
চট্টগ্রাম নগরীকে স্মার্ট সিটি থেকে Predictive, Safe and Sustainable City–তে রূপান্তরের সম্ভাবনা : চট্টগ্রাম সিটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, বন্দর, শিল্প ও বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র। ১৬০ বর্গ কি.মি. এর সিটিতে আনুমানিক ৭০ লক্ষ লোকের বসবাস। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই নগরী প্রতিদিন হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান, ব্যবসা–বাণিজ্য ও জীবনযাত্রার সুযোগ সৃষ্টি করছে। কিন্তু অর্থনৈতিক গুরুত্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নগর ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়িত না হওয়ায় চট্টগ্রামকে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের নাগরিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যানজট, খাল–নালা দখল, অপর্যাপ্ত পয়ঃনিষ্কাশন, সড়ক ও ফুটপাতের দুরবস্থা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার নানা ঝুঁকি নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলছে।
এই সমস্যাগুলো মোকাবিলায় প্রচলিত পদ্ধতির পাশাপাশি এখন প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর নতুন চিন্তা। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের Artificial Intelligence (AI), Internet of Things (IoT), Geographic Information System, Big Data Ges Digital Twin–এর মতো প্রযুক্তি সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা গেলে নগর ব্যবস্থাপনার ধরনই পরিবর্তন করা সম্ভব। প্রশ্ন হচ্ছে–চট্টগ্রামের মতো একটি বৃহৎ ও জটিল নগরীতে এসব প্রযুক্তি বাস্তবে কীভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে?
Digital Twin: হাতের মুঠোয় পুরো চট্টগ্রামের একটি ‘ডিজিটাল শহর : চট্টগ্রামের স্মার্ট সিটি রূপান্তরের ভিত্তি হতে পারে একটি Chattogram City Digital Twin। এটি হবে বাস্তব নগরের একটি গতিশীল ডিজিটাল প্রতিরূপ, যেখানে রাস্তা, ভবন, খাল, ড্রেন, জলাধার, সড়কবাতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক, ভূমির উচ্চতা, পরিবেশ ও দুর্যোগ ঝুঁকির তথ্য একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত থাকবে। GIS, Satellite Imagery, Drone, IoT Sensor, Artificial Intelligence (AI) এবং বিভিন্ন সরকারি সংস্থার তথ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে নগরের সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে।
Digital Twin-এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, কোনো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে তার সম্ভাব্য প্রভাব ডিজিটালি পরীক্ষা করা যাবে। নতুন রাস্তা নির্মাণ করলে যানজট কীভাবে পরিবর্তিত হবে, কোনো খাল সংকুচিত হলে কোথায় জলাবদ্ধতা বাড়তে পারে কিংবা নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠলে ড্রেনেজ ব্যবস্থার ওপর কী চাপ পড়বে–এসব বিষয় Simulation–এর মাধ্যমে আগেই মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল, ড্রেন ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার ডিজিটাল মডেল তৈরি করে বৃষ্টিপাত, জোয়ারের উচ্চতা, পানির প্রবাহ ও ভূমির উচ্চতা বিশ্লেষণ করা যাবে। IoT সেন্সর থেকে পাওয়া বাস্তব সময়ের তথ্য এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস ব্যবহার করে অও সম্ভাব্য জলাবদ্ধতার স্থান ও মাত্রা অনুমান করতে পারবে। একইভাবে, বর্জ্য উৎপাদন, সংগ্রহের স্থান ও পরিবহনব্যবস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করে বর্জ্য সংগ্রহের রুট, পুনর্ব্যবহার কেন্দ্র এবং বর্জ্য থেকে সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপযুক্ত স্থান নির্ধারণে সহায়তা পাওয়া যাবে।
