ভেজাল ও দূষিত খাদ্যের ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশের খাদ্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিবন্ধন ও লাইসেন্সের আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী ১ নভেম্বর থেকে নির্ধারিত শ্রেণির খাদ্য ব্যবসার জন্য নিবন্ধন এবং বিশেষায়িত খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও বিপণনে লাইসেন্স বাধ্যতামূলক হচ্ছে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান থেকে শুরু করে রাস্তার পাশের পিঠা, পুরি ও পিঁয়াজুর দোকানও আসছে নিবন্ধনের আওতায়। তবে খাদ্যে ভেজাল ও দূষণের উদ্বেগজনক চিত্রের মধ্যে নতুন এ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে নিয়মিত নজরদারি ও আইনের যথাযথ প্রয়োগের ওপর।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) এক গবেষণায় সারা দেশ থেকে সংগৃহীত খাদ্য নমুনার ৫২ শতাংশ দূষিত পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। অন্যদিকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট মাসে খাদ্যে অনিয়মের বিরুদ্ধে ৭৪৪টি মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করেছে কর্তৃপক্ষ।
খাদ্যে ভেজাল নতুন কোনো বিষয় নয়। এ নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে ব্যাপক আলোচনা চলছে। প্রকাশিত হয়েছে অসংখ্য প্রতিবেদন। ভেজাল বিরোধী অভিযানও পরিচালিত হচ্ছে কিছুদিন পর পর। খাবারের মান নির্ণয় করতে রেস্তোরাঁগুলোর জন্য গ্রেডিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু সব কিছুর পরও দূষিত ও ভেজাল দেওয়ার বিষয়টি যেন নির্ভেজালই থেকে গেছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাটাই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, উদ্বেগের বিষয় হলো, জীবন ধারণের জন্য যে খাবার মানুষ প্রতিদিন গ্রহণ করছেন, তা–ই আজ ধীরগতির বিষে পরিণত হয়ে ডেকে আনছে অকালমৃত্যু। ফলে ক্যানসার, কিডনি বিকল, লিভারের ক্ষতি, হৃদরোগ কিংবা শিশুদের মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়ার মতো নীরব মহামারি আজ ঘরে ঘরে। অতিমুনাফালোভীদের এই বিবেকহীনতা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ধারাবাহিক শিথিলতার কারণে পুরো জাতি আজ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় তিন লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন, দুই লাখ মানুষ কিডনি রোগে, দেড় লাখ ডায়াবেটিসে ভোগেন এবং প্রতি বছর প্রায় ১৫ লাখ প্রতিবন্ধী শিশু জন্মগ্রহণ করে, যার অনেকাংশই গর্ভবতী মায়ের শারীরিক জটিলতা থেকে উদ্ভূত। এ ভয়াবহ প্রবণতার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে খাদ্যে ভেজাল। বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রতিদিন আমাদের প্রয়োজন বিশুদ্ধ, টাটকা, সংরক্ষকবিহীন, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকমুক্ত, পুষ্টিকর খাবার। অথচ মুনাফার লোভে দেশের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে খাদ্যে শিল্পজাত রাসায়নিক, রঙ এবং কৃত্রিম উপাদান মেশাচ্ছেন। যদিও আইন–শৃঙ্খলা বাহিনী এ সমস্যা সমাধানে কাজ করছে, অনেক ক্ষেত্রেই তারা ভেজালকারীদের শনাক্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। শক্তিশালী চক্র আইনকে পাশ কাটিয়ে এমনভাবে নকল খাদ্য উৎপাদন করছে, যেখানে মূল উপাদানের বদলে কম খরচের, ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে দুগ্ধজাত পণ্য, তেল–চর্বি, ফলমূল, ঘি, শাকসবজি, দানাজাতীয় খাদ্য, মধু, চা–কফি ইত্যাদি খাদ্যে ভেজালের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি এবং এটি অনেক সময় জীবনঘাতী হয়ে উঠছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, ‘খাবার শুধু ক্ষুধা মেটানোর উপকরণ নয়, সুস্থভাবে বেঁচে থাকারও প্রধান শর্ত। অথচ বাইরে খাওয়া খাবারের উৎস, প্রস্তুত প্রণালী ও সংরক্ষণব্যবস্থা কতটা নিরাপদ, তা অনেক ক্ষেত্রেই অজানা। দূষিত পানি, জীবাণুযুক্ত খাবার ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে ডায়রিয়া, আমাশয়, কলেরা ও টাইফয়েডের মতো রোগ ছড়াতে পারে। আবার অতিরিক্ত তেল, লবণ ও চিনিযুক্ত খাবার নিয়মিত গ্রহণে স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে।’
খাদ্যে ভেজাল রোধ করতে দেশের প্রধান খাদ্য নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউটকে (বিএসটিআই) আরো সতর্ক ও সক্রিয় হতে হবে। ভেজাল খাদ্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে দরকার কার্যকর ভূমিকা। ভেজালবিরোধী অভিযান চালানো হলে কিছুদিন ভেজালমুক্ত খাদ্যদ্রব্য পাওয়া যায়, কিন্তু পরে যেই–সেই হয়ে যায়। এর থেকে পরিত্রাণে আমাদের সমাজিকভাবেও নীতি–নৈতিকতা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ব্যবসায়ীদের সৎ পন্থা অবলম্বন করতে হবে। নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে সততা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার আলোকে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। ভেজাল প্রতিরোধে প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের নৈতিকতাবোধ, উৎপাদক, বিপণনকারী, ভোক্তা সবাইকেই সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রকে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপদ খাদ্য পাওয়ার জন্য খাবার সংরক্ষণ করা বা নিরাপদে রাখাও অত্যন্ত জরুরি।







