ওদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

পতেঙ্গার অর্গানিক সবজি ভাণ্ডার

আজাদী প্রতিবেদন | বুধবার , ৭ ডিসেম্বর, ২০২২ at ১০:১৪ পূর্বাহ্ণ

বিলম্বিত শীতে কিছুটা বিঘ্ন ঘটলেও পতেঙ্গার অর্গানিক সবজি ভাণ্ডারে জমিতে শীতকালীন সবজি হাসতে করেছে। গাছে গাছে থোকায় থোকায় টমেটো, মাঠ জুড়ে ফুলকপি, লাউ এবং কুমড়ো ফুলে বর্ণিল হয়ে উঠেছে। চড়া দরে বিক্রি হচ্ছে অর্গানিক পাকা টমেটো। নানা প্রতিকূলতার লড়াই করে পতেঙ্গা অঞ্চলের চাষীদের এবার ফলন ফলাতে হয়েছে। তিনবারও লাগাতে হয়েছে টমেটোর চারা। তবে শেষ পর্যন্ত ভালোয় ভালোয় ফলন উঠতে শুরু করায় কৃষকদের সব কষ্ট উবে গেছে।

সরজমিনে পরিদর্শন এবং স্থানীয় কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, পতেঙ্গার বিস্তৃত এলাকা অর্গানিক সবজি ভান্ডার হিসেবে খ্যাত। এলাকার বেড়িবাঁধের ভিতরের দিকে কয়েকশ’ একর জায়গায় প্রতিবছর শীতকালে প্রচুর সবজির চাষাবাদ চলে। বিশেষ করে পতেঙ্গার আনন্দবাজারের পশ্চিম পাশে এবং ধুমপাড়া এলাকায় সাগরপাড়ে শত শত একর জমিতে টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, কুমড়োর মতো শীতকালীন সবজির চাষাবাদ করা হয়। বিষমুক্ত ফলন ফলিয়ে পতেঙ্গা এলাকার চাষীরা গত কয়েক বছর ধরে সবজি বিপ্লব ঘটিয়েছেন। আগাম ফলনের কারণে বেশ চড়া দামে বিক্রি হয় পতেঙ্গার সবজি। প্রতিবছর এখান থেকে কোটি কোটি টাকার সবজি উৎপাদিত হয়।

পতেঙ্গা উপকূলীয় এলাকার একাধিক কৃষক জানিয়েছেন, তাদের বিশেষত্ব হচ্ছে বিষমুক্ত এবং অর্গানিক পদ্ধতিতে আগাম টমেটো চাষ। উর্বর মাটির কারণে এখানে জমিতে কোনো সার ব্যবহার করতে হয় না। পোকামাকড় দমনেও কোনো বিষ ব্যবহার করা হয়না। জৈব সার এবং প্রাকৃতিকভাবেই জমির উর্বরতার পাশাপাশি পোকামাকড় দমনের কাজ করেন কৃষকেরা। আগাম চাষের ফলে মৌসুম শুরুর বেশ আগেই পতেঙ্গার টমেটো বাজারে আসতে শুরু করে। শত শত টন টমেটো উৎপাদিত হয় এই অঞ্চল থেকে। চড়া দামে টাটকা টমেটো বিক্রি করে কৃষকদের চোখে মুখে হাসি ফুটে উঠে। ক্ষেতের পাড়ে একশ’ টাকারও বেশি দামে প্রতিকেজি টমেটো পাইকারিতে বিক্রি হয় পতেঙ্গা অঞ্চলে। গতকাল মঙ্গলবার সরজমিনে পরিদর্শনকালে পতেঙ্গা এলাকায় ৬০ টাকা দরে পাইকারীতে টমেটো বিক্রি করতে দেখা গেছে। এসব টমেটো বাজারে এসে আশি থেকে একশ’ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়।

স্থানীয় কৃষকেরা জানিয়েছেন, অন্যান্য বছরের মতো এবারও কয়েকশ’ একর জমিতে টমেটো লাগানো হয়েছে। এক একজন কৃষক লাখ লাখ টমেটোর চারা লাগিয়েছেন। শুরুতে নিদারুণ ধাক্কা খান কৃষকেরা। অকাল বর্ষণ, তীব্র গরম, বিলম্বিত শীতসহ প্রাকৃতিক প্রতিকূলতায় চারা টিকিয়ে রাখা এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠে। লাখ লাখ টমেটো চারা নষ্ট হয়ে যায়। শীতের আবহ না থাকায় গাছের বৃদ্ধি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। পরবর্তীতে অকাল বর্ষণেও কৃষকেরা বেশ বেকায়দায় পড়েন। রাতে দিনে পানি সেচ দিয়ে চারা রক্ষা করার চেষ্টা করা হয়েছে। কোনো কৃষক দুই বার আবার কোনো কোনো কৃষককে তিনবারও টমেটো চারা লাগাতে হয়।

নানা কসরত করে চারা বাঁচিয়ে ফলনের আগ দিয়ে নতুন সংকট তৈরি করে সার। ভেজাল টিএসপি সার দিয়ে কৃষকদের মাথায় হাত পড়ে। বাজার থেকে কেনা টিএসপি সারে ভেজাল দেয়ায় তা ফসল উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

স্থানীয় কৃষক আলহাজ্ব মোহাম্মদ মহসীন মিয়া গতকাল দৈনিক আজাদীকে জানান, বেশ প্রতিকূলতা মোকাবেলা করে চাষ করেছি। টমেটো বিক্রি শুরু করেছি। শুরুতে একশ’ টাকা কেজি দরে বিক্রি করলেও আজ ৬০ টাকা দরে বিক্রি করার কথা জানান তিনি।

একটি চারা ঠিকঠাকভাবে টিকিয়ে রাখার জন্য কঞ্চি বাঁধা থেকে শুরু করে সার এবং সেচ দেয়াসহ নানা খাতে ৫০ টাকারও বেশি খরচ হয়। একটি গাছ থেকে ৫/৭ কেজির বেশি টমেটো পাওয়া যায়। কিন্তু এবার ফলন ঠিক ওভাবে পাওয়া যাবে বলে মনে হচ্ছে না বলে মন্তব্য করে সবজি চাষে সফল কৃষক আলহাজ্ব মোহাম্মদ মহসীন জানান, ফলন এখন পর্যন্ত মোটামুটি ভালো আছে। সামনের দিনগুলোতে প্রকৃতি ঠিকঠাক আচরণ করলে আমাদের ক্ষতি পুষিয়ে যাবে।

মইনুল হাসান নামের অপর একজন খামারী জানান, দুই লাখ টমেটো, বিশ হাজার ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ এবং কুমড়ো মিলে প্রচুর চাষ করেছেন তিনি। এখন পর্যন্ত সবকিছু ভালোভাবে চলছে। ক্ষেত থেকে নিয়মিত টমেটো তোলা হচ্ছে। আজও (গতকাল) দেড় টনের মতো টমেটো তোলা হয়েছে বলে জানান তিনি। মইনুল হাসান জানান, এখন ৬০ টাকা করে পাইকারীতে প্রতি কেজি টমেটো বিক্রি হচ্ছে। সামনে দাম আরো কমবে। তবে ফলন বাড়লে দাম কমলেও ক্ষতি হবে না। ক্ষেতের অবস্থা এখন পর্যন্ত ভালো বলেও তিনি উল্লেখ করেন।