ঘোড়াউত্রা তীরের গেরস্তি

‘দৌড়াও ক্যারে’

বাবর আলী | সোমবার , ২৩ মে, ২০২২ at ১০:২৪ পূর্বাহ্ণ

সেই কবে একদিন সানিকে কথাচ্ছলে বলেছিলাম হিমালয়ের গাড্ডিদের কথা। হিমালয়ের মেষপালকদের বলা হয় গাড্ডি। জুন-জুলাই মাসে নতুন উদিত হওয়া ঘাসগুলো ভেড়া-ছাগলদের উদরস্থ করতে নিকটস্থ পাহাড়ি জনপদ থেকে গৃহপালিত পশুর পাল নিয়ে হিমালয়ের উঁচু স্থানের দিকে যাত্রা করে মেষপালকদের দল। স্থানীয় ভাষায় তাদেরকে বলা হয় ‘গাড্ডি’। একটি পর্বতাভিযানে গিয়ে সর্বপ্রথম জানতে পারি এদের কথা। নিকটস্থ পাহাড়ি গ্রাম থেকে বেস ক্যাম্পের দিকে যাত্রাকালে স্থানীয় লোক যার সাথেই কথা হচ্ছিল সে-ই বলছিল, ‘উপর যা রাহা হো? উহা পর গাড্ডি হ্যায়।’ প্রথমদিন এই গাড্ডির কথা শুনে আমি বেশ খানিকটা দোটানায় পড়ে গিয়েছিলাম। কী বলে এরা! গ্রামের উচ্চতার চেয়ে বেসক্যাম্পের উচ্চতা কম করে হলেও পাঁচশো মিটার বেশি। ওই জায়গায় পায়ে হেঁটে পৌঁছানোই বিশাল কম্মো! সেখানে নাকি আবার গাড্ডি! গাড্ডি বলতে তখন যন্ত্রচালিত গাড়ির কথাই মাথায় এসেছিল। দিনকয়েক আগে সানি জানাল, ওর এক কাকা হিমালয়ের সেই গাড্ডিদের মতোই শীতের শুরুতে চলে যান হাওড়ে। সেখানে চাষবাস করেন এপ্রিল পর্যন্ত। এরপরে আবার ফিরে আসেন নিজের বসতবাড়িতে। যে অংশটুকুতে চাষাবাদ হয়, সেটা বছরের ওই সময়টুকু বাদে অন্য সময়ে পানির নিচেই তলিয়ে থাকে।

এমন জায়গায় যাবার লোভ সামলানো বেশ কঠিনই। গাড্ডি না হোক, হাওড়যাত্রা তো হতেই পারে। হরিপালের করমচা চিবিয়ে আপাতত কাশ্মীরি আঙুর চিবানোর সুখ নেয়া যাক! বছরের শেষদিনে সানিদের কিশোরগঞ্জের বাসায় আন্টির বানানো দুধ-চিতই আর কলা পিঠা খেয়ে সকাল সকাল যাত্রা শুরু। আপাত গন্তব্য কটিয়াদী পেরিয়ে নিকলীর রোদার পুড্ডা বাজার। সানির সেই কাকার বাড়ি বাজারের কাছেই। ধানী জমির রাস্তা লাগোয়া অংশ উঁচু করে বানানো বসতবাড়ি। গেরস্থ বাড়ির একেবারে প্রকৃষ্ট উদাহরণ। নানান ফলজ গাছে ভর্তি বাড়ির আঙিনা। এখানে-ওখানে লাউয়ের ডগা বাড়ির চাল ছোঁয়ার চেষ্টায় রত। বিশাল গোয়ালঘরে ১০-১২টা গরু অনায়াসেই জায়গা করে নিতে পারে। খোলা উঠোনটায় চেয়ার পেতে বসতেই হাজির হয়ে গেল বাদাম আর শিমের বিচি। কাকার নিজের খেতের বাদাম। কাকার ছেলে ওবায়দুল্লাহ এটা-সেটা এগিয়ে দিচ্ছিল। কদিন বাদেই সেনাবাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগদান করবে সে। উঠোনের কোণ দেখিয়ে জানাল, বর্ষায় এখানে বসেই অসংখ্য পুঁটি মাছ ধরে সে। বসতভিটার সীমানা প্রাচীর তখন কানায় কানায় পূর্ণ থাকে পানিতে। কাকা বারবার বলছিলেন, ‘আমরা হাওরে গরু-বাছুরদের সাথে থাকি। বাবারা, তোমরা থাকতে পারবা?’ এই ধরনের কথা আমাদের সামনে বলা বলদের সামনে বেদপাঠের মতোই। আমরা এই সংক্রান্ত যাবতীয় চিন্তা কাকাকে ঝেড়ে ফেলতে বললেও কাকা নিশ্চিন্ত হতে পারছিলেন না। হাওড় অভিমুখী যাত্রায় আমাদের সঙ্গী হলো ওবায়দুল্লাহও।

নিকলী নতুন বাজারের কিছু পর থেকে লাইনের ট্রলার ছাড়ল জুমার নামাজের পর। ছোট্ট ট্রলারে উঠে পড়লাম যে নদী থেকে, তার নাম ‘রোদার গাং’। এ অঞ্চলে অবশ্য সব নদীকেই স্থানীয়রা ‘গাং’ নামেই ডাকে। এই নদী মূলত ঘোড়াউত্রা নদীর শাখা। দুই তীরে জাল দিয়ে ঘেরা অসংখ্য জায়গা। বদ্ধ সেসব স্থানে হাঁস পালন হয়। কিছু ঘেরের হাঁসের গায়ে আবার রং করা। এক মালিকের হাঁসের সাথে অন্য মালিকের হাঁস যাতে মিশে না যায়, সেজন্যই এই আবির মাখামাখি। জালের ঘেরাটোপে আবদ্ধ হাঁসের বিপরীতে আছে মুক্ত পানকৌড়ির দল। কচুরিপানাকে গুচ্ছ করে রাখতে পুঁতে রাখা বাঁশের উপরে আর নদীতে তাদের অবাধ বিচরণ। নদীর দুই ধারে প্রচুর ভুট্টা খেত। এদিকে এত ভুট্টা হয় জানাই ছিল না। আমাদের ট্রলারের সহকারী বিভোর হয়ে আছে বাঁশিতে। ট্রলারের ইঞ্জিনের শব্দ ছাপিয়ে কানে বাজছে ভাটি অঞ্চলের নানান গানের সুর।

