একুশের শাণিত চেতনাবোধ বাঙালি জাতির চলার আলোকবর্তিকা

মেজর মোঃ এমদাদুল ইসলাম (অব.) | শনিবার , ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ at ৫:৫৬ পূর্বাহ্ণ

আমার পাঠকদের কাছে আমার সবিনয় প্রশ্ন আপনি কি মনে করেন যদি মাতৃভাষায় প্রকাশিত না হত তা হলেরবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি কি গীতাঞ্জলি হত? নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা কি সেই দ্রোহ সেই ‘মহাকাশ ছাড়ি একা বিস্ময় বিশ্ব বিধাত্রীর’ হতে পারত? মাইকেল মধুসুধনের মেঘনাদ বধ কাব্যে’র “এতক্ষণে কহিলা কি বিষাদে”যে ব্যঞ্জনায় শ্রোতা বা পাঠকের সামনে উপস্থিত হয় তা কি সম্ভব হত? শামসুর রাহমানের “স্বাধীনতা তোমাকে পাওয়ার জন্য” মাতৃভাষায় কি অনাবিল উচ্চারণ! সৈয়দ শামসুল হকের “পরানের গহীন ভিতর” বা “নুরুলদীনের সারাজীবন” এ এমন তীব্র প্রতিবাদ এমন পুনর্জাগরণের ডাক অভাগা মানুষ যেন জেগে ওঠে আবার এ আশায় যে, আবার নুরুলদীন একদিন আসিবে বাংলায় আবার নুরুলদীন একদিন কাল পূর্ণিমায় দিবে ডাক “জাগো বাহে, কোনঠে সবায় ?” একি কল্পনা করা যায় মাতৃভাষার বাইরে?

কী মমতায় কবি জীবনানন্দ উচ্চারণ করেন “আবার আসিব ফিরে এই বাংলায়” অথবা “তোমরা যেখানে স্বাদ চলে যাও আমি রয়ে যাব এই বাংলায়” কি অবিস্মরণীয় এক আকুলতা! সুকান্ত ভট্টাচার্যে’র “সাবাশ বাংলাদেশ এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়, জ্বলে পুড়ে মরে ছারকার তবু মাথা নোয়াবার নয়” কী স্পন্দিত উচ্চারণ! মাতৃভাষাকে অমন করে বুকে লালন করারই বহিঃপ্রকাশ। শরৎচন্দ্রের ইন্দ্রনাথ কি ইন্দ্রনাথ হয়ে উঠত বা রামের সুমতি বা দেবদাস কি দেবদাস হয়ে উঠত যদি না তা মাতৃভাষার মাটির মমতা মেখে রচিত না হত?

লালন কি জাত সংসারে বা বাড়ির কাছে আরশি নগর, খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায় লালনের সেইসব র্স্বব্যাপী এক হাহাকার কি অমন চরাচর ব্যাপী বিস্তীর্ণ বিষাদ ছড়াতে পারত? এ যদি না হত মাতৃভাষায়!

শাহ আবদুল করিমের অমন মরমীয়া হৃদয় ছোঁয়া গান “গাড়ি চলে না চলেনারে” বা “মাটির পিঞ্জিরায় সোনা ময়নারে” কী মায়ের ভাষার সোদা গন্ধ না মাখলে অমন অমর হয়ে উঠত? আবদুল আলীমের দরাজ কন্ঠের “পদ্মার ঢেউ রে” নীনা হামিদের সুরেলা কণ্ঠে “আমার সোনার ময়না পাখি” বা সাম্প্রতিকের সাবিনা ইয়াসমিনের মিষ্টি মধুর হৃদয়ছোঁয়া সব গান একি মাতৃভাষা ব্যতীত সম্ভব? এই চট্টগ্রামেরই আঞ্চলিক ভাষায় “মধু কই কই” বা “কইলজার ভিতর বাঁধি রাইখম তোয়াঁরে” বা অতি সম্প্রতির “কালুঘাইটা মুরির টিন” গানগুলি মাতৃভাষায় না হলে এভাবে মানুষের মন ছুঁয়ে মানুষকে আনমনা করতে পারত?

