চট্টগ্রাম : আমার জীবনের আরেক নাম

ফাতেমা জেবুন্নেসা | বৃহস্পতিবার , ২ জুলাই, ২০২৬ at ৫:১০ পূর্বাহ্ণ

আমার বয়স যখন আঠার ছুঁই ছুঁই তখনই বৈবাহিকসূত্রে পাহাড় সমুদ্রঘেরা এ অপরূপ নগরীতে আসা। চারদশকের বেশি সময় কাটিয়ে এখন আমার অনুভূতি হলো মানুষ শুধু কোনো স্থানে বাস করে না, কিছু স্থানও মানুষের ভেতরে বাস করে, গড়ে তোলে স্মৃতিময় এক গভীর ঠিকানা। জন্মসূত্রে আমি ঢাকার মানুষ হলেও জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান দীর্ঘতম অধ্যায় পার করেছি এই চট্টগ্রামে। তাই আজ মনে হয় এটি আমার বসবাসের শহর নয়, চট্টগ্রাম যেন আমার জীবনের আরেক নাম।

তখনকার চট্টগ্রাম ছিল অপেক্ষাকৃত শান্ত, পরিচ্ছন্ন ও সহজ সরল। যানবাহনের চাপ ছিল উল্লেখযোগ্য কম, মানুষের জীবনযাত্রায় ছিল প্রশান্তির ছোঁয়া। আগ্রাবাদ ছিল বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের প্রধান কেন্দ্র, আন্দরকিল্লা, চকবাজার, পাথরঘাটা ছিল ঐতিহ্যের ধারক। নিউমার্কেট চত্বর, জুবিলি রোড ছিল শহরে জীবনেরও অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। বিকেলের চট্টগ্রাম ছিল অনেকটাই নির্ভার। পরিবার পরিজন নিয়ে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে যাওয়া, কর্ণফুলীর তীরে দাঁড়িয়ে নদীর বুকে নৌযান চলাচল দেখা ছিল অনন্য আনন্দ। সিনেমা হলগুলি দর্শকদের ভিড়ে থাকতো পরিপূর্ণ, স্টুডিওতে ছবি তোলার আনন্দ আমাদের উদ্বেলিত করে রাখতো সেই সময়টাতে।

ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসতে থাকলো এ নগরীর। সত্যি কথা বলতে গেলে চার দশকে চট্টগ্রামের যে পরিবর্তন আমি প্রত্যক্ষ করেছি তা সত্যিই বিস্ময়কর।

১৯৮২ সালের শেষের দিকে চট্টগ্রামে গার্মেন্টস শিল্প আর ব্যক্তি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে চাকুরীর সুযোগের কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ আসতে শুরু হলো। এভাবেই জনসংখ্যা বেড়েছে, নগরীর ব্যবস্থা আধুনিক হয়েছে। নূতন সড়ক ফ্লাইওভার, আবাসিক এলাকা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে, গড়ে ওঠেছে শিল্প কারখানা অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্ব হিসেবে তিনদিন আরও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে শহরের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে উন্নয়নের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও এসেছে। যানবাহন, পরিবেশ দূষণ, পাহাড় কাটা, জলাবদ্ধতা নগরবাসীর উদ্বেগের কারণ হয়েছে। তারপরেও পাহাড়, সমুদ্র নদী ও সবুজের এ অনন্য সমন্বয় এখনও দেশের অন্য যে কোন শহর থেকে চট্টগ্রামকে আলাদা করে। উন্নয়নের প্রয়োজনে নগরায়ন অবশ্যই দরকার কিন্তু এর বিনিময়ে প্রকৃতির যে ক্ষতি হয়েছে তা আমাকে প্রায়ই ব্যথিত করে। তবুও চট্টগ্রামকে নিয়ে আমার স্মৃতিভাণ্ডার ভরা রয়েছে কৃতজ্ঞতার সুধায়। এ শহর আমাকে শুধু আশ্রয়ই দেয়নি, দিয়েছে কর্মজীবনের আনন্দময় ব্যাপ্তি, দিয়েছে অসংখ্য মানুষের ভালবাসা। এই শহরটিতে যখন আমি প্রথম আসি আমাকে সবচেয়ে অবাক করেছে রাস্তাঘাটে মহিলাদের ক্ষীণ উপস্থিতি। আজ চিত্র কত ভিন্ন। নারীশিক্ষার বিস্তার কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ সামাজিক সচেতনতা এবং পারিবারিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন সবমিলিয়ে শহরটি যেন নতুন এক পরিচয় লাভ করেছে।

এই চার দশকে কত যে পরিবর্তন দেখলাম এই শহরের। আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলো এখানে রচিত হয়েছে। দীর্ঘ একত্রিশ বছরের কর্মজীবন, সন্তানদের জন্ম এবং বেড়ে ওঠা, তাদের পরিবার গঠনসহ এই দীর্ঘ সময়ে সামাজিক সম্পর্ক সবকিছুর কেন্দ্র বিন্দুতে ছিল এ শহর। এ শহরকে আমি দেখেছি পাহাড় আর সমুদ্রের শহর হিসেবে, আবার দেখেছি কর্মচঞ্চল বন্দরনগরী হিসেবে। দেখেছি এর মানুষের আন্তরিকতা, অতিথিপরায়নরত এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য।

১৯৮২ এর শুরুতে সেই অচেনা শহরটিই ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, আমি শুধু চট্টগ্রাম শহরটিকে দেখিনি, দেখেছি একটি শহরের পরিবর্তন, বিকাশ এবং সমাজের এক দীর্ঘ রূপান্তরের অধ্যায়।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, এনায়েতবাজার মহিলা কলেজ।

পূর্ববর্তী নিবন্ধপ্রদ্যোত কুমার বড়ুয়ার ‘উড়ছি মনের ডানা মেলে’
পরবর্তী নিবন্ধঅদৃশ্য সমস্যাবলীর আবর্তে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন