চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান

নাসির উদ্দিন হায়দার | রবিবার , ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২ at ১০:৩৫ পূর্বাহ্ণ


‘সূর্য উডের লে ভাই লাল মারি
রইস্যা বন্ধু ছাড়ি গেলগই
বুগত ছেল মারি…।’
(রচয়িতা : অচিন্ত্যকুমার চক্রবর্তী)
কোথায় হারিয়ে গেল সেই রইস্যা বন্ধু? যে বন্ধু দুঃখীনি নারীর বুকে প্রেমের শেল মেরে ছেড়ে যায় চিরতরে! সেই দুঃখীনি নারীই বা কোথায়, যে কাঁখে কলসী নিয়ে জল আনার ছলে শঙ্খ পারে রইস্যা বন্ধুর জন্য বিলাপ করে…’শঙ্খ খালর পানি রে কালা, কালা দুশমন/তাত্তুন অধিক কালা অভাই/পাষাণ বন্ধের মন/ফিরিয়া ন চাইল বন্ধু রে/অবলারে গেল ছাড়ি।’
আচ্ছা, আবদুল গফুর হালীর সেই রসিক তেলকাজলা-পাঞ্জাবিওয়ালা কই? সে কি এখনো বাবরিকাটা চুলের বাহার দেখিয়ে নারীর প্রাণ কাড়ে? এখনো কি বাঁশখালী-মইষখালীর উদ্দেশ্যে গুরগুরাই টানে কর্ণফুলীর সাম্পান? পালে রং লাগিয়ে নারীর মনেও রং ছড়ান শঙ্খ খালের মাঝি?
না, এখন আর ডালেতে ‘লরিচরি’ বসে না চাতকী ময়না, গায় না ‘বৈরাগীর গান’। এখন কি আর কেউ খোঁজ করে সেই সুন্দর মুখের! বানিয়ে খাওয়ায় মহেশখালী কিংবা বক্সিরহাটের পানের কিলি! ‘যদি সোন্দর একখান মুখ পাইতাম/যদি নতুন একখান মুখ পাইতাম/মইশখাইল্যা পানর কিলি তারে/বানাই হাবাইতাম।’
কোথায় গেল সেই নওজোয়ান যারা একদিন তারুণ্যের জয়গানে চট্টগ্রামের নান্দীপাঠ করেছিল, ‘ও ভাই আঁরা চাটগাঁইয়া নওজোয়ান/দইজ্জার কূলত বসত গরি/সিনা দি ঠেগাই ঝড় তুয়ান।’
মনে আছে সেই ফইরার বাপর কথা? যিনি ‘পাইন্যা’ দুধের কারবার করেন, অন্যের ক্ষেতের কধু পা দিয়ে টেনে ছিঁড়ে নেন! শিল্পী যার উদ্দেশে গেয়ে উঠেন…
অ জেডা ফইরার বাপ
অ জেডা ফইরার বাপ
একদিন বুঝিবা জেডা
একদিন বুঝিবা…।
২০ বছরেই ভুলে গেলেন হেডমাস্টরকে, এখন তো আর শোনা যায় না শিল্পী সিরাজুল ইসলাম আজাদের মনমাতানো সেই গান-‘ও মামুরে, হেডমাস্টরে তোঁয়ারে তোয়ার/পোয়া ওগ্‌গা পন্নাত দিলা কেন পরের যাই ন চাইলা/পরীক্ষাত ফিল গইরজে ফারলার ও মামুরে।’
মলকা বানুর দেশে কেন যায় না আর কোনো মনু মিয়া?
‘মলকা বানুর দেশে রে
উঁচা নিচা টিলা আছে রে
কেমতে যাইব মনু
মলকা বানুর দেশে রে…।’
সত্যি! সাম্পান মাঝির কণ্ঠে এখন আর সুর নেই। নেই সেই মলকা বানু, নেই সেই মনু মিয়াও। নাগরিক জীবনে ইট-কংক্রিট আর কাষ্ট-লোহায় জমাট পিরিতি আছে, মেটোপথেও এখনো ফুটে প্রেমপুষ্প, কিন্তু সে প্রেম আর গান হয়ে উঠে না, রাঙিয়ে দেয় না চাটগাঁবাসীর মন।
হ্যাঁ, আমি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের কথাই বলছিলাম। আঞ্চলিক গান কি তবে হাজার বছরের পথচলা শেষে পৌঁছে গেল গোধূলী বেলায়! পাঞ্জেরি, সূর্য ডোবার আর কত দেরি!
