঁদকে মানব দেহের ভেতরে চরম চৈতন্য, আত্মা কিম্বা কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পণের প্রতীক মনে করেন বাউলরা। এ গানে ব্যবহৃত শব্দগুলি রূপকধর্মী ও ধাঁধা লাগানো। অনেকে একে জৈবিক ও গুপ্ত সাধনার দেহতত্ত্ব হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। আবার আধ্যাত্মিক সাধকরা একে জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলন ও রূপান্তর হিসেবে দেখেন। কেউ কেউ এ গানকে পৃথিবীর দুর্বোধ্যতম গান মনে করেন।
রচনা বা এর অন্তর্নিহিত ভাবার্থ নিয়ে কোন ঐতিহাসিক বা প্রামাণ্য বিতর্ক না থাকলেও এর গুঢ় অর্থ এবং যত্রতত্র ভুল ব্যবহারের কারণে এটি নিয়ে প্রায়ই তাত্ত্বিক ও সামাজিক বিতর্ক বা মত পার্থক্য দেখা যায় ।
পুরুষের শুক্রসত্তা বা মাতৃ ডিম্বানু বা পিতৃরজঃ শুক্রানু দ্বারা সৃষ্ট বা পুরুষ ও নারীর মিলনে নতুন সৃষ্টি বলে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। বাউল তত্ত্বে বলা হয়েছে চাঁদ থেকে চাঁদে, কৈশোর থেকে যৌবনে পা দেয়া বা চাঁদ হতে হয় চাঁদের সৃজন বা চাঁদে থেকেই হয় চাঁদময়। যেমন জল থেকে মাটির সৃষ্টি, জ্বাল দিলে হয় মাটি। আবার বলা হয়েছে কলাগাছ (কলা গাছে দ্বিতীয়বার বীজ রোপণ করতে হয় না, গাছের মৃত্যু বা ফল দাতা গাছ কেটে ফেললে তার গোড়ায় নতুন গাছের জন্ম হয়)। কবর, লবণ সম্পর্কিত ধাঁধা ও প্রবাদের উপর ভিত্তি করে এ গান রচিত।
এ গানের গীতিকার লৌকিক জীবনের এই চেনারূপ ও ধাঁধাগুলোকে আত্তীকরণ করে আধ্যাত্মিক ও দেহতাত্ত্বিক রূপ দান করেছেন। সন্দেহ নেই এটি একটি গভীর দেহতত্ত্বের গান। এ গানের রচয়িতা কে তা আছো স্পষ্ট নয় এবং এগানের ভাবার্থ বা মূল মর্ম কেউ অদ্যাবধি আবিষ্কার করতে পারেনি। তার পরও সৃষ্টি তাত্ত্বিক ও গবেষকদের ধারণা সৃষ্টি তত্ত্ব, প্রকৃতির নিয়ম ও মানব দেহের অভ্যন্তরের আধ্যাত্মিক শক্তির মিলনকে রূপক রূপে ‘চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে‘’ বলে প্রকাশ করেছেন।
পরমাত্মা ও জীবাত্মার মিলন, কৈশোর যৌবন অথবা শুক্রানু ও ডিম্বাণুর মিলনকে ‘চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে’‘ ব্যাখ্যা করা হয়েছে। সৃষ্টি তত্ত্ব, জীবতত্ত্বে পুরুষের শুক্রাণু ও মাতৃরজের মিলনই এ চরম আধ্যাত্মিক চৈতন্য চাঁদের সৃষ্টি। বাউল দরবেশ সাধনায় একে চার চাঁদের সাধনাও বলে, যেমন সরল চাঁদ, গরল চাঁদ।
চাঁদ অর্থ মানবদেহের শুক্র বা সুক্ষ্মসত্তাকে বুঝিয়েছেন। কৈশোর থেকে যৌবন পেরিয়ে যখন শরীরে শুক্র বা ভ্রুমানো সঞ্চয় হয় তখন এক চাঁদের গায়ে আর এক চাঁদের উদয় হয়। মূলত নর নারীর মিলনেই হয় নতুন সৃষ্টি। এই প্রকৃতির চিরন্তন নিয়মকে মানুষ বদলাতে বা বুঝতে পারে না যা সম্পূর্ণ ঐশ্বরিক।
