চট্টগ্রামের ১০৫টির অধিক ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। সমৃদ্ধ ইতিহাস রক্ষার অংশ হিসেবে এসব স্থাপনার তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। সিডিএর নতুন মাস্টার প্ল্যানের অংশ হিসেবে মোট ১০৫টি স্থাপনা চিহ্নিত করেছে, যেগুলো ভবিষ্যতে সংরক্ষণ করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, শহর এলাকায় ৫৩টি এবং বিভিন্ন উপজেলায় ৫২টির বেশি স্থাপনা চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পুরনো বাড়ি, মসজিদ, মন্দির, গির্জা, মঠ, সেতু, লাইটহাউস ও জমিদারবাড়ি। এসব স্থাপনা সুলতানি আমল থেকে ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত চট্টগ্রামের ইতিহাসের সাক্ষী। মাস্টার প্ল্যানে আরো রয়েছে পর্যটন মানচিত্র তৈরি, ডিজিটাল তথ্যফলক স্থাপন এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলোর আশপাশে অবকাঠামো উন্নয়নের প্রস্তাব। খবর বাসসের।
সিডিএর উপ–প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ও মাস্টার প্ল্যান প্রকল্প কর্মকর্তা প্রকৌশলী আবু ইসা আনসারী গতকাল বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম শুধু বন্দর নগরী নয়, এটি বাংলার হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যের এক জীবন্ত জাদুঘর। কর্ণফুলী নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই শহর ও এর উপকণ্ঠে ছড়িয়ে থাকা অজস্র প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আমাদের শিকড়ের সন্ধান দেয়। তবে নগরায়নের চাপ, উদাসীনতা ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে সেই শিকড় আজ বিপন্ন হওয়ার পথে। তিনি জানান, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টার প্ল্যান প্রকল্পের আওতায় ‘প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য স্থানসমূহ শনাক্তকরণ ও সংরক্ষণ’ শীর্ষক একটি ওয়ার্কিং পেপার তৈরি করা হয়েছে।
সিডিএ সূত্র জানায়, তালিকায় উল্লেখযোগ্য স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৩১ বছরের পুরনো হাতির বাংলো এবং ১৮৭২ সালে নির্মিত সিআরবি ভবন, যা বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল জেনারেল ম্যানেজারের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এছাড়া কোর্ট বিল্ডিং, ওয়ালি বেগ খাঁ জামে মসজিদ, লালদীঘি ময়দান, পুরনো সার্কিট হাউস (বর্তমানে জিয়া স্মৃতি জাদুঘর), সিআরবি শিরীষতলা, কালুরঘাট সেতু, পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব, চন্দনপুরা মসজিদ, বদর আউলিয়ার দরগাহসহ আন্দরকিল্লা, পাঠানটুলী, চকবাজার, পাহাড়তলী, চান্দগাঁও, কাতালগঞ্জ এলাকার মসজিদ, মাজার, মঠ ও রেলওয়ে স্থাপনাও রয়েছে। শহরের বাইরের তালিকায় রয়েছে হাটহাজারীর ওলি খান মসজিদ ও হামজা খান মসজিদ, নাসিরুদ্দিন নুসরাত শাহের দিঘি ও মসজিদ, ফতেয়াবাদ পরিত্যক্ত কাছারি, হাটহাজারী বিমানঘাঁটি এবং বিভিন্ন জমিদারবাড়ি। এছাড়া আনোয়ারার নরমান্স পয়েন্ট লাইটহাউস, পরৈকোড়া বৌদ্ধ মন্দির, দেয়াং পাহাড়, প্রসন্ন কুমার রায় জমিদারবাড়ি ও বন্দরগ্রাম বাতিঘরও তালিকায় রয়েছে।
রাউজানের কদলপুর মসজিদ, সাহেব বিবি জামে মসজিদ, জগৎপুর মন্দির, মাস্টারদা সূর্য সেন স্মৃতিস্তম্ভ, রাঙ্গুনিয়ার শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রথম মাজার, চাকমা রাজবাড়িও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বোয়ালখালীর সূর্য সেন স্মৃতি ও জমিদারবাড়ি, সীতাকুণ্ডের কুমিরা হাম্মাদিয়া মসজিদ, উত্তর সলিমপুর বিষ্ণু মন্দির, জাফরনগর চৌধুরী বাড়ি ও বিভিন্ন উপজেলার প্যাগোডা, আশ্রম ও জমিদারবাড়িও তালিকায় রয়েছে। যেগুলো চট্টগ্রামের বহু ধর্মীয় ও সামাজিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।
প্রকৌশলী আবু ইসা আনসারী বলেন, ইতোমধ্যে ১০৫টিরও বেশি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও স্থান শনাক্ত করা হয়েছে। এসবের তথ্যচিত্র ও প্রামাণ্য নথি প্রস্তুত করা হয়েছে এবং সংরক্ষণের পূর্ণাঙ্গ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, এই উদ্যোগ শুধু পুনরুদ্ধার বা কারিগরি সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ নয়। বরং ঐতিহ্যকে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, যাতে সংস্কৃতি ও অর্থনীতি একসঙ্গে বিকশিত হতে পারে।
তিনি জানান, ঐতিহাসিক গুরুত্ব, কাঠামোর স্থায়িত্ব এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট–এই তিনটি মানদণ্ডে স্থাপনাগুলো বাছাই করা হয়েছে। এগুলো প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ সংস্থাগুলোর মানদণ্ডের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই উদ্যোগের মাধ্যমে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণকে ভবিষ্যৎ নগর উন্নয়নের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, যাতে অতীতের ঐতিহ্যকে ধারণ করে একটি টেকসই, সমৃদ্ধ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপযোগী নগরায়ন সম্ভব হয়। এই তালিকা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে শেয়ার করা হবে, যাতে তারাও সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। মাস্টার প্ল্যানে অন্তর্ভুক্ত হলে এসব স্থাপনা ধ্বংসের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবে এবং ভবিষ্যৎ প্রকল্পে পুনর্নির্মাণও সম্ভব হবে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে যাচাই–বাছাই শেষ করে সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কার্যক্রম শুরু করা হবে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. দেবাশীষ কুমার প্রামাণিক বলেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিশাল। সিআরবি এলাকা, ইউরোপিয়ান ক্লাব, পুরনো জমিদারবাড়ি ও যুদ্ধ সমাধিক্ষেত্র যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা গেলে তরুণ প্রজন্ম সরাসরি ইতিহাস জানতে পারবে এবং পর্যটন খাতও সমৃদ্ধ হবে।