এখন ইন্টারনেটের যুগে, ইউটিউব-ফেসবুক ও মোবাইল ফোনের বদৌলতে সব ধরণের গানের প্রচার-প্রসার বেড়েছে। একযুগ আগেও কোন শিল্পীর একটা ক্যাসেট ৫০ হাজার বা লাখ কপি বিক্রি হলেই সুপারহিট তকমা পেত। এখন ফেসবুক-ইউটিউবে একটা গান এক মাসের মধ্যে মিলিয়ন মিলিয়ন ভিউ (দর্শক-শ্রোতা) পাচ্ছে, কোন কোন গানের ভিউ কোটি ছাড়িয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানও এই ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। শেফালী ঘোষ-শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব, কল্যাণী ঘোষ, সঞ্জিত আচার্য্যের গাওয়া পুরোনো গানগুলো রিমিক্স করে বাজারে ছাড়লেই সুপারহিট হচ্ছে, গত একদশকে আবদুল গফুর হালী রচিত ও সন্দীপনের গাওয়া ‘সোনাবন্ধু তুই আমারে করলি রে দেওয়ানা’, শিরিনের গাওয়া ‘পাঞ্জাবিওয়ালা, মনের বাগানে’, এমএন আখতার রচিত ‘কইলজর ভিতর গাঁথি রাইখ্যম তোঁয়ারে’ কিংবা সঞ্জিত আচার্য্যের অমর সৃষ্টি ‘বাঁশখালী-মইষখালী’ গানগুলোর তুমুল জনপ্রিয়তা সেটাই সাক্ষ্য দেয়। এবং এটাও সত্য যে, এখন চট্টগ্রামে তো বটেই জাতীয় পর্যায়েও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান ছাড়া টেলিভিশন বা মঞ্চের কোন অনুষ্ঠান জমে না। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় রচিত ‘মধু হই হই বিষ হাবাইলা’র মতো আর ক’টি গান সারা দেশে এমন জনপ্রিয়তা পেয়েছে? সাম্প্রতিক সময়ে দেশমাতানো ‘আইপিডিসি আমাদের গান’-আয়োজনেও গফুর হালী রচিত এবং সন্দীপন ও অরিনের গাওয়া ‘নাইয়র নিবা নিবা হই বউত ভারাইলা’ গানটি গত ৬ মাসে অর্ধকোটির বেশি ভিউ পেয়েছে।
পাঠক প্রশ্ন করতে পারেন, তাহলে আমি কেন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের ভবিষ্যৎ নিয়ে এত শঙ্কিত? কারণটা পরে বলব, তার আগে চাটগাঁইয়া গানের সোনালী অতীতের গল্পটা শুনুন।
এই যে ছোট ছোট ঢেউ তুলে বয়ে যাচ্ছে কর্ণফুলী, শঙ্খ, মাতামুহুরী কিংবা বাঁকখালী, আঞ্চলিক গান হয়তো এই নদনদীরই সহোদর। আমরা জানি না সেই ইতিহাস। শত বছর ধরে, হাজার বছর ধরে চট্টগ্রামের মানুষ আঞ্চলিক ভাষায় গান গেয়ে, গানের সুরে মত্ত হয়ে দিনাতিপাত করেছে। কালে কালে আঞ্চলিক গানের কত দিকপাল শিল্পীর জন্ম হয়েছে, আঞ্চলিক গানকে তারা সুজলা-সুফলা করেছেন, তাদের সবার নাম হয়তো আমরা জানি না। আমরা শুধু জানি, এই গান আমাদের কাছে বিনোদনের তুচ্ছ প্রেম শুধু নয়, এ গান আমাদের জীবনেরই অন্য নাম।
