কোথায় ‘নতুন দিন’?

সালমা বিনতে শফিক | শনিবার , ১৯ নভেম্বর, ২০২২ at ৮:১৬ পূর্বাহ্ণ

দু’হাজার সালে একুশের বইমেলায় ‘কোথাও নতুন দিন’ নামে একটি ছোট্ট গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এটি একটি প্রবন্ধ সংকলন। ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৮ দু’বছর ধরে টানা লিখে যাওয়া পঁয়তাল্লিশটি প্রবন্ধকে এক মলাটে সাজিয়ে আত্মপ্রকাশ করে বইটি। প্রবন্ধসমূহের রচয়িতা কথাসাহিত্যিক ফেরদৌস আরা আলীম। সংবেদনশীল পাঠককে গভীরভাবে আলোড়িত ও আলোকিত করে তাঁর রচনা। প্রচণ্ড আশাবাদী একজন লেখক তিনি। পড়ন্ত বেলায়ও জ্বালিয়ে রেখেছেন আশার বাতিটি। পথিকৃৎ নারীবাদী খায়রুন্নেসা খাতুন, বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, গৌরী আইয়ুব, নবনীতা দেবসেন, অরুন্ধতী রায়দের দিন বদলের গল্প শুনিয়েছেন লেখক তাঁর স্বভাবজাত ভাষাশক্তির জাদু দিয়ে। পুণ্য স্মরণ করেছেন নবীজায়া বিবি খাদিজার ব্যক্তিত্বের শক্তি ও মাধুর্যের প্রতি নতুন আলো ফেলে। বীরকন্যা প্রীতিলতা ও তারামন বিবির প্রতি অর্পণ করেছেন ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার অর্ঘ। তবে ক্রমেই একটা ধূসর ছায়া ঘনিয়ে আসছে লেখকের জ্বালিয়ে রাখা সেই আলোর গায়ে। কোথায় যেন একটা অদ্ভুত শূন্যতা। হাহাকারের মাতম চলে দিকে দিকে। প্রদীপের তলার মতো আমাদের সমাজেও অর্জনের শত আলোর নিচে ঘাপটি মেরে আছে নিকষ অন্ধকার।
তিন দশকের বেশী সময় ধরে টানা রাষ্ট্র পরিচালনায় অধিষ্ঠিত নারী। নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে আমাদের মতো গর্বিত জাতি সম্ভবত পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই। অথচ নারীর নিরাপত্তা নেই কোথাও। না সড়কে, কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষা ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে, না গৃহে। নারী সর্বত্রই অরক্ষিত। ষাট বছরের পৌঢ়া যেমন পাশবিক আক্রমণের ভয় তাড়িয়ে নির্বিঘ্নে পথ চলতে ভয় পায়, তেমনি ছ’ মাসের শিশুকন্যাটিকে নিয়েও ভয়ংকর আতঙ্কে থাকতে হয় একজন মা-কে। সিকি শতাব্দী আগে ‘ কোথাও নতুন দিন’ এ লেখক দিনাজপুরের ইয়াসমিন ও চট্টগ্রামের সীমার কথা লিখেছেন। দেশ কাঁপিয়ে দেওয়া অসংখ্য ঘটনা বিবৃত করেন তিনি পরিসংখ্যান ও সকল ঘটনাপ্রবাহের চুলচেরা বিশ্লেষণনের মাধ্যমে। ‘প্লাবনের মতো, মহামারীর মতো ধেয়ে আসা’ এই মানবিক বিকৃতির হাত থেকে আমাদের মেয়েদের রক্ষার জন্য বর্ষবরণের নিবন্ধতেও নারী ও শিশুর সুরক্ষায় ‘আরেকটি মরণজয়ী যুদ্ধে’র ডাক দেন তিনি। প্রতিটি রচনার শেষেই শোনান আশার বাণী।
দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছে দুই যুগেরও বেশী সময়। অর্জনের খাতায় প্রকৃত প্রাপ্তির সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। অনেক দাম দিয়ে কেনা প্রাণের বাংলাদেশও অর্ধশতক পথ পাড়ি দিয়ে এগিয়ে চলেছে উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালায় কেবলই অর্জনের তথ্যচিত্র। ভোজবাজির মতো দৃশ্যমান উন্নয়ন ও বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবনযাত্রার মানের অবিশ্বাস্য পরিবর্তনে বুঁদ হয়ে আছে নাগরিক সমাজ। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় হাতের মুঠোয় পৃথিবী। কিন্তু সেই ‘নতুন দিন’ তো আজও এলোনা। বরং দিনকে দিন আমরা তলিয়ে যাচ্ছি অতল অন্ধকারে। নারী ও শিশুর ওপর ঘটে যাওয়া পৈশাচিক আচরণের খবরে এখন আর দেশ কেঁপে ওঠেনা, জাতিও হয়না স্তম্ভিত। সংবেদনশীল মানুষেরা সব অনুভুতিশূন্য হয়ে পড়েছে। শিশু বর্ষার মৃত্যুতে তাই নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেনি আমাদের সমাজে। ইয়াসমিন, সীমা, তনুদের মতো বর্ষাও বুঝি মরেই বেঁচেছে।
চট্টগ্রামের কুসুমকুমারী বালিকা বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী ছিল মারজানা হক বর্ষা। সেই সোমবারে কালিপুজোর ছুটি ছিল বলে স্কুলে যায়নি। সকাল থেকে থম মেরেছিল আকাশ। খবরে বলছে- সিত্রাং আসছে। বদ্ধ ঘরে সময় কাটে না বর্ষার। মায়ের কাছে বায়না ধরে চিপসের জন্য। মেয়ের পীড়াপীড়িতে বিশটি টাকা হাতে দেয় মা। পড়ন্ত দুপুরে গলির মোড়ের দোকান হতে চিপস আর বিস্কুট কিনে খুশি মনে বাড়ির পথ ধরে বর্ষা। কিন্তু বাড়িতে আর ফেরা হয় না তার। তিন দিন পর বৃহস্পতিবার চিনির বস্তায় মোড়ানো ছোট্ট নিথর দেহটা পাওয়া যায় আবর্জনা ভরা নর্দমায়।
সিত্রাং উপকূলীয় জনপদ তছনছ করে দিলেও নগর জীবনে তেমন কোনও চিহ্ন রেখে যায়নি। নগরবাসী তাই মেতে আছে উৎসবের আনন্দে। মহাসমাবেশ চলছে দেশজুড়ে। রাজনীতির মাঠে উত্তাপ, খেলার নেশায় মত্ত দেশদরদী নেতা কর্মীর দল। বক্তৃতা, বিবৃতি, পাল্টা বিবৃতি দেশটাকে একটা বিতর্ক মঞ্চে পরিণত করেছে। শিল্পবোদ্ধা সুশীল নাগরিকদের সংস্কৃতি চর্চায়ও কোনও ব্যত্যয় ঘটেনি। বন্দর নগরী চট্টগ্রামের হেলদি ওয়ার্ড হিসেবে খ্যাত জামালখানের এক আনহেলদি গলির বাসিন্দা ঝর্না বেগমের পিতৃহারা কন্যা বর্ষার হারিয়ে যাওয়া আর তিনদিন পর নালার ভেতর বস্তাবন্দী মৃতদেহ পাওয়ার খবর আমাদের নাগরিক জীবনে কোন দাগই কাটতে পারেনি। তবে অপরাধী সনাক্ত হয়েছে দ্রুততম সময়ে, যার জন্য ধন্যবাদের দাবীদার আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বিচার প্রক্রিয়া কীভাবে চলে তাই এখন দেখার বিষয়। দেশ ও সমাজে দীর্ঘকাল ধরে চলমান রীতির মতো এখানেও অপরাধীকে বাঁচানোর প্রচেষ্টা নেওয়া হবে না, এই আশ্বাসটুকু বর্ষার মা ও সমাজের তাবৎ মাকে কেউ দেবে কি ?