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে বাঙালির এই মাতৃভাষার ওপরই নানাভাবে সময়ে সময়ে আঘাত আসতে থাকে। বাঙালিরা পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার পাঁয়তারা শুরু হয়। এর বিরুদ্ধে ক্ষোভে বিক্ষোভে বাঙালিরা তাদের প্রতিবাদ জানাতে থাকে, এরই চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি। এর পর বাঙালিরা শুধু তার মাতৃভাষার মর্যাদার লড়াই এ নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেনি, তাদের অভিযাত্রা শুরু হয় এক স্বাধীন র্সা্বভৌম পরিচয় প্রতিষ্ঠার। এ অভিযাত্রায় বাঙালিরা একে একে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের র্ন্বিাচন আর ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পৃথিবীর বুকে নিজেদের এক স্বাধীন জাতি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করে। বাঙালির এসব আন্দোলন সংগ্রাম আত্মদানের পরাকাষ্ঠায় ছিল এক মহাকাব্যিকতার অভিযাত্রা।

বাঙালির এ অভিযাত্রা পৃথিবীর বিভিন্ন উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক ঘটনা সমূহের সাথে নিঃসন্দেহে তুলনীয় যেমন : ফরাসী বিপ্লব। ক্রমাগত শোষণ, নিপীড়নের যাতাকল থেকে পরিত্রাণের সংগ্রামে সাধারণ জনগণ ১৪ জুলাই ১৭৮৯ সালে বাস্তিল দুর্গ আক্রমণ করে বসে। এই বাস্তিল ছিল ক্ষমতার প্রতীকী দুর্গ। বাস্তিল দুর্গের পতন ফরাসী বিপ্লবকে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছে দেয়। মানুষ তার কাঙ্ক্ষিত অধিকার অর্জনের পথে পা বাড়ায় সেই থেকে ফরাসী বিপ্লব সারা পৃথিবীর মানুষের শৃঙ্খল মুক্তির ইতিহাসে এক অমর কাব্য হয়ে আছে।

প্রসঙ্গক্রমে আমরা মে দিবসের কথাও বলতে পারি। মানুষ তার নিদিষ্ট কর্মঘণ্টাহীন শ্রমদানে যখন নিঃশেষিত প্রায় তখন ১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকা সিকাগো শহরের হে মার্কেটে পুলিশ নির্দিষ্ট শ্রমঘণ্টার দাবীতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের উপর গুলি বর্ষণ করে। এতে অনেকেই হতাহত হয় বিনিময়ে শ্রমিকরা অনধিক ৮ ঘণ্টা শ্রমদানের অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। ইন্তেফাদা। ইন্তেফাদা আরবী শব্দ। প্রতিবাদ, বিদ্রোহ, জাগরণ, আন্দোলন ইত্যাদির মিলিত অর্থ। প্রথম ইন্তেফাদা’র বহিঃপ্রকাশ ঘটে যেভাবে! ৮ ডিসেম্বর ১৯৮৭ কর্মক্লান্ত ফিলিস্তিনী শ্রমিকরা বাড়ি ফেরার পথে তাদের দুটি গাড়িকে ইসরাইলী এক লরী চালক চাপা দেয়, এতে ৪ জন শ্রমিক ঘটনাস্থলে নিহত হন। একে উপলক্ষ করে ফিলিস্তিনীরা প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে পথে নামে। শুরু হয় প্রথম ইন্তেফাদা। প্রথম ইন্তেফাদা ৮ ডিসেম্বর ১৯৮৭ থেকে ১৯৯৩ সাল এবং এর পরে দ্বিতীয় ইন্তেফাদা এ পর্যন্ত ইসরাইলী দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনীদের মুক্তি সংগ্রামের এক আলোকবর্তিকা হয়ে আছে।

রাশিয়ার অক্টোবর বিপ্লব। ১৯১৭ সালে রাশিয়ার জন মানুষেরা তাদের মুক্তির লক্ষ্যে পেট্রোগ্রাড আক্রমণের মাধ্যমে যে সমাজ পরিবর্তনের বিপ্লব শুরু করে তা পরবর্তীতে রাশিয়ায় এক নতুন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তথা সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে।

কয়েকদিন আগে ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে তরুণ তরুণীরা ভ্যালেন্টাইন ডে পালন করে। এ ভ্যালেন্টাইন ডে’র পিছনেও লুকিয়ে আছে মানুষের নিগ্রহ মুক্তির এক বেদনার্ত ইতিহাস। খ্রীষ্টিয় তৃতীয় শতকে রোমের শাসন কর্তা রাজা ক্লডিয়াস বিশ্বাস করতেন অবিবাহিত সৈনিকরা যুদ্ধক্ষেত্রে ভালো যোদ্ধা হয়। ক্লডিয়াস বিশ্বাস করতেন অবিবাহিতদের পিছু টান থাকে না তাই তারা যুদ্ধে আগ্রাসী হয়, আত্মদানে পিছ পা হয় না। এ ধারনা থেকে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগদান যোগ্য যুবকদের বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না করতে চার্চগুলিকে নির্দেশ দেন। যাজক ভ্যালেন্টাইন ক্লডিয়াসের সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে গোপনে যুবক যুবতীদের বিয়ে পড়াতে থাকেন। ভ্যালেন্টাইনের এ কর্মকাণ্ড একসময় জানাজানি হয়ে যায়। তিনি ধৃত হন এবং মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে ১৪ ফেব্রুয়ারি ফাঁসিতে ঝুলেন। সেই থেকে যাজক ভ্যালেন্টাইনকে মনে করে বিশ্বব্যাপী ভালোবাসা দিবস ১৪ ফেব্রুয়ারি।

জালিয়ানওয়ালাবাগ। ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল বৈশাখি উৎসব উপলক্ষে জালিয়ানওয়ালাবাগে হাজার হাজার মানুষ একত্রিত হয়। জেনারেল ডায়াস এ সমাবেশকে অবৈধ ঘোষণা করে তার সৈন্যদের গুলি চালানোর নির্দেশ দেন এতে হাজারো নিরপরাধ মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকারে পরিণত হন। এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ভারতব্যাপী শুরু হয় প্রতিবাদ যা প্রকারান্তরে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনকে ত্বরান্বিত করে।

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিও বাঙালিদের মাঝে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে জাগ্রত করার তেমনই এক বিষাদ মাহেন্দ্রক্ষণ ছিল এবং এ থেকে ক্রমে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি। মাতৃভাষা এবং অর্জিত স্বাধীনতা নিয়ে এবার একটু বেদনার এবং আমাদের হীনম্মন্যতার কথা বলি।

বেদনার বিষয়টি হল, যে ভাষার অধিকার আমরা পৃথিবীতে অন্যন এক জাতি সত্তা হিসাবে রক্ত দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছি সে ভাষা ব্যবহারে বা প্রয়োগে আমরা একেবারে উদাসীন। উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করতে পারি, এ লেখাটি লেখবো ভেবে পথ চলছি যখন তখন রাস্তার দু পাশে চোখ বুলাই। বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের ফলকের দিকে দৃষ্টি দিতে চোখে পড়ে যেখানে বাংলা ভাষার কোথাও স্থান নাই। এ থেকেই হয়ত আমাদের মাঝে একধরনের হীনম্মন্যতাবোধও জন্ম নিয়েছে। ফলশ্রুতিতে আমরা বাঙালিরা একজন উর্দু ভাষীর সামনে পড়লে মরিয়া হয়ে উর্দু বলার চেষ্টা করি, হিন্দি ভাষীর সামনে পড়লে হ্যায়, ম্যায়, হুয়া ইত্যাদি বলে হিন্দি বলার প্রাণপণ চেষ্টা করি।

এসব হীনম্মন্যতা দূর করার জন্যই হয়ত ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তাঁর প্রথম ভাষণটি দৃঢ় চিত্তে বিপুল গৌরবে বাংলা ভাষায় প্রদান করেছিলেন। এ সব হীনম্মন্যতা দূর করার জন্যই হয়ত কিছু বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বিদেশ বিভূঁইয়ে বসে ২১ শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি আদায় করে নিয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে এবং ১৯৬১ সালে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে “আসাম অফিসিয়াল ল্যাংগুয়েজ এ্যাক্ট” এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে বারাক ভ্যালীতে যে ১১ জন মানুষ জীবন দিয়েছিলেন সেই সব বীর ভাষা শহীদদের স্মরণ করে শেষ করছি।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব, সামরিক এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক।

পূর্ববর্তী নিবন্ধএকুশের গুপ্তধন
পরবর্তী নিবন্ধবাকলিয়ায় সিএমপির তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী টুটুল গ্রেপ্তার