মহাভারতে দুজন শিক্ষাগুরুর কথা বলা আছে। ভালোমন্দ মিলিয়ে দ্রোণাচার্যের চেয়ে কৃপাচার্যের প্রতি আমার পক্ষপাতিত্ব আছে। জীবনে বহু শিক্ষাগুরুর সান্নিধ্য পেয়েছি। এর মধ্যে নক্ষত্রের মতো প্রদীপ্ত মানুষটির নাম হেডস্যার আহমেদ ছাবের। এসব নমস্য শিক্ষকের বৃত্তান্ত প্রকাশিত হয় না বলেই আজ প্রণম্য শিক্ষকের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। আপাদমস্তক মুক্তমনা মানুষ আবু তালেব চৌধুরী, মাস্টার আমিনুর রহমান, প্রভাত চন্দ্র পালিত, আমার বাবা তেজেন্দ্র লাল দে, মনোরঞ্জন দেব, জনক খাতুন চৌধুরানী, বাদশা আলম, আবদুল মালেক চৌধুরী, আবুল বশর মাস্টার, কাজী সিরাজুল ইসলাম, মাস্টার কবির আহাম্মদ, বকসু মিয়া, ছৈয়দুল হক সহ আরো কয়েকজন শিক্ষানুরাগী মিলে একটি জুনিয়র হাই স্কুল প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিলেন। বলে রাখা ভালো, উত্তর ফটিকছড়ি ছিল এক কথায় পশ্চাৎপদ, দারিদ্র ও অবকাঠামোহীন এক জনপদ। শিক্ষার হার শতকরা ২/৩ ভাগের বেশি ছিল না। প্রশ্ন হলো, প্রধান শিক্ষক কোথায় পাওয়া যাবে। শহর বা দূরান্ত থেকে কোন গ্র্যাজুয়েট একদিনের অতিক্রম্য ও দূরত্বের অরণ্যে দায়িত্ব নেয়ার প্রশ্নই ছিল না। এগিয়ে এলেন পাতলা ফর্সা রংয়ের মিষ্ট হাসির মিষ্টভাষী সদ্য উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করা এক যুবক। নাম তাঁর আহমেদ ছাবের। মাত্র ৯০ টাকায় দায়িত্ব নিয়ে বলেছিলেন, দেখি পূর্ব–বাংলার অন্ধকারাছন্ন এই জায়গায় আলো ফুটানো যায় কি না! আমাদের এলাকাটি এতোই গরীব ছিল যে, শিক্ষার্থীদের যৎ সামান্য বেতন দেওয়ার সামর্থ্যও ছিল না, কি আর করা। আমন ধান উঠার পর হেডস্যার আমাদের ‘লাই’ নিয়ে পাঠিয়ে দিতেন বাড়ি বাড়ি। সেই ধান বিক্রি করে শিক্ষকদের গোটা বৎসরের বকেয়া বেতন শোধ করতেন। দেখা যেত সবাইকে দেয়ার পর তাঁর জন্য অবশিষ্ট থাকত না। তিনি বলতেন, না হলেও আমার চলে যাবে। আসলে হেডস্যারের পারিবারিক সামর্থ্য মোটামুটি মধ্যবিত্ত পর্যায়ের ছিল। সাথে নারায়নহাট বাজারে একটি ফার্মেসী খুলেছিলেন। যোগ হয়েছিল কর্মজীবী ভাবী নুরজাহান বেগম এর বেতনের টাকা।
নতুন প্রজন্মের জানার জন্য বলি, বাগান বাজার হাই স্কুল, গজারিয়া হাই স্কুল, চিকনছড়া হাই স্কুল, রসুলপুর হাই স্কুল, হেঁয়াখো বনানী উচ্চ বিদ্যালয়, বালুছড়া হাই স্কুল, হাসনাবাদ হাই স্কুল, শান্তিরহাট হাই স্কুল তখনো অবধি কোনটারই জন্ম হয়নি। এমনকি নারায়নহাট বাজার স্কুল (কলেজিয়েট) খ্যাত প্রতিষ্ঠানটি আত্মপ্রকাশ করলেও মামলার জটিলতায় মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতে হতো দাঁতমারা উচ্চ বিদ্যালয়ের নামে। কথাটা দাঁড়ালো নারায়নহাট থেকে বাগান বাজার পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে হাজার হাজার ছাত্র এই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করেছি। সে সময়কার প্রায় বিনে পয়সায় শিক্ষা দেয়া শিক্ষকদের মধ্যে বাবু সুখেন্দ্র বিকাশ দে পরবর্তীতে শান্তিরহাট হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অবসর জীবনে অর্থাৎ বর্তমানেও নারায়নহাট বালিকা বিদ্যালয়কে টিকিয়ে রাখতে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রয়াত মোস্তফা স্যার অবসরের পূর্বে ফৌজদারহাট হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। প্রয়াত রাখাল চন্দ্র দে পরবর্তীতে জুবিলী হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন।