ট্রলার আরো খানিক যাবার পর নদীর দুই ধার থেকে বাড়ি-ঘর অদৃশ্য হয়ে গেল। বৈদ্যুতিক খুঁটি বাদে উঁচু কিছুই আর তেমন দৃশ্যমান নয়। মাঝে মাঝে দেখা মিলছে ধানের রোয়া হাতে কিছু লোকের। সেচের জন্য বসানো আছে বিশাল সব পাম্প। নদী থেকে পানি উঠিয়ে সজীব রাখছে ধানখেত। ছোটখাটো বেশকিছু নৌকা অতিক্রম করছে আমাদের। যাত্রীদের সবার হাতের কাছেই টিফিন ক্যারিয়ার দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না এরা বেশিরভাগই দূরের যাত্রী। মাঝে এক ট্রলার লোককে দেখলাম টিফিন ক্যারিয়ার থেকে খাবার বের করে দুপুরের খাবার সারতে। ঘোড়াউত্রা নদী ধরে আরো কিছুদূর যেতেই আমাদের গন্তব্য জমসাই হাওড়ে পৌঁছে গেলাম।
‘দিগন্তবিস্তৃত খেত’ ব্যাপারটার আদর্শ উদাহরণ এই হাওড়। যতদূর চোখ যায়, শুধু নানান ফসলের খেত। প্রচুর ধানের পাশাপাশি অঢেল পরিমাণে হয় ভুট্টা, বাদাম, আলু, মিষ্টি আলু, কুমড়া ইত্যাদি। অল্পস্বল্প সরিষাও করে লোকে। শুধু ফসলেই সীমাবদ্ধ থাকে না ছয় মাসের এই চাষাবাদ। সব কৃষকই সাথে নিয়ে আসে বেশকিছু গরু আর বাছুর। ঘাসের প্রাচুর্য এই হাওড়জুড়ে। গরু কিংবা বাছুর বড় করতে আলাদা খাবারের খুব একটা প্রয়োজন পড়ে না। চাষাবাদ আর গরু-বাছুর পালনের এই ব্যাপারকে স্থানীয় ভাষায় একত্রে বলা হয় ‘গেরস্তি’।

এই এলাকার জমির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো, এই জমিতে ফসল হয় সাধারণ দুই কিংবা তিন ফসলি জমির দ্বিগুণ। ছয় মাস হাওড়ের পানিতে তলিয়ে থাকাই সম্ভবত এই দারুণ উর্বরতার কারণ। যে ফসলই লাগানো হোক না কেন, সেটা ফলে দারুণভাবে। খুব বেশি পরিচর্যারও দরকার হয় না। এ মাটির এমনই গুণাগুণ। কাকার অস্থায়ী টিনের ঘরটা নদী থেকে মিনিট পনেরোর হাঁটা দুরত্বে। লম্বা এক সার টিন দিয়ে তৈরি ঘরের পাশেই সারবাঁধা বাঁশের খুঁটি। আটটা গাভি সেখানেই দিনমান বাঁধা থাকে। হাওড়ের অঢেল ঘাস চিবোয় আর অবসরে কাটে জাবর। রাতের বেলা এই গরুদের স্থান হয় অস্থায়ী টিনের ঘরে। টিনের ঘরেও একসার বাঁশের খুঁটি বাঁধা। খুঁটির যেখানে শেষ, সেখানে আছে একটা খাট। আর খাটের সাথেই লাগানো একটা কাঠের টেবিল। খাটেই রাত্রিযাপন করে কাকার ছেলে আর কাকা। এই খাটেই আজ আমাদের থাকার বন্দোবস্ত।

মানুষ আর গরুর সহাবস্থানের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই অস্থায়ী ঘর। বর্ষার পানি নেমে গেলে নভেম্বরের দিকে লোকে এখানে আসতে শুরু করে। ফেরে বৈশাখ মাসের শুরুতে। কাকা নিয়মিত এখানে না থাকলেও কাকার ছেলে রাকিব থাকে এখানেই। পড়াশোনা জিনিসটা যথেষ্ট কঠিন ঠেকায় সে বেছে নিয়েছে ‘গেরস্তি’র কাজ। বাবার কাজের বোঝা অনেকাংশেই কমিয়ে দিয়েছে রাকিব। নিদারুণ পরিশ্রমের ফলস্বরূপ অল্পবয়সি শরীরে কিলবিল করছে পেশি। অবশ্য সানি অনেকদিন বাদে ওকে দেখে চিনতেই পারেনি। রোদে পুড়ে একদম কালো হয়ে গিয়েছে। এই হাওড়ে ছায়া প্রদানকারী কোন গাছই নেই। সাকুল্যে একটা বড় গাছই চোখে পড়েছে। বাকি সবই ফসলের খেত। আরেকটা জিনিসের বেশ অভাব ছিল দিনকয়েক আগেও। সেটা হলো সুপেয় পানির অভাব। এবার মৌসুমের শুরুতে অবশ্য বসেছে টিউবওয়েল।