এক হাতে কোরবান উপলক্ষে কেনা গরুর রশি। অন্য হাতে গরুর জন্য কেনা ফুলের মালা। চোখে-মুখে উচ্ছ্বাস নিয়ে বাসার পথে হেঁটে যাচ্ছেন সাইদা তামান্না। পাশে অবশ্য তার বাবাও আছেন। গতকাল রোববার ঈদগাঁ কাঁচা রাস্তায় দেখা যায় এ দৃশ্য। জানতে চাইলে উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী তামান্না জানান, গত পাঁচ বছর ধরে বাবার সাথে পশুর হাটে আসেন। গরু কিনে হেঁটেই বাড়ি ফেরেন। এবারও তার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এবার গরু কিনেছেন সাগরিকা বাজার থেকে। প্রতিবার অবশ্য বড় গরু কিনলেও এবার দাম বেশি থাকায় ছোট সাইজের কিনতে হয়েছে। তা নিয়ে অবশ্য মন খারাপ হয়নি। বরং প্রতিবারের ন্যায় এবারও কোরবানি গরু নিয়ে বাসায় ফিরতে পারায় সন্তুষ্ট বলে জানান তিনি।
তামান্নার মতো আরো বহু কোরবানিদাতার অভিযোগ, এবার গরুর দাম বেশি। নগরের কোরবানি পশুর হাটগুলো ঘুরে বিক্রেতাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলছেন, খরচ পুষিয়ে অল্প লাভেই বিক্রি করে দিচ্ছেন। নগরে এবার সিটি কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনায় অনুমোদিত পশুর হাট বসেছে ছয়টি। গত ১২ জুলাই থেকে হাটগুলোতে বিক্রি শুরু হয়েছে। চলবে ২১ জুলাই পর্যন্ত। হাটগুলো হচ্ছে সাগরিকা পশুর বাজার, বিবিরহাট গরুর হাট, কর্ণফুলী গরু বাজার (নুর নগর হাউজিং এস্টেট), সল্টগোলা রেলক্রসিং সংলগ্ন বাজার এবং ৪১নং ওয়ার্ড বাটারফ্লাই পার্কের দক্ষিণে টি কে গ্রুপের খালি মাঠ ও পোস্তারপাড় ছাগলের বাজার।
বাজারগুলো ঘুরে দেখা গছে, স্থানীয়ভাবে হৃষ্টপুষ্ট করা প্রচুর গরু নিয়ে এসেছেন বেপারিরা। এছাড়া কুষ্টিয়া, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুমিল্লা, নাটোরসহ অন্যান্য এলাকা থেকে গরু এনেছেন তারা। গতকাল বিকেলে কর্ণফুলী গরু বাজারে দেখা গেছে, ইজারাদারের পক্ষে স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য মাইকিং করা হচ্ছিল। একইসঙ্গে মাস্ক ছাড়া কাউকে প্রবেশ না করতে অনুরোধ করা হয়। যদিও বাস্তবে স্বাস্থ্যবিধি ছিল উপেক্ষিত। মাস্ক ছিল না ক্রেতা-বিক্রেতার মুখে।
শহীদ নামে এক ক্রেতা বলেন, ছোট সাইজের গরুর দাম দ্বিগুণ। বাজারটিতে নূর জাহান এগ্রোর একটি গরুর দাম চাওয়া হয় সাত লাখ টাকা। বিক্রেতা জানান, ক্রেতারা চার লাখ টাকা পর্যন্ত বলেছেন।
বাজারে উপস্থিত সাংবাদিকদের চান্দগাঁও থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নিরাপত্তা জোরদারে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। বিক্রেতারা যদি পশু বিক্রির টাকা ব্যাংকে জমা করতে আমাদের সহযোগিতা চায় আমরা দিতে প্রস্তুত।
কর্ণফুলী বাজারের সভাপতি আবদুর রহিম বলেন, বাজারে প্রায় ১০ হাজার গরু আছে। আরো দুই-চার হাজার আসবে। গরুর কোনো সংকট হবে না।
বাজারটিতে নওগাঁ থেকে ২২টি ছাগল নিয়ে আসা এক বিক্রেতা বলেন, একটিও বিক্রি হয়নি। কাঙ্ক্ষিত দামের চেয়ে ক্রেতারা অর্ধেক চাওয়ায় বিক্রি করছেন না বলে জানান তিনি। রফিক নামে এক বিক্রেতা বলেন, ২০টি গরু নিয়ে এসেছি। পাঁচটি বিক্রি হয়েছে। দামও ভালো। অতিরিক্ত দাম চাওয়া বিষয়ে ক্রেতার অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, খরচ বেশি হয়েছে। এরপরও টার্গেট অনুযায়ী দাম পেলে বিক্রি করে দিচ্ছি।
কুষ্টিয়া থেকে ১৫০টি গরু নিয়ে আসা এক বেপারি বলেন, মাত্র ১০টি বিক্রি হয়েছে। যেহেতু দুদিন সময় আছে তাই চিন্তিত না। আশা করছি সব বিক্রি হয়ে যাবে। বাজারটিতে ১১শ কেজি ওজনের একটি গরু দাম চাওয়া হয়েছে সাড়ে আট লাখ টাকা।
বিবিরহাট বাজারেও প্রচুর গরু দেখা গেছে। বাজারে আসা ক্রেতারা কিনছিলেন পছন্দের গরু। বাজারের ইজারাদার মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, বাজারে সাড়ে চার হাজার গরু আছে। সাড়ে ১৬ লাখ টাকা দামের গরুও আছে। বিক্রি মোটামুটি হচ্ছে। সোম ও মঙ্গলবার বিক্রি বাড়তে পারে।
বিবিরহাট বাজারে নবী নামে এক ক্রেতা বলেন, বাজারে গরু আছে। তবে দাম ছাড়ছেন না বেপারিরা। কাল-পরশু দুদিন সময় আছে। দেখি দাম ছাড়ে কিনা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে বিবিরহাট বাজারে ১৬টি গরু নিয়ে আসা ইয়াকুব বলেন, ছয়টি বিক্রি হয়েছে। বাকিগুলোও আশা করছি বিক্রি হয়ে যাবে। গরুর খাবারসহ অন্যান্য খরচ বেড়ে গেছে। খরচ অনুযায়ী দাম দিচ্ছি। কিন্তু ক্রেতারা সেটা বুঝতে চাচ্ছেন না। তারা অনেক কম দাম বলছেন।
এদিকে ক্রেতা-বিক্রেতার উপস্থিতিতে জমজমাট ছিল সাগরিকা বাজারও। বিক্রিও হয়েছে প্রচুর। তবে বরাবরাই ক্রেতার দাবি, গরুর দাম বেশি। আজগর নামে এক ক্রেতা বলেন, বাজারে প্রচুর গরু। ১০/১২টি গরু পছন্দ হয়েছে। কিন্তু দাম বেশি চাচ্ছে। তাই একটিও কেনা হলো না। বেপারিদের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে বিক্রি না করে আগামী বছরের রেখে দেবেন। অবশ্য আরো দুদিন সময় আছে। সেজন্য হয়তো দাম ছাড়ছে না।
পাবনা থেকে দুটি গরু নিয়ে আসা জলিল বলেন, গরু দুটির পেছনে খরচ হয়েছে প্রায় ৯ লাখ টাকা। কিন্তু ক্রেতারা একটির দাম চার লাখ টাকার বেশি বলছেন না।