যখন বেতার-টেলিভিশন ছিল না, ছিল না গ্রামোফোন, টুইন ওয়ান, ভিসিআর, ভিসিডি কিংবা আইপড, মোবাইল মেমোরি, তখনও আঞ্চলিক গান হয়েছে, সে গান বাতাসে ভেসে এক কণ্ঠ থেকে আরেক কণ্ঠে গিয়ে বেঁচে থেকেছে। ঊনবিংশ কিংবা বিংশ শতাব্দীর শুরুতেও আঞ্চলিক গানের নিরাপদ আবাস ছিল আপামর মানুষের কণ্ঠ। যখন থেকে যন্ত্র এসেছে তখন থেকে সব গানের মতোই আঞ্চলিক গানেরও জোশ বেড়েছে, কাটতি বেড়েছে। কিন্তু যন্ত্রের মন্ত্র চিরদিন থাকতে পারে না, তাই এখন এই যন্ত্রই হয়ে উঠেছে আঞ্চলিক গানের সবচেয়ে বড় ঘাতক।
ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীর কবিগান, আঞ্চলিক ও মাইজভাণ্ডারী গানের উদগাতা হলেন রমেশ শীল। তিনি দুই বঙ্গেরই শ্রেষ্ঠ কবিয়াল। কবিগানের জলসায় নিশুতি রাতে আঞ্চলিক ভাষায় নিজের বাঁধা কোনো গান হঠাৎ গেয়ে উঠতেন রমেশ, চমকে দিতেন শ্রোতাদের। তেমনই একটি গান-‘আঁধার ঘরত রাইত হাডাইয়ম হারে লই…।’ রমেশের এই ভাবের গান শোনে সজল হয়ে উঠত শ্রোতাদের চোখ। তিনিই আবার একই আসরে শ্রোতাদের ভাসাতেন আনন্দে, গেয়ে উঠতেন ‘নাতিন বরই খা বরই খা হাতে লইয়া নুন/ঠেইল ভাঙিয়া পইজ্জে নাতিন বরই গাছরত্তুন।’ এভাবেই রচিত হয়েছে আঞ্চলিক গানের ইতিহাস, ইতিহাসের স্বপ্নডানায় এসেছে এই গানের সমৃদ্ধি। চাটগাঁইয়া গানের ইতিহাসে রমেশ শীল এক মুকুটহীন সম্রাট।
সাধক আস্কর আলী পণ্ডিত ও খাইরুজ্জামা পণ্ডিত মরমী ধারার পাশাপাশি আঞ্চলিক গানেও অমূল্য অবদান রেখেছেন। আস্করের ‘ডালেতে লরিচরি বইও’, ও ‘কি জ্বালা দি গেলা মোরে’ এবং খাইরুজ্জামার ‘বেজার গইল্যাম আমার বন্ধুরে’র মতো অমর গানগুলো এর প্রমাণ।
বিগত শতকের তিরিশের দশকে পাহাড়তলী সরাইপাড়ার কিশোর ছেলেটি, মোহাম্মদ নাসির যার নাম, তিনি কলকতার এইচএমভির মতো প্রতিষ্ঠান থেকে রেকর্ড করার সুযোগ পেয়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানকে নিয়ে গেছেন অনেকদূর। অবশ্য গ্রামোফোন রেকর্ডে নাসিরের প্রথম গান দুটি ছিল মাইজভাণ্ডারী, ‘রসিক ভান্ডারী তোরে চিনব কেমনে’ ও ‘বাঁশী বাজে হৃদমন্দিরে কে বাঁশী ফুঁকে’। এরপর তিনি চট্টগ্রামের মাটির সুর কণ্ঠে ধারণ করলেন, গাইলেন, ‘চাঁদমুখে মধুর হাসি/দেবাইল্যা বানাইল রে মোরে সাম্পানর মাঝি..।’
নাসিরের পরে আকিয়াব শহরে জন্ম নেওয়া (বাড়ি যার বাঁশখালীর পালে গ্রামে) অচিন্ত্যকুমার চক্রবর্তীর মতো শিক্ষিত তরুণরা আঞ্চলিক গান লিখে ও গেয়ে এ গানের প্রতিষ্ঠায় অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন সত্তরের দশকে শেফালী ঘোষ অচিন্ত্যকুমার রচিত ‘সূর্য উডেরলে ভাই লাল মারি…’ গানটি গেয়ে আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা পান।
ফটিকছড়ির সংগীতরত্ন, মোহন লাল দাশের কথা আমরা ভুলতে পারি না। বেতারের এই শিল্পী হাতেগোনা কয়েকটি গান দিয়ে নিজেকে অমর করেছেন। ১৯৬৮ সালের দিকে মোহল লালের কথা ও সুরে ‘ওরে সাম্পানওয়ালা তুই আমারে করলি দিওয়ানা’ গানের রেকর্ড দিয়েই কিন্তু ‘শিল্পী শেফালী ঘোষের’ উত্থান হয়েছিল। মোহন লাল দাশ রচিত গজল ‘হারানো দিনের কথা মনে পড়ে যায়…’ গেয়েছেন গজলসম্রাট মেহেদী হাসান। এ আমাদের জন্য বড় গৌরব, পরম পাওয়া।
একটা বিষয় উল্লেখ করা দরকার। আঞ্চলিক গান আর মাইজভাণ্ডারী গানের মধ্যে সম্পর্কটা দূর সম্পর্কের দুই ভাইয়ের মতোই, যারা কি না ভাবে আবার মায়ের পেটের ভাইয়ের চেয়েও বেশি। মাইজভাণ্ডারী গানের সুর ও গায়কীতে নিজস্বতা থাকলেও মাঝেমধ্যে দুই ধারার গানে আশ্চর্য মিত্রতা লক্ষ্য করা যায়। যেমন মাইজভাণ্ডারী গানের উদ্ভাবক বা আদি রচিয়তা হিসাবে পরিচিত মাওলানা আবদুল হাদী কাঞ্চনপুরীর সেই বিখ্যাত ‘বিচ্ছেদের অনলে সদাই অঙ্গ জলে…’ গানটির সুরে আর কথায় আঞ্চলিক গানের সৌরভ আছে। তেমনি অচিন্ত্যকুমার চক্রবর্তীর ‘সূর্য উডেরলে ভাই লাল মারি’ গানে মাইজভাণ্ডারী গানের সুর মিলেমিশে একাকার।
আঞ্চলিক গানের সোনালী সময় হলো ’৬০ থেকে ৯০ এর দশক পর্যন্ত। এ সময়ে বিষয়-বৈচিত্র্যে, সুর-সুষমায় এ গান শনৈ শনৈ উন্নতি করেছে।
এই চার দশকে অসংখ্য কালজয়ী গানের সৃষ্টি হয়েছে, বেশ কয়েকজন কিংবদন্তীতুল্য গীতিকার, সুরকার ও শিল্পীর দেখা পেয়েছে চট্টগ্রাম। আর এই সময়েই আবির্ভাব ও প্রসিদ্ধি আঞ্চলিক গানের কিংবদন্তী জুটি শেফালী ঘোষ ও শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের। কে না জানে শ্যাম-শেফালীই চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানকে নিয়ে গেছেন জাতীয় পর্যায়ে, বিশ্ব দরবারে।
’৬০ ও ৭০ এর দশকে মোহনলাল দাশ, মলয় ঘোষ দস্তিদার, এম এন আখতার, আবদুল গফুর হালী, শেফালী ঘোষ, শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব, সাবিনা ইয়াসমিন, ইয়াকুব আলী সরকার, রশিদ কাওয়াল, লক্ষীপদ আচার্য, আহমেদ কবির আজাদ, সঞ্জিত আচার্য, কল্যাণী ঘোষ, কান্তা নন্দী, উমা খানরা আঞ্চলিক গানে জনপ্রিয়তার সর্বপ্লাবী বান নিয়ে আসেন। সেই বানের আনন্দধারায় ভেসে গেছেন চট্টগ্রাম তো বটেই সারা দেশের মানুষ।
১৯৭৭ সালে সাবিনা ইয়াসমিনের মতো শিল্পী এমএন আখতারের সাথে জুটি বেঁধে দ্বৈতকণ্ঠে গেয়েছেন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান ‘কইলজার ভিতর গাঁথি রাইখ্যম তোঁয়ারে…।’ সেই গানে সাবিনার বিশুদ্ধ আঞ্চলিক উচ্চারণ শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে। এম এন আখতারের অমর এই গানটি ইদানিং কালজয়ী গান হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে। ’৭০ ও ৮০ এর দশকে অন্যরকম কিছু রোমান্টিক গান (যদি সোন্দর একখান মুখ পাইতাম, ও পরানর তালত ভাই) লিখে, গেয়ে এমএন আখতার চিরাচরিত আঞ্চলিক গানে নতুন ধারার সৃষ্টি করেন।
আঞ্চলিক গানের কালজয়ী জুটি শ্যাম-শেফালীর প্রথম দ্বৈতকণ্ঠের গানটির (নাইয়র গেলে আইস্য তরাতরি) স্রষ্টা মলয় ঘোষ দস্তিদার। রাউজানের নোয়াপাড়ায় জন্ম নেওয়া এই শিল্পী ১৯৪১ সালে কণ্ঠ দিয়েছেন অল ইন্ডিয়া রেডিওতে। ৫৪ সালে শিল্পী পংকজ কুমার মল্লিকের ডাকে কলকতা গিয়ে গান রেকর্ড করেন। ‘ছোড ছোড ঢেউ তুলি’ গানটি তার অনবদ্য ও অমর সৃষ্টি।
’৭০ এর দশকে আবদুল গফুর হালীর উত্থান মাইজভাণ্ডারী গান দিয়ে, পরে আঞ্চলিক গানেও দেশজোড়া খ্যাতি লাভ করেন। গফুর হালী শিল্পী হিসাবে শুরু করলেও খ্যাতিমান হলেন গীতিকার, সুরকার হিসাবে। শেফালী ঘোষের অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা গফুর হালী। এমনকি শ্যাম-শেফালী জুটির অনেক জনপ্রিয় গানও গফুরের সৃষ্টি। আর শিল্পী কল্যাণী ঘোষ তো আক্ষরিক অর্থে গফুর হালীর সৃষ্টি। পটিয়ার রশিবাদের অশীতিপর এই সাধক-শিল্পী নিজেকে প্রকৃতির সন্তান হিসাবে পরিচয় দিতেন।
বিংশ শতাব্দীর ’৮০ ও ৯০ এর দশকে এবং একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত আঞ্চলিক গানের ময়ূরপঙ্খী নায়ে পাল উড়িয়েছেন সৈয়দ মহিউদ্দিন, শিল্পী রাণী, নুরুল আলম, সিরাজুল ইসলাম আজাদ, বুলবুল আকতার প্রমুখ। হালে সেই পালে জোর হাওয়া লাগিয়েছেন প্রেমসুন্দর বৈষ্ণব।
চকরিয়ার শিল্পী আহমদ কবির আজাদ হলেন, শিল্পী সিরাজুল ইসলাম আজাদ ও রবি চৌধুরীর ওস্তাদ। আহমদ কবির আজাদের বিখ্যাত গান ‘দইজ্যার কাছাত বালুর চর, তার উয়রদি পাআর/বালুর চরত ঢেউ খেলিলে, হত গম গম লার…।’ কক্সবাজার অঞ্চলে বুলবুল আকতারের সাথেই ছিল তার গানের জুটি। আশির দশকের শুরুতে শিল্পী রাণী-আহমদ কবির জুটিও অনেকটা জমে গিয়েছিল, আহমদ কবিরের অকাল মৃত্যু সেই সম্ভাবনা শেষ করে দেয়।
আশির দশকে ফটিকছড়ির পূর্ব সুয়াবিলের সৈয়দবাড়ির সন্তান সৈয়দ মহিউদ্দিনকে আমরা পাই জীবনমুখী আঞ্চলিক গানের স্রষ্টা হিসাবে। পরে তার সাথে নাড়া বাঁধেন সিরাজুল ইসলাম আজাদ। তাদের গান অন্য সবার চেয়ে একটু আলাদা। মহি তো জীবনমুখী গান দিয়ে আঞ্চলিক গানে নতুন ধারা সৃষ্টি করলেন। প্রচার আছে ২০০২ সালে আমিন স্টোর থেকে বের হওয়া সিরাজের ‘হেডমাস্টর’অ্যালবামটি ক্যাসেট বিক্রির অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল।