যানজট ও জননিরাপত্তার ক্ষেত্রেও Digital Twin কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সড়কের অবস্থা, ট্রাফিকের চাপ এবং জরুরি সেবাকেন্দ্রের অবস্থান বিশ্লেষণ করে দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড বা দুর্যোগের সময় অ্যাম্বুলেন্স ও ফায়ার সার্ভিসের দ্রুততম বিকল্প পথ নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি জলাবদ্ধতা, পাহাড়ধস ও অন্যান্য দুর্যোগের সম্ভাব্য প্রভাব Simulation করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা আগেই তৈরি করা যাবে।
একটি Integrated Smart City Command and Control Centre–এর সঙ্গে Digital Twin যুক্ত করা গেলে নগর কর্তৃপক্ষ একই প্ল্যাটফর্মে শহরের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, ঝুঁকি শনাক্তকরণ এবং সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে। ফলে চট্টগ্রামের নগর ব্যবস্থাপনা ধীরে ধীরে “সমস্যা হওয়ার পর ব্যবস্থা” থেকে “সমস্যা হওয়ার আগেই পূর্বাভাস, প্রস্তুতি ও প্রতিরোধ” ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হতে পারে ।
জলাবদ্ধতা: পানি জমার পর নয়, জমার আগেই সতর্কতা : বর্ষা এলেই চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা জলাবদ্ধতার শিকার হয়। এই সমস্যা শুধু অতিবৃষ্টির কারণে তৈরি হয় না; খাল–নালার ধারণক্ষমতা কমে যাওয়া, পলি জমা, বর্জ্য জমে পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়া, অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং জোয়ারের সঙ্গে অতিবৃষ্টির সমন্বিত প্রভাবও এতে গুরুত্বপূর্ণ। এখানে IoT ও AI বড় ভূমিকা রাখতে পারে। নগরের গুরুত্বপূর্ণ খাল, ড্রেন ও পানি নিষ্কাশন পয়েন্টে সেন্সর বসিয়ে পানি কতটা বাড়ছে, কত দ্রুত প্রবাহিত হচ্ছে এবং কোন স্থানে পানি আটকে আছে–এসব তথ্য real-time সংগ্রহ করা সম্ভব। এর সঙ্গে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, জোয়ারের উচ্চতা ও Digital Elevation Model যুক্ত করলে অও কয়েক ঘণ্টা আগেই সম্ভাব্য জলাবদ্ধতার পূর্বাভাস দিতে পারে। ধরা যাক, রাত ১০টায় প্রবল বৃষ্টির সঙ্গে উচ্চ জোয়ারের পূর্বাভাস রয়েছে। অও তখন দেখাতে পারে–রাত ১১টা থেকে নগরের কোন কোন এলাকা জলাবদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড, সিটি কর্পোরেশন, ফায়ার সার্ভিস ও জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাকে আগেই সতর্ক করা যাবে। এর ফলে, জলাবদ্ধতা ব্যবস্থাপনা কেবলমাত্র সমস্যা হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে পূর্বাভাস– ভিত্তিক হবে।
বর্জ্য: সমস্যা নয়, অর্থনৈতিক সম্পদ : চট্টগ্রামের অন্যতম বড় নগর সমস্যা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। তবে বর্জ্যকে শুধু সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে দেওয়ার সমস্যা হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তরের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় চট্টগ্রামে একটি সমন্বিত Circular Economy গড়ে তোলা সম্ভব। গুরুত্বপূর্ণ বর্জ্যবিনে IoT Sensor স্থাপন করে সেগুলোর পূর্ণতার মাত্রা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। AI ও GPS প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহের সময়, গাড়ির চলাচল এবং সর্বোত্তম রুট নির্ধারণ করে সময় ও জ্বালানির অপচয় কমানো সম্ভব। পাশাপাশি বাসাবাড়ি, বাজার, রেস্তোরাঁ ও প্রতিষ্ঠান থেকে জৈব বর্জ্য, প্লাস্টিক, কাগজ, ধাতু, কাচ এবং অন্যান্য বর্জ্য পৃথকভাবে সংগ্রহের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এতে পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপাদান পুনরুদ্ধার, পরিবেশদূষণ হ্রাস এবং বর্জ্যভিত্তিক নতুন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হবে। (চলবে)।
লেখক : সচিব, চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন












