রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, ট্যাক্স নেটের সম্প্রসারণ এবং করদাতাদের সেবা বিস্তৃত করার লক্ষ্যে চট্টগ্রামে নতুন দুইটি কর অঞ্চলের কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়েছে। নগরীর ২২ তলা উচ্চতার বনানী কমপ্লেক্স ভবনের বিস্তৃত এলাকা ভাড়া নিয়ে চট্টগ্রাম কর অঞ্চল–৫ এবং কর অঞ্চল–৬ এর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইতোপূর্বে চট্টগ্রামে চারটি কর অঞ্চল ছিল। নতুন দুইটি কর অঞ্চল বাড়ানোর ফলে বর্তমানে ৬ টি কর অঞ্চলের কার্যক্রম চলছে। এছাড়া কক্সবাজারের জন্য চালু করা হয়েছে আলাদা কর অঞ্চল। আয়কর প্রশাসনের এই পরিধি বাড়ানোর ফলে চট্টগ্রামে রাজস্ব আয় অনেকটা বৃদ্ধি পাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
সূত্র জানিয়েছে, দেশের রাজস্ব আয়ের অন্যতম একটি খাত ইনকাম ট্যাক্স। ব্যক্তি এবং কোম্পানিসহ বিভিন্ন খাত থেকে এই ইনকাম ট্যাক্স আদায় করা হয়। একসময় ইনকাম ট্যাক্স পরিশোধ না করেও জায়গা জমি কিংবা ফ্ল্যাট, গাড়ি ইত্যাদি ক্রয় করা গেলেও গত কয়েকবছর ধরে সবকিছুতে ইনকাম ট্যাক্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে করে বছরের পর বছর ইনকাম ট্যাক্স না দেয়া বহু মানুষকে ট্যাক্স নেটের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। সারাদেশে টিন নম্বরধারীদের সকলেই রিটার্ণ দাখিল করেন না। আবার রিটার্ণ দাখিলকারীদের সকলেই ট্যাক্স পরিশোধ করেন না। অনেকেই জিরো ট্যাক্স পরিশোধ করেন। আবার অনেকের আয় থাকলেও নিয়ম কানুন না জানার কারণে ট্যাক্স প্রদান করেন না। তাদের বৈধ আয়ও অপ্রদর্শিত আয়ে পরিণত হচ্ছে, তাদের টাকা হয়ে যাচ্ছে কালো টাকা, সম্পদ হয়ে যাচ্ছে অবৈধ। দেশের বহু মানুষই নিজের অজান্তেই কালো টাকা এবং অবৈধ সম্পদের মালিক হয়ে যাচ্ছেন। আবার অনেকেই ইনকাম ট্যাক্স প্রদানের ব্যাপারটিকে হয়রানি মনে করে এর থেকে দূরে থাকছেন। অনেকেই ট্যাক্স দিতে চাইলেও নিয়ম কানুনের গ্যাঁড়াকলে পড়তে চান না বিধায় আয়কর প্রদান করেন না।
চট্টগ্রামের চারটি কর অঞ্চলে অন্তত ৬ লাখের মতো মানুষ আয়কর প্রদান করেন। যার সম্মিলিত পরিমাণ বিশ হাজার কোটিরও বেশি টাকা। চট্টগ্রামে প্রতিবছরই আয়কর আদায়ের পরিমাণ বাড়ছে। নতুন নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত হচ্ছেন ট্যাক্স নেটে। এতে করে চট্টগ্রামের কর বিভাগের কার্যক্রমও বিস্তৃত হয়েছে, আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই অবস্থায় চট্টগ্রামের কর আদায়ের পরিমাণ বাড়ানো, নতুন করদাতা শনাক্ত করে ট্যাক্স নেটে অন্তর্ভুক্ত করা, করদাতাদের সেবায় গতিশীলতা আনাসহ বিভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে এখানের বিদ্যমান ৪টি ট্যাক্স জোনকে ছয়টিতে উন্নীত করা হয়েছে। চালু করা হয়েছে দুইটি নতুন ট্যাক্স জোন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চট্টগ্রামে কর অঞ্চল–৫ ও কর অঞ্চল–৬ এর মাধ্যমে পুরোদমে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এর ফলে চট্টগ্রামের শিল্প, বাণিজ্য, আমদানি–রপ্তানি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিস্তৃত পরিসরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কর প্রশাসন আরো গতিশীল ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে সর্বশেষ বড় ধরনের আয়কর প্রশাসনিক পুনর্গঠন হয়েছিল ২০১১ সালে। ওই সময় কর অঞ্চল–১, ২ ও ৩–এর পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে কর অঞ্চল–৪ গঠন করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় চট্টগ্রামে চারটি কর অঞ্চল দিয়ে আয়কর প্রশাসনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। চট্টগ্রামের বৃহৎ করদাতা ইউনিটও ইতোপূর্বে বিলুপ্ত করে ঢাকার সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
চট্টগ্রামের আয়কর বিভাগের দ্বিতীয় পর্যায়ের সমপ্রসারণ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নতুন দুটি কর অঞ্চল যুক্ত করার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। একই উদ্যোগে কক্সবাজারকে চট্টগ্রাম থেকে পৃথক করে স্বতন্ত্র কর অঞ্চল করা হয়। ফলে চট্টগ্রামের কর প্রশাসনের কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসে।
কর অঞ্চল–৫ এর আওতায় আগের কর অঞ্চলগুলোর ছয়টি সার্কেল নিয়ে এই নতুন কর অঞ্চল গঠিত হয়েছে। এর আওতায় রয়েছে কর অঞ্চল–১–এর সার্কেল ২, ১১ ও ১৩, কর অঞ্চল–২–এর সার্কেল ২৬, কর অঞ্চল–৩–এর সার্কেল ৩২ ও ৩৩।
কর অঞ্চল–৬ এর আওতায় আনা হয়েছে আগের কর অঞ্চলগুলোর পাঁচটি সার্কেল। এগুলো হলো, কর অঞ্চল–২–এর সার্কেল ৩০ ও ৩১, কর অঞ্চল–৩–এর সার্কেল ৪৬ ও ৪৯। পুরোনো কর অঞ্চলগুলোর অধিক্ষেত্র পুনর্বিন্যাস করে নতুন দুটি কর অঞ্চলের প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এতে মফস্বলের কর সার্কেলগুলোকেও কিছুটা এদিক ওদিক করে সার্কেল সম্প্রসারণ করা হয়েছে। সীতাকুণ্ড, মীরসরাই, পটিয়া, বোয়ালখালীসহ সবগুলো উপজেলাকেই নিবিড় মনিটরিংয়ের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। একটি কর অঞ্চলের জন্য ২২টি সার্কেল লাগে। উপরোক্ত প্রক্রিয়ায় চট্টগ্রামে সার্কেলের সংখ্যা বাড়িয়ে নতুন দুইটি কর অঞ্চল চালু করা হয়েছে।
নগরীর আগ্রাবাদস্থ ২২তলা বনানী কমপ্লেক্স ভবনের ১৫টির বেশি ফ্লোর ভাড়া নিয়ে দুইটি কর অঞ্চলের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আয়কর প্রশাসনে কক্সবাজারকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পৃথক কর অঞ্চলে উন্নীত করা হয়। আগে চট্টগ্রামের কর অঞ্চল–৪–এর অধীনে কক্সবাজার জেলার আয়করসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালিত হতো। কর অঞ্চল–৪–এর অধীনে বর্তমানে খাগড়াছড়ি জেলার আয়করসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
এনবিআর–এর একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, চট্টগ্রাম দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী। বন্দরসহ দেশের আমদানি–রপ্তানি বাণিজ্যের বড় অংশ সম্পাদিত হয় চট্টগ্রামের মাধ্যমে। এখানে রয়েছে অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান, তৈরি পোশাক কারখানা, রপ্তানিমুখী শিল্প, ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন পেশাজীবী শ্রেণির করদাতা।
এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চলে মাত্র চারটি কর অঞ্চলের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক করদাতার আয়করসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রশাসনিকভাবে বেশ কঠিন।
নতুন দুটি কর অঞ্চল যুক্ত হওয়ায় বিদ্যমান কর অঞ্চলগুলোর ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি করদাতাদের সেবা প্রদান, আয়কর রিটার্ন যাচাই, কর নির্ধারণ, উৎসে কর আদায় এবং কর ফাঁকি শনাক্তকরণ কার্যক্রম অনেক বেশি গতিশীল হবে।
এ ছাড়া নতুন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও করযোগ্য আয় থাকা ব্যক্তি–প্রতিষ্ঠানকে ট্যাক্স নেটের আওতায় আনার মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানোরও সুযোগ তৈরি হবে।
তিনি বলেন, নতুন দুইটি কর অঞ্চল গঠনের ফলে করদাতাদের ইনকাম ট্যাক্স ফাইলের অধিক্ষেত্র পরিবর্তন হয়েছে। পুরোনো কর অঞ্চলের নির্দিষ্ট কিছু সার্কেল নতুন কর অঞ্চল–৫ ও ৬–এর অধীনে স্থানান্তরিত হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট সার্কেলের করদাতাদের আয়করসংক্রান্ত কার্যক্রম নতুন কর অঞ্চলের অধীনে পরিচালিত হবে। করদাতারা নিজ নিজ ট্যাক্স ফাইলের বর্তমান অধিক্ষেত্র সম্পর্কে জেনে রাখলে সুবিধা হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।