এবার আসা যাক-আঞ্চলিক গানের সাম্প্রতিক সংকট প্রসঙ্গে।
আমি আগেই বলেছি, শুধু আঞ্চলিক গান নয়, বর্তমান ডিজিটাল যুগে সব গানেরই প্রচার-প্রসার বেড়েছে, কিন্তু বাংলা গানের অন্য অনেক ধারা ফেসবুক-ইউটিউবের সুযোগ নিয়ে যেভাবে সুজলা-সুফলা হচ্ছে, চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান তার ধারেকাছেই নেই। এর বড় কারণ হলো পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। একটু খেয়াল করলেই দেখা যাবে, জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে পুরোনো আঞ্চলিক গানগুলোই রিমিক্স করে গাওয়া হচ্ছে, নতুন জনপ্রিয় আঞ্চলিক গান তৈরি হচ্ছে না। নতুন গান যেহেতু হিট হচ্ছে না, সেহেতু নতুন শিল্পী, গীতিকার-সুরকারও পাদপ্রদীপের আলোয় আসতে পারছে না।
লিজেন্ড সৈয়দ মহিউদ্দিন, সঞ্জিত আচার্য্য, কল্যাণী ঘোষ, সিরাজুল ইসলাম আজাদ ও বুলবুল আকতারের পর আঞ্চলিক গানে উল্লেখ করার মতো শিল্পী-গীতিকার-সুরকার কি তৈরি হয়েছে? কেন হচ্ছে না? প্রশ্নটার উত্তর জানা জরুরি।
গানের জগতে সত্তরের দশক ছিল গ্রামোফোন রেকর্ডের যুগ, আশি ও নব্বইয়ের দশক ক্যাসেটের এবং এরপর একবিংশ শতাব্দীর শুরুটা ছিল সিডির। সত্তর থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত রেকর্ড, ক্যাসেট ও সিডিতে গানের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে চট্টগ্রামের নিউমার্কেট ও রিয়াজউদ্দিন বাজারে বেশ কয়েকটি বড় সংগীত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। আনন্দমেলা আর ঐকতান ছিল গ্রামোফোন রেকর্ডে গান ব্যবসার প্রধান প্রতিষ্ঠান। ক্যাসেট যুগে চট্টগ্রামের বনেদী সংগীত প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ছিল আমিন স্টোর, বিনিময় স্টোর, ন্যাশনাল ইলেকট্রনিক্স, শাহ আমানত অডিও কমপ্লেক্স আর কক্সবাজারে ছিল আলাউদ্দিন রেকর্ডিং হাউস, রেডিও ট্রেডার্স, মহেশখালীতে আবু সৈয়দ মাইক সার্ভিস, নোয়াপাড়া পথের হাটে শাহ আলম মাইক সার্ভিস। এসব প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান অসংখ্য কালজয়ী আঞ্চলিক গান উপহার দিয়েছে। কিন্তু ২০১০ সালের আগে ও পরে গান মোবাইলে চলে যাওয়ার পর ক্যাসেট আর সিডি ব্যবসা জলে ভেসে যায়। কারণ, ১০টি গান ২০ টাকা দিয়ে যেখানে মোবাইলে লোড করা যায়, সেখানে শ্রোতারা কেন ১০টা গানের জন্য ৪০/৫০ টাকা দিয়ে ক্যাসেট বা সিডি কিনবে? প্রকৃতপক্ষে প্রথমে মোবাইল, পরে ফেসবুক-ইউটিউবের কারণে সারা দেশের মতো চট্টগ্রামের অডিও ব্যবসায়ও ধস নামে। ফলে