একটি পরিবারে ছেলেমেয়েদের বড় করা হয় পরম মমতায়। বিকৃতির জোয়ারে মেয়েশিশু ও নারীদের শারীরিক নিরাপত্তা নিয়ে সর্বক্ষণ আতঙ্কে থাকে বাবা মা। মেয়েকে ক্রমাগত সাবধান করা হয়- বাইরে ওঁত পেতে আছে হায়েনা শকুন। কিন্তু ছেলেকে কখনও বলা হয়না হে পুত্র! মানুষ হও, হায়েনা শকুন হয়োনা। উপরন্তু পুত্রটি অন্য কোন নারী বা শিশুর ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়লেও পুত্রের সুরক্ষায় আইনের দ্বারস্থ হয়, অকাতরে অর্থ ঢালে। অভিযুক্ত ধর্ষককে বাঁচানোর জন্য বেতনভোগী আইনজীবী যেমন নিয়োজিত থাকেন, তেমনি ধর্ষকের মা, বোন, এমনকি স্ত্রীও তার পাশে দাঁড়িয়ে যায় অবলীলায়। কী আশ্চর্য ! আমাদের সমাজে একজন অপরাধীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যত আয়োজন থাকে, একজন ভুক্তভোগীকে আইনি সহায়তা দিতে তার কানাকড়িও থাকে না। নৈতিকতার খরার সঙ্গে যোগ হয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। তার সঙ্গে আছে অপশক্তির পরাক্রমশীলতা আর রাজনীতির দুর্বৃত্তপরায়নতা।
জামালখানের বর্ষার কথা খবরের কাগজে যেদিন ছাপা হয়, একই দিনে মাদারীপুর, খুলনা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, ফেনী, সুবর্ণচর থেকেও কিশোরী নিহত হওয়ার খবর আসে। খবরের বাইরেও থাকে অনেক খবর। সমগ্র দেশটাই আজ ধর্ষকের অভয়াশ্রম। কত আইন তৈরি হল এযাবৎ কালে! একই সঙ্গে আবিষ্কৃত হল আইনের ফাঁকফোকর। পঁচিশ বছর আগে ‘কোথাও নতুন দিন’ এর লেখকের সাহসী উচ্চারণ- ‘আইন আছে অথচ শাস্তি হবে না সেক্ষেত্রে অপরাধ বাড়তে বাধ্য। আর সে-আইন যদি ত্রুটিপূর্ণ হয় তাহলেতো অপরাধীর পোয়াবারো’। ‘বিচার প্রক্রিয়ার স্তরে স্তরে ফসিল হয়ে যায় কত চার্জশীট !’- এও যেন আজকেরই কথা। পঁচিশ বছর পর আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা কি ভেবে দেখব- মানবিক যাত্রার পথে ঠিক কতটুকু এগিয়েছি আমরা ?
আমাদের জনপ্রতিনিধিগণ প্রায়শই আস্ফালন করেন; উন্নয়ন আর মানবাধিকারের পাল্লায় উন্নত বিশ্বকে ছাড়িয়ে গিয়েছে দেশ। জনগণের সুখ, শান্তি, নিরাপত্তার জন্য দিবানিশি দেশসেবায় নিয়োজিত প্রতিনিধিগণ অকৃতজ্ঞ জনতাকে কথায় কথায় ভাত কাপড়ের খোঁটাও দিয়ে ফেলেন। বর্ষার মতো শত সহস্র কন্যাশিশু, কিশোরী ও নারীর মৃত্যুর দায় কী তাঁরা আজও নেবেন না?
একটি ফুলকে বাঁচাবে বলে যুদ্ধ করেছিল যারা, তাদেরই উত্তরসূরিরা আজ ফুলদেরকে একের পর এক হত্যা করে চলেছে। এই বিকৃত নৃশংসতার শেষ কোথায়? কোথায় ‘নতুন দিন’? আর কতদূর ?