কঠোর হাতে অতিলোভী অসাধু ব্যবসায়ীদের দমন করতে হবে

| সোমবার , ২১ নভেম্বর, ২০২২ at ৬:২৩ পূর্বাহ্ণ

সাম্প্রতিক সময়ে জনসাধারণের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। একদিকে যেমন রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কমছে, অপরদিকে বাড়ছে বিদেশি দেনার দায়। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, আগামী বছরের শেষ নাগাদ বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১১৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। আর এর পরের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে বিদেশি ঋণের পরিমাণ হবে ১৩০ বিলিয়ন ডলার। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে সুদসহ দেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু চলতি বছর শেষে দ্বিগুণেরও বেশি ঋণ পরিশোধ করতে হবে। ২০২২ সালের শেষ নাগাদ এ ঋণ পরিশোধের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে। মেগা প্রকল্পগুলোর গ্রেস পিরিয়ড পার হয়ে গেলে এর পরিমাণ বছরওয়ারি বাড়তে থাকবে। তাই শঙ্কিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

বৈদেশিক রেমিট্যান্সও পুঁজি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৯১ সাল থেকে দারিদ্র্য ৫৮.৮ শতাংশ থেকে অর্ধেক কমে ২০১৬ সালে ২৪.৩ শতাংশে নেমে আসে, সেইসঙ্গে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও প্রভূত উন্নয়ন হয়, যার ফলে সাক্ষরতা ও শিশু মৃত্যুর হারেও অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জিত হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের ২৫০০ ডলার মাথাপিচু আয় ভারত ও পাকিস্তানের চেয়েও বেশি।

জাতিসংঘ বাংলাদেশকে ২০২৬ সালের মধ্যে অনুন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে। অর্থমন্ত্রী মোস্তফা কামাল বলেন, অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে বাংলাদেশ কোথাও ছিলো না, এমনকি মানচিত্রেও না। কিন্তু অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে, আমাদের কঠোর প্রচেষ্টার মাধ্যমে। ১৯৮০ দশকের পর থেকে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প দেশের রফতানি খাতে ৪ শতাংশ থেকে বর্তমানে ৮০ শতাংশ অবদান রাখছে, যা দেশের পোশাক শিল্প সমিতির মতে ৫০ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু প্রবাসী আয়ের পরিস্থিতি নেতিবাচক ও নিরাশাজনক। অর্থনীতিবিদরা বলেন, আমরা মনে করেছিলাম কোভিড-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে আমাদের শ্রমিকের জোগান বাড়বে এবং তাদের পাঠানো আয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়বে। প্রকৃত সত্য হলো, বিদেশগামী অভিবাসী শ্রমিকের সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণ বেড়েছে এবং গত সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ তা ৮ লাখ ৭৪ হাজারে দাঁড়িয়েছে; কিন্তু প্রবাসী আয় বাড়েনি, বরং কমেছে। বাস্তবতার এমন বৈপরীত্য আমাদের ভাবিয়ে তুলেছে।

এখন নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির, ক্রমশই লাগামহীন হয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকরা বলেন, করোনার ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই পরিস্থিতি কেমন নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সবজির দাম বাড়লেও কৃষক যে লাভবান হবে তা কিন্তু হচ্ছে না। কৃষক যেসব পণ্যের দাম ৫ টাকা পাচ্ছে সেসব পণ্য নগরের বাজারে আসতে আসতে তিনগুণ দাম বাড়ছে। অর্থাৎ একটি সিন্ডিকেট এ দাম বাড়াতে মূল ভূমিকা পালন করছে। দেশে দ্রব্যমূল্য বাড়ার এই অস্বাভাবিক অবস্থায় দিশাহারা মানুষ। তারপরও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েই চলেছে। সবকিছুর দাম বাড়লেও বাড়ছে না কেবল মানুষের আয়। এ অবস্থায় শহুরে জীবনে টিকে থাকা দায় হয়েছে। এই অবস্থায় ভালো নেই মধ্য আয়ের কর্মজীবী মানুষ। এরাই এখন সবচে দুঃসময়ে। মানুষের দুঃসময়ে শুধু খাদ্যদ্রব্য নয়, জীবন-যাপনে প্রয়োজনীয় সবকিছুর দামই হু হু করে বাড়ছে। এতে নাভিশ্বাস উঠেছে মধ্য আয়ের মানুষেরও। মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আয় করা ব্যক্তিরাও এখন সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। বাসা ভাড়া, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ, অফিসে যাতায়াতসহ সংসারের যাবতীয় খরচের সঙ্গে যোগ হয়েছে নিত্যপণ্যের লাগামহীন বাড়তি মূল্য।

বলা বাহুল্য যে, স্বাধীন দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের বলগাছাড়া অবস্থা দরিদ্র ব্যক্তিদের পক্ষে বজ্রাঘাততুল্য। বিভিন্ন শ্রেণীর ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি করছেন। তাই সরকারকে কঠোর হাতে অতিলোভী অসাধু এসব ব্যবসায়ীকে দমন করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যতালিকা টাঙানো এবং নির্ধারিত মূল্যে পণ্য বিক্রয় করা হচ্ছে কি না, সেটি পর্যবেক্ষণের জন্য সব বাজারে দ্রব্যমূল্য মনিটরিং কমিটি গঠনের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার ও ব্যবসায়ীদের সদিচ্ছাই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ করে দেশের সাধারণ মানুষের আরও একটু সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা প্রদানে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে সক্ষম।