আমিন স্টোর, বিনিময় স্টোর ও শাহ আমানত অডিও কমপ্লেক্সের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো গান প্রযোজনা বাদ দিয়ে ভিন্ন ব্যবসা ধরে। এতে চট্টগ্রামের সংগীত জগতে বড় ধরণের সংকট তৈরি হয়। সঞ্জিত আচার্য্য, কল্যাণী ঘোষ, সিরাজুল ইসলাম আজাদ ও শিমুল শীলের মতো জনপ্রিয় শিল্পীদের নতুন গান না আসায় রাতারাতি গজিয়ে উঠা ভূঁইফোড় শিল্পীদের দখলে চলে যায় চট্টগ্রামের লোকগান। বিশেষ করে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকেন্দ্রিক ভূঁইফোড় শিল্পীদের অশ্লীল আঞ্চলিক গানে ভরে যায় ইউটিউব-ফেসবুক। ডিজিটাল মাধ্যমে এখনো চলছে অশ্লীল আঞ্চলিক গানের রাজত্ব। তবে এর মধ্যেও আজিজনগরের আজম শাহ, চকরিয়ার মেরী প্রমুখ শিল্পী চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানে দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। তারা মূলধারার আঞ্চলিক গান গেয়ে ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছেন, এটা প্রশংসাযোগ্য। দক্ষিণ চট্টগ্রামের উদীয়মান গীতিকার বেলাল উদ্দিন হৃদয়ও ঐতিহ্যের ধারায় আঞ্চলিক গান লিখে খ্যাতি পেয়েছেন।
তবে যেটা বলতে চেয়েছিলাম, ডিজিটাল মাধ্যমের আধিপত্যে, অডিও বাজারে ধ্বস নামার পরও গত কয়েক বছরে পৃষ্ঠপোষকতার কারণে বাংলা লোকগান আবারও গৌরবের ধারায় ফিরেছে। বিশেষ করে আইপিডিসি আমাদের গান’সহ বিভিন্ন রিয়েলিটি শোর মাধ্যমে বাংলা লোকগান এখন বেশ জনপ্রিয়। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানও এইরকম পৃষ্ঠপোষকতা পেলে অচিরেই হারানো ঐতিহ্য ফিরে পাবে বলে আমি মনে করি। ইতিমধ্যে আইপিডিসি আমাদের গান-আয়োজনে কবিয়াল রমেশ শীল রচিত ‘স্কুল খুলেছে রে মওলা’ ও আবদুল গফুর হালী রচিত ‘নাইয়র নিবা নিবা গরি বউত ভারাইলা’ গান দুটি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। শিগগিরই আসছে এমএন আখতার রচিত একটি গান, যেটি গেয়েছেন পাঞ্জাবিওয়ালা-খ্যাত শিল্পী শিরিন। চট্টগ্রামেও আবদুল গফুর হালী রিসার্চ সেন্টার শিল্পী শিরিনের কণ্ঠে গফুর হালী ও কবিয়াল রমেশ শীলের ১০টি আঞ্চলিক ও মরমী গান নতুন সংগীতায়োজনে রেকর্ড করে ‘গফুর হালী’ নামক ইউটিউবে ছাড়ছে।
এভাবে চট্টগ্রামের সংগীতপ্রিয় বিত্তবানরা যদি পৃষ্ঠপোষকতা করে, নতুন গান তৈরি হয়, তাহলে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানে আবার ঝড় উঠবে-আবার হয়তো শ্যাম-শেফালীর মতো কালজয়ী শিল্পী চট্টগ্রামের গান নিয়ে মাতাবে দেশ, মাতাবে বিশ্ব-এই আশায় রইলাম।
লেখক : সাংবাদিক ও লোকসংগীত গবেষক