একটা স্মৃতির কথা বলি, সম্ভবত ৮ মার্চ ১৯৭১, হেডস্যার স্কুলে আসলেন। আমাদের সবাইকে বললেন, যাও মিছিল নিয়ে বাজার প্রদক্ষিণ করো, আজ থেকে প্রতিদিন স্কুলে আসবা, প্রতিদিন মিছিল করবা, তবে ক্লাস হবে না। একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, স্যার আপনি মুক্তিযুদ্ধে গেলেন না কেন? তাঁর সোজা উত্তর ছিল, আমি চলে গেলে এই স্কুলটা রাজাকার আর পাকিস্তানীরা জ্বালিয়ে ছাড়খার করে দিতো। এপ্রিলের প্রথম থেকেই হাজার হাজার শরণার্থী এই পথ দিয়েই রামগড় সীমান্ত অতিক্রম করেছে। দিনভর খিচুড়ির ব্যবস্থা ও স্কুলে রাত্রিযাপনের সেই ভয়াবহ দৃশ্য অন্তত আমরা মৃত্যু অবধি ভুলবো না।
১৯৯৪ সালের সম্ভবত মার্চ মাসের এক দুপুর বেলা, দোতলার পুরনো হল রুমে স্যার এসে হাজির, দেখেই পায়ে ধরে প্রণাম করলাম। শ্রদ্ধা জানানোর ধরনে স্যারের কোন প্রতিক্রিয়া ছিল না। বন্ধুরা পাশে এসে বললো, স্যার শংকর বাবু আপনাকে যেভাবে সম্মান জানালেন তাতে আমরা মুগ্ধ। অবশ্যই আমাদের প্রজন্মের প্রায় সবাই শিক্ষক দেখলেই রাস্তার একপাশে চলে যেতাম।
স্যার শুধু বললেন, জীবনে অর্থের প্রতি কোনো মোহ কখনোই ছিল না। আসলে যা চেয়েছিলাম তা কড়া গণ্ডায় পেয়েছি। সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। দেখ, আমাদের অনেক বন্ধু উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার হয়েছে। আমি যেখানে জন্মেছিলাম, সেখানেই কাটিয়ে দিলাম। স্যার এসেছিলেন মূলত স্কুলের নাম পরিবর্তন করতে, হলফনামায় দস্তখত করলাম। সেদিন থেকে হল দাঁতমারা এবিজেড উচ্চ বিদ্যালয়। কৃপাচার্যের কথায় আসি, দ্রোণাচার্যের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ হলো, গুরুদক্ষিণা হিসেবে একলব্যের বৃদ্ধাঙ্গুলী নিয়েছিলেন। পেছনের কারণ ছিল, অর্জুনের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো বীরের যেন আবির্ভাব না ঘটে। গুরুর এমন হীনম্মন্যতা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেও দেখেছি। প্রত্যেক বিভাগে বেশির ভাগ ফাস্টূ ক্লাস ক্লাসের পেছনে থাকে কোনো না কোনো শিক্ষকের পছন্দ বা বাৎসল্য বা আত্মীয়তার সম্পর্ক। কৃপাচার্যের শিক্ষকতার জীবন চক্রে তেমন কোনো স্বজনপ্রীতি বা নিষ্ঠুরতার তথ্য মহাভারতে নেই। হেডস্যারের কাছে প্রত্যেকটা ছেলেমেয়ে ছিল তাঁর নিজের ছেলেমেয়ে তুল্য। এজন্যই তিনি এ যুগের কৃপাচার্য।
কৃপাচার্য কুরুবংশের কুলগুরু ছিলেন। এর বাইরে তাঁর আশ্রমে আরো বহু ছাত্রের আগমন ছিল। প্রজন্মকে বলে যাই, আমাদের কৈশোরে উত্তর ফটিকছড়িতে খুব বেশি অপরাধ ঘটতো না। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আজো আমাদের আনন্দ দেয়। আজ সে সম্প্রীতি অনেকটাই হারিয়ে গেছে। বোস্টনে সেলিমের বাসায় আতিথেয়তা দেখে রুনু বলেছিল, তোমাদের এলাকায় এতো চমৎকার সম্প্রীতি। বললাম, ছিল এখন আর অত নেই। পুরো উত্তর ফটিকছড়িকে সম্প্রদায় নির্বিশেষে একটি বংশ ধরলে আমাদের কুলগুরু হলেন, হেডস্যার আহমেদ ছাবের।
৩১ জানুয়ারি প্রাতঃভ্রমণ শেষে বাসায় এসেই ফেসবুকে দেখলাম, স্যার আর নেই। ত্বরিত ছুটে গেলাম, এ্যাম্বুলেন্সে অনন্তের পথে স্যারের কপালে হাত দিয়ে ভাবলাম, একটা মানবজীবন সফল হবার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন টাকার দরকার নেই। বিভিন্ন লেখায় বহুবার বলেছি, এই যুগের শিক্ষকরা সহকর্মীকে একটি গোলাপ দিয়ে বিদায় জানায় না। এই যুগের ছাত্ররা শিক্ষককে একটি লাঠি আর ছাতা দিয়ে বিদায় জানাতে কার্পণ্য করে। বর্ণাঢ্য এক জমায়েতের মধ্য দিয়ে স্যারকে বিদায় জানিয়েছিলাম। পরপারে নিশ্চিত পরম শান্তিতে হয়তো বলছেন আমার মানব জন্ম বৃথা যায়নি।
লেখক : আইনজীবী, আপীল বিভাগ, কলামিস্ট।