(পূর্ব প্রকাশিতের পর )
বর্জ্য থেকে সার, বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ: খাদ্য ও অন্যান্য জৈব বর্জ্য আধুনিক Composting ও Anaerobic Digestion প্ল্যান্টে প্রক্রিয়াজাত করে জৈব সার ও বায়োগ্যাস উৎপাদন করা যেতে পারে। উৎপাদিত বায়োগ্যাস বিদ্যুৎ ও তাপ উৎপাদনে ব্যবহার করা সম্ভব। অন্যদিকে, পুনর্ব্যবহারযোগ্য নয় কিন্তু জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য থেকে উপযুক্ত প্রক্রিয়ায় Refuse-Derived Fuel (RDF) তৈরি করা যেতে পারে; নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করলে তা বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ব্যবহার করা সম্ভব। তবে বর্জ্যের আর্দ্রতা ও গঠন, নির্গমন নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই না করে মিশ্র বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প নেওয়া উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দিতে হবে বর্জ্য পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং জৈব বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণকে। সিটি রিসাইক্লিং ইকোসিস্টেম: চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় Material Recovery Facility (MRF) স্থাপন করে প্লাস্টিক, কাগজ, ধাতু, কাচসহ পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান আলাদা করা যেতে পারে। AI ও Computer Vision প্রযুক্তির মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও নির্ভুল করা সম্ভব। পাশাপাশি একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নাগরিক, বর্জ্য সংগ্রহকারী, পুনর্ব্যবহার উদ্যোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদানের বাজার সমপ্রসারণ করা যেতে পারে। এর ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ‘Waste Disposal” থেকে “Waste Recovery”–তে রূপান্তরিত হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে Zero Waste to Landfill লক্ষ্য অর্জনের পথ তৈরি হবে–যেখানে যতটা সম্ভব বর্জ্যকে ফেলে না দিয়ে পুনর্ব্যবহার, কম্পোস্ট, জ্বালানি কিংবা অন্য কোনো অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করা হবে।
যানজট ব্যবস্থাপনায় কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা : চট্টগ্রাম মহানগরের অন্যতম প্রধান সমস্যা যানজট, যা নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবন, কর্মঘণ্টা, ব্যবসা–বাণিজ্য ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), Internet of Things (IoT), GPS এবং Digital Twin প্রযুক্তির সমন্বয়ে এ সমস্যার আরও কার্যকর ও তথ্যনির্ভর সমাধান করা সম্ভব।
নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও intersection– এ AI enabled camera এবং traffic sensor স্থাপন করে যানবাহনের সংখ্যা, গতি, যানজটের দৈর্ঘ্য, সড়কের ধারণক্ষমতা ও ট্রাফিক প্রবাহ সম্পর্কে রিয়েল–টাইম তথ্য সংগ্রহ করা যাবে। AI এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে কোন সড়কে কখন যানজট বাড়ছে তা শনাক্ত করতে পারবে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সুপারিশ দেবে। কোনো intersection–এ যানবাহনের চাপ বেশি থাকলে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থার মাধ্যমে সবুজ সংকেতের সময় সমন্বয় করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন সড়কের ট্রাফিক প্রবাহ বিবেচনায় নিয়ে একাধিক intersection–এর সিগন্যাল সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা যাবে।
কোনো স্থানে দুর্ঘটনা, সড়ক অবরোধ, জলাবদ্ধতা কিংবা অস্বাভাবিক যানজট সৃষ্টি হলে অও–ভিত্তিক ব্যবস্থা দ্রুত তা শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করতে পারবে। এচঝ ও ডিজিটাল ম্যাপের সহায়তায় নাগরিকদের বিকল্প পথ সম্পর্কে তথ্য দেওয়া এবং জরুরি প্রয়োজনে অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস ও অন্যান্য জরুরি সেবার জন্য দ্রুততম পথ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। গণপরিবহনের চলাচল ও যাত্রীচাপ বিশ্লেষণ করেও বাসের রুট, সময়সূচি এবং সেবার প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণে সহায়তা পাওয়া যাবে।
এ ক্ষেত্রে Digital Twin গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো নতুন ফ্লাইওভার নির্মাণ, সড়ক সমপ্রসারণ, একমুখী চলাচল চালু কিংবা নতুন ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপনের আগে ডিজিটাল শহরের মডেলে এসব উদ্যোগের সম্ভাব্য প্রভাব Simulation করে দেখা যাবে। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগেই সম্ভাব্য সুফল, সীমাবদ্ধতা এবং পার্শ্ববর্তী সড়কে যানজটের ঝুঁকি মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
এসব প্রযুক্তি কার্যকর করতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (CDA) ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান–প্রদান এবং সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি নাগরিকের গোপনীয়তা, তথ্যের নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। এর ফলে যানজট ব্যবস্থাপনা কেবল তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমাবদ্ধ না থেকে অও–নির্ভর, পূর্বাভাসভিত্তিক ও Data – Driven Traffic Management ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হতে পারে।
