একুশ আমাদের চেতনার উৎস। বাঙালির মূল চেতনা। একুশ শুধু ভাষার আন্দোলন নয়, আত্মপরিচয়ের মূল ভিত্তি। অধিকার আদায়ের অন্যতম সোপান। আপন স্বকীয়তার বহিঃপ্রকাশ। নিজস্ব চিন্তা–চেতনার ধারক। ঐতিহ্যের প্রবাহমান ধারা। শিল্প–সংস্কৃতির বিকাশ। সাহিত্যে মননশীলতা ও সৃজনশীলতা। একুশ জাতিসত্তার গতি প্রকৃতি নির্ধারণ করে। বাঙালি জাতির ভবিষ্যৎ পথের দিক নির্দেশনা দেয়। ভাষা ও সংস্কৃতি জাতিকে কীভাবে বির্নিমাণ করে তার রূপরেখা প্রণয়ন করে। একুশের পথ ধরে বাঙালি জাতি পথ চলা শুরু করে। সকল বাধা অতিক্রম করে এ পথে এগিয়ে চলে।
বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন প্রজন্মের মানস গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা একুশের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হতে থাকে। সে সময়ের শিক্ষকরাও একুশের চেতনাকে ধারণ করে এগিয়ে চলে। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে এর ব্যাপক প্রতিফলন ঘটে। এমনকি স্কুলেও এর প্রভাব পড়তে থাকে। ফলে নতুন প্রজন্ম একুশের চেতনায় শানিত হয়ে ওঠে। স্কুল কলেজে একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রভাত ফেরির আয়োজন ছাত্র–ছাত্রীদের মাঝে নতুন মাত্রা যুক্ত করে। এমনকি এলাকাবাসীরাও একুশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে ওঠে। শুধু শিক্ষক শিক্ষার্থী নয় সাধারণ মানুষ একুশের চেতনার সাথে যুক্ত হতে থাকে। কয়েক বছরের মধ্যে একুশ হয়ে ওঠে বাঙালির চেতনার মাইল ফলক।
সালাম বরকত জব্বার রফিকের আত্মত্যাগে জাতি নতুন শক্তিতে বলিয়ান হয়। তাদের রক্তের ধারা নতুন প্রজন্মের মাঝে বহমান হতে থাকে। সাতচল্লিশ পূর্বে যে ধারণা সেখানে নতুন চেতনার উন্মেষ ঘটায়। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প থেকে জাতি বেরিয়ে আসতে চায়। দাঙ্গা হাঙ্গামার চির অবসান চায়। অসম্প্রদায়িক চেতনার পথ সুগম হয়। ধর্মীয় ভেদাভেদ পরিহার করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখতে চায়। অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে দলমত ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একসঙ্গে পথ চলার জন্য অঙ্গিকারাবদ্ধ হয়। মাতৃভাষার অধিকার থেকে জাতি মৌলিক অধিকার আদায়ের দিকে ধাবিত হয়। দাবী আদায়ের জন্য আন্দোলন সংগ্রামের পথে অগ্রযাত্রা শুরু করে।
ছাপান্নের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে একুশের চেতনার প্রথম প্রতিফলন ঘটে। এ নির্বাচনের মাধ্যমে বাঙালি জানান দেয় তারা ঐক্যবদ্ধ হতে পারে। অধিকার আদায়ের প্রশ্নে একসঙ্গে লড়তে পারে। ভাষার লড়াইয়ে জিতে গিয়ে বাঙালি আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। অতীতের সব পুরানো জঞ্জাল পিছনে ফেলে দৃঢ় প্রত্যয়ে এগিয়ে চলে। এদেশের মানুষের দাবী আদায়ের আন্দোলন সংগ্রামে একুশের চেতনা মূল চালিকা শক্তিতে পরিণত হয়।
একুশের চেতনা বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারাকে আরো বেগবান করে তোলে। যুক্তফ্রন্ট সরকার দীর্ঘদিন টিকতে না পারলেও তার প্রভাব থেকে যায়। অপশাসনের বিরুদ্ধে মানুষ রুখে দাঁড়ানোর সাহস খুঁজে পায়। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে থাকে। অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। ষাটের দশকের শিক্ষা কমিশনকে ছাত্র জনতা মেনে নেয়নি। মানুষ আন্দোলন সংগ্রামে ধাবিত হয়। ছেষট্টি ছয় দফার আন্দোলন আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। ষাটের দশকে আন্দোলন সংগ্রাম চরম রূপ ধারণ করে। যা ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। এর প্রেক্ষিতে সত্তরের নির্বাচনে এদেশের মানুষ নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা অর্জন করে। যা বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারাকে মূল ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়। এ জাতীয়তাবাদী শক্তি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস যোগায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উন্মেষ ঘটায়।
বাঙালির আত্মপরিচয়, স্বাধিকার আন্দোলন, স্বাধীনতার সংগ্রাম সবই একুশের চেতনার ফসল। একুশ বার বার স্বপ্ন দেখিয়েছে, পথের সন্ধান দিয়েছে। অভিন্ন জাতি হিসেবে বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। ভাষা সংস্কৃতি ঐতিহ্য কৃষ্টি সবকিছুকে এক মোহনায় নিয়ে এসেছে। নতুন এক দেশের স্বপ্ন দেখিয়েছে। স্বাধীন সার্বভৌম দেশ ও জাতি হিসেবে গৌরবোজ্জ্বল ঠিকানা দিয়েছে। ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবাই একুশকে ধারণ করেছে। ধনী দরিদ্র কেউ একুশ থেকে দূরে থাকতে পারেনি। মধ্যবিত্তের স্বপ্ন একুশের চেতনার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। এর সাথে এসে মিলিত হয়েছে নিম্ন মধ্যবিত্তের স্বপ্ন, নিম্নবিত্তের আশা আকাঙ্ক্ষা। একুশ হয়ে ওঠেছে এদেশের মানুষের মূর্ত প্রতীকে।
একুশের চেতনাকে ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত যেসব অর্জন তা কখনো ম্লান হতে পারে না। পঁচাত্তরের পট পরিবর্তনের পর ছিয়াত্তরের যে নতুন করে যাত্রা সেখানেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বিপক্ষের সবাইকে একসূত্রে গাঁথার চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের নামে অগ্রযাত্রা শুরু হয়। বিভিন্ন সম্প্রদায় জাতি গোষ্ঠীকে এর আওতায় আনা হয়। এ ধারাটা অনেকের কাছে সহজবোধ্য হয়। বাংলাদেশের নাগরিক হলে তারা বাংলাদেশি পরিচয় বহন করে। এটা খুবই স্বাভাবিক মনে করে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশমান ধারা। যে ধারা একুশের চেতনাকে ধারণ করে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ছিনিয়ে আনে। তবে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারাও মুক্তিযুদ্ধের দাবীদার। ফলে বিগত প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে এ দুটি ধারা বহমান। জাতির মন মানসিকতা এ দুধারায় যেন বিভক্ত। কখনো এ ধারা আবার কখনো ঐ ধারা দেশের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে। রাজনীতিও এ দুধারার মাঝে ঘুরপাক খায়।
চব্বিশের আগস্টের পর আরেকটি ধারা সক্রিয় হয়ে ওঠে। যদিওবা ধারাটা নতুন কোন ধারা নয়, অনেক পুরানো। মৌলবাদী ধারা–যা একসময়ে প্রগতিশীল ধারার বিপরীত ধারা হিসেবে পরিচিত। এ ধারাটা এখন নিজেদের আধুনিক প্রগতিশীল দাবী করে থাকে। তাদের সাংগঠনিক শক্তি আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। জনসমর্থনও অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে বেশি। এরা এখন জাতীয়তাবাদী ধারার মুখামুখি। যদিওবা তাদের মূল প্রতিপক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদ, মুক্তিযুদ্ধের শক্তি। এরা ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে একটা শক্তিশালী মৌলবাদী ফ্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে চায়। সে লক্ষ্যে মৌলবাদী ধারাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি ব্যাপক জনসমর্থন চায়। তরুণদের একটা বড় অংশ এদের আশা আকাঙ্ক্ষাকে আরো তীব্র করে তুলেছে।
একুশের চেতনা কোনো রাজনৈতিক চেতনা নয়। রাজনীতির ধারা একুশের সাথে যুক্ত হয়েছে। একুশের চেতনাকে ধারণ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা রাজনৈতিক হলেও তা সাধারণ মানুষের চেতনায় পরিণত হয়েছে। ফলে একুশের চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা গণ মানুষের চেতনা। এ চেতনা বাঙালি জাতীয়বাদকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে। বাংলাদেশী জাতীয়বাদও ব্যাপক জনসমর্থনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। মৌলবাদী ধারাও জাতীয়বাদী ধারায় বিরোধ থাকলেও সমঝোতার মধ্য দিয়ে তারা পথ চলেছে। তাদেরকে বিভিন্ন সময়ে সুযোগ করে দিয়েছে। তা না হলে তারা এতদূর এগিয়ে আসতে পারতো না। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারতো না। মৌলবাদী ধারা জাতীয়তাবাদী চেতনার সাথে সহঅবস্থান করতে থাকে। অথচ একুশের চেতনার মধ্যে দিয়ে জাতি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে মৌলবাদের অবসান ঘটে। এজন্য মৌলবাদ মোকাবেলা করতে হলে আবার সবাইকে একুশের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। একুশের চেতনা সর্বজনীন চেতনা। একুশের চেতনাই জাতিকে বিভাজনের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও ব্যাংক নির্বাহী।