তাই গানটি একটি বাউল ধাঁধা ও রূপক, যা পরমাত্মার সাথে জীবাত্মার মিলন,মানব দেহের আভ্যন্তরীণ জৈবিক পরিবর্তন ও প্রকৃতির রহস্যময় সৃজনশীলতাকে তুলে ধরা হয়েছে যা সাধারণ মানুষের বোধের অগম্য।
সন্তানের ভেতরেই মূলত মাতৃরূপ থাকে সুপ্ত যা বাক শক্তির জন্ম হওয়া বা প্রকৃতির এক রূপ থেকে অন্যরূপে রূপায়ন। মানবদেহের এ এক শক্ত রহস্য। ঝিয়ের পেটে মায়ের জন্ম সৃষ্টির চক্র ও মানব দেহের এক অসাধারণ রৌপক ব্যাখ্যা ।
দেহাভ্যন্তরে চাঁদের সৃষ্টির পর পরই সৃষ্টি হয় কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য, (ছয় মাসের কন্যার), তার পর দুই চোখ, দুই কান, দুই নাসিকা, মুখ, মুত্রদ্বার, মলদ্বার (নয় মাসের গর্ভ) এবং পরে শুক্রদ্বার, রজদ্বার তার পরে শুক্র, সুধা ও মধু (এগার মাসে তিনটি সন্তান) জন্ম নেয়। সেই দেহাভ্যন্তরে বা মাতৃগর্ভে পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয় চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগে জন্মানো আর এক চাঁদ। যে বাক্যহীন নীরবে বেড়ে ওঠে মায়ের গর্ভে, তার খাদ্য, আলোর যোগানদার কে কেউ জানে না।
আবার বীর্যক্ষরণ মানে দেহাবসান যেমন লবণ। তাই গানে বলে এই রহস্যময় সৃষ্টি তত্ত্ব অনুধাবন করতে না পারলে প্রকৃত ফকিরি বা আধ্যাত্মিকতা অর্জন সম্ভব নয়।
লালনের জীবন সম্পর্কে যেমন বিশেষ কিছু জানা যায় না তেমনি তার অবিকৃত তথ্য সূত্র তার নিজের রচিত ২৮৮ টি গানের কোথাও এ গানের উল্লেখ নেই।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লালন গবেষক আবুল আহসান চৌধুরী বলেন, অনেক গান যাতে লালন বলে কথাটির উল্লেখ আছে তার সবই প্রকৃতপক্ষে লালনের নয় (উইকিপিডিয়া)।
মন্টু শাহ নামের একজন বাউল তিন খণ্ডের একটি বই প্রকাশ করেছেন যাতে মনিরুদ্দিন শাহ নামক লালনের সরাসরি শিষ্যের সংগংহীত লালন সংগীতগুলো প্রকাশ করেছেন। তাতে ও এ গানের উল্লেখ নাই।
একমাত্র ‘লালন সমগ্র’ নামে ইমাম আহমেদ ও আব্দুল মমিন সংকলিত ও সম্পাদিত, সদর প্রকাশনী, ঢাকা থেকে প্রকাশিত বই এ –৮৬০ টি গানের –৩৪৭নং গান লালনের রচনা হিসেবে উল্লেখ আছে।
এতদ সত্ত্বেও বাউল দর্শনের ঐতিহাসিক পরম্পরা ও লালনের অন্যান্য গানের ভাষারীতি বিশ্লেষণ করে আবুল আহসান চৌধুরী মত প্রকাশ করেন যে, ‘লোকায়ত ধাঁধাকে এমন উচ্চ মার্গীয় আধ্যাত্মিক দর্শনে রূপান্তর করা, এই অসামান্য শৈল্পিক দক্ষতা লালন সাঁইয়ের রচনাশৈলীর রচনাবলীর সাথেই একমাত্র সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূণ’।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড়ভাই জ্যোতারিন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার লালনকে বলেছিলেন, ‘আপনি যা বলেন তা আমরা যেন কিছু বুঝি, আবার বুঝতে পারিনা।’
লেখক: প্রাবন্ধিক, লোকসঙ্গীত গবেষক ও শিল্পী।