ডিজিটাল ব্যবসায়িক নিবন্ধন ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা : চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে ছোট–বড় সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে প্রতিটি ব্যবসায়ী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে স্বতন্ত্র ডিজিটাল বিজনেস আইডি প্রদান করে ব্যবসার ধরন, অবস্থান, মালিকানা এবং প্রযোজ্য কর, ফি ও অনুমোদনের তথ্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে নগরের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের একটি হালনাগাদ ডিজিটাল নিবন্ধনভান্ডার গড়ে উঠবে, যা সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব নির্ধারণ, আদায় ও তদারকি আরও কার্যকর করবে।
বিশেষ করে ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের ডিজিটাল নিবন্ধনের আওতায় এনে নগর পরিকল্পনা, পথচারীদের চলাচল এবং জননিরাপত্তা বিবেচনায় উপযুক্ত স্থানে নির্দিষ্ট সংখ্যক দোকান বসানোর স্থান বরাদ্দ করা যেতে পারে। বরাদ্দকৃত স্থানের অবস্থান, আয়তন, ব্যবসার ধরন এবং প্রযোজ্য ফি ডিজিটাল ব্যবস্থায় সংরক্ষিত থাকবে। এতে ফুটপাত দখল, অনিয়ন্ত্রিত দোকান স্থাপন ও অবৈধ অর্থ আদায় কমানোর পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের জন্য স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হবে। মোবাইল আর্থিক সেবা বা অন্যান্য ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্ধারিত ফি ও রাজস্ব আদায় করা হলে আদায়ের হিসাবও সহজে যাচাই করা যাবে।
এ ব্যবস্থার ফলে সিটি কর্পোরেশন ব্যবসায়িক নিবন্ধন, নবায়ন, স্থান বরাদ্দ এবং প্রযোজ্য রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। বর্তমানে অনিবন্ধিত বা যথাযথভাবে নথিভুক্ত নয়–এমন ব্যবসায়িক কার্যক্রম শনাক্ত করে আইন ও বিধি অনুযায়ী রাজস্বের আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হবে। তবে ফুটপাতের সব ব্যবসাকে নির্বিচারে অনুমোদন না দিয়ে পথচারীদের অধিকার, প্রতিবন্ধীবান্ধব চলাচল, যানবাহন ও জরুরি সেবার প্রবেশপথ এবং নগরের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করে স্থান বরাদ্দ করতে হবে। এভাবে ডিজিটাল বিজনেস আইডি ব্যবস্থা একদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিয়মতান্ত্রিক পরিচিতি ও সুরক্ষা দেবে, অন্যদিকে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের রাজস্বের সম্ভাব্য উৎস সমপ্রসারণ এবং নগর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখবে।
ক্যাশলেস চসিক: ডিজিটাল লেনদেনে স্বচ্ছতা ও রাজস্ব বৃদ্ধি : চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব আদায় ও নাগরিক সেবার প্রতিটি পর্যায়ে নগদ অর্থের পরিবর্তে ডিজিটাল লেনদেন চালু করে ‘ক্যাশলেস চসিক’ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এ লক্ষ্যে ‘বাংলা কিউআর’ (Bangla QR) –ভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করা হবে। সিটি কর্পোরেশনের কার্যালয়, আঞ্চলিক অফিস, বাজার, পার্কিং এলাকা, গণশৌচাগার এবং অনুমোদিত ফুটপাতের দোকানসহ রাজস্ব আদায়ের বিভিন্ন স্থানে নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী বা সেবার বিপরীতে বাংলা কিউআর কোড স্থাপন করা যেতে পারে। নাগরিকেরা তাঁদের ব্যাংকিং অ্যাপ বা বাংলা কিউআর সমর্থিত পেমেন্ট অ্যাপ ব্যবহার করে সহজেই নির্ধারিত ফি পরিশোধ করতে পারবেন ।
হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স ফি, বাজার ও ফুটপাতের দোকানের বরাদ্দ ফি, পার্কিং ফি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ফি এবং বিভিন্ন সনদ ও অনুমোদনের প্রযোজ্য ফি বাংলা কিউআরসহ অনুমোদিত ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মাধ্যমে আদায় করা যাবে। প্রতিটি লেনদেনের বিপরীতে স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল রসিদ তৈরি এবং কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় হিসাব সংরক্ষণের ফলে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ, বকেয়া ও অঞ্চলভিত্তিক আয়ের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা সহজ হবে। ডিজিটাল বিজনেস আইডির সঙ্গে বাংলা কিউআর সংযুক্ত করা হলে নিবন্ধিত ব্যবসায়ী, বরাদ্দকৃত স্থান এবং পরিশোধিত ফি একই ব্যবস্থায় অনুসরণ করা সম্ভব হবে।
এই উদ্যোগের ফলে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা, অননুমোদিত অর্থ আদায় এবং হিসাবের অসংগতি কমানোর পাশাপাশি রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে। তবে বাংলা কিউআর গ্রহণকারী ব্যাংক ও পেমেন্ট সেবাদাতার সঙ্গে সমন্বয়, লেনদেনের নিরাপত্তা, স্বয়ংক্রিয় হিসাব মিলকরণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। ডিজিটাল পেমেন্টে অসুবিধা হয় এমন নাগরিকদের জন্য সহায়তামূলক ব্যবস্থাও রাখতে হবে। এভাবে ‘ক্যাশলেস চসিক’ চালু করা গেলে সিটি কর্পোরেশনের রাজস্ব আদায় আরও সহজ, স্বচ্ছ ও কার্যকর হবে এবং নগর ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল রূপান্তর ত্বরান্বিত হবে। (বাকি অংশ প্রকাশিত হবে বুধবার)।
লেখক : সচিব, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন










