ঈদের ছুটিতে চট্টগ্রাম নগরী ও আশেপাশের জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সাতকানিয়ায় ২ জন, পটিয়ায় ২ জন, মীরসরাইয়ে একজন এবং লোহাগাড়া ও আনোয়ারায় ২ মোটরসাইকেল আরোহী প্রাণ হারিয়েছেন।
দৈনিক আজাদীর সাতকানিয়া প্রতিনিধি জানান, সাতকানিয়ায় ব্যাটারি চালিত রিকশায় যাত্রী উঠানামার সময় প্রাইভেট কারের ধাক্কায় ২ জন নিহত ও ৬ জন আহত হয়েছেন। নিহতরা হলেন– রঞ্জিত ধর (৫৫) ও বাবুল দে প্রকাশ বালি (৬৫)। গতকাল বুধবার সকালে চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের সাতকানিয়ার কালিয়াইশে রাজমহল কমিউনিটি সেন্টারের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চট্টগ্রাম–কঙবাজার মহাসড়কের সাতকানিয়া অংশের কালিয়াইশের রাজমহল কমিউনিটি সেন্টারের সামনে ব্যাটারি চালিত একটি রিকশায় যাত্রী উঠানামা করছিল। এসময় চট্টগ্রামমুখী একটি প্রাইভেট কার রিকশাটিকে পেছনের দিকে ধাক্কা দেয়। এতে প্রাইভেট কার ও রিকশাটি দুমড়ে মুচড়ে সড়ক থেকে ছিটকে গিয়ে ৮ জন গুরুতর আহত হন। পরে উপস্থিত লোকজন আহতদের উদ্ধার করে দোহাজারী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে দায়িত্বরত চিকিৎসক প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে চমেক হাসপাতালে প্রেরণ করেন। পরে চমেক হাসপাতালে নেয়ার পর দায়িত্বরত চিকিৎসক রঞ্জিত ধর ও বাবুল দে প্রকাশ বালিকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত রঞ্জিত ধর দোহাজারী পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের দাশ পাড়ার মৃত নিরঞ্জন ধরের ছেলে ও বাবুল দে প্রকাশ বালি একই এলাকার মৃত মনিন্দ্র দের ছেলে। এ ঘটনায় আহতরা হলেন– ব্যাটারি চালিত রিকশার যাত্রী দিলীপ মল্লিক (৬২), টিকলু বিশ্বাস (৪০), প্রাইভেট কারের যাত্রী মো. রিয়াদ (৪০), মো. এহসান (৪০), মশিউর রহমান (৪৩) ও জেরিন আফরোজ (৬৫)।
দোহাজারীর বাবুল দাশ জানান, বাবুল দে ও রঞ্জিত ধর দোহাজারী লোকনাথ সেবাআশ্রমের উদ্বোধন উপলক্ষে নিমন্ত্রণ করার জন্য কালিয়াইশে গিয়েছিলেন। নিমন্ত্রণ শেষে দোহাজারীতে আসার জন্য রিকশায় উঠছিলেন। এসময় একটি প্রাইভেট কার রিকশাটিকে পেছনে ধাক্কা দিলে মর্মান্তিক এ ঘটনা ঘটে।
দোহাজারী হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ মো. সালাহউদ্দিন চৌধুরী জানান, ব্যাটারি চালিত একটি রিকশা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠাচ্ছিল। এসময় চট্টগ্রামমুখী একটি প্রাইভেট কার রিকশায় ধাক্কা দেয়। এ ঘটনায় ২ জন নিহত ও কয়েকজন আহত হয়েছেন। দুর্ঘটনা কবলিত রিকশা ও প্রাইভেট কার উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে।
পটিয়া প্রতিনিধি জানান, পথচারীকে বাঁচাতে গিয়ে পটিয়ায় যাত্রীবাহী একটি বাস ওল্টে বাসটির সহকারীসহ দুইজন নিহত হয়েছেন। গত শনিবার পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের বাইপাস সড়কের ভাটিখাইন রাস্তার মাথা এলাকায় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে আহত হয়েছেন নারী, পুরুষ ও শিশুসহ অন্তত ২০ জন যাত্রী।
পটিয়া হাইওয়ে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা হানিফ পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস কঙবাজারের দিকে যাচ্ছিল। পথে মহাসড়কের পটিয়া বাইপাস সড়ক অতিক্রম করার সময় এক পথচারীকে বাঁচাতে গিয়ে বাসটির চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের আইল্যান্ডে ধাক্কা লেগে ওল্টে যায়। খবর পেয়ে হাইওয়ে পুলিশ ও পটিয়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম চালান। এসময় আহতদের উদ্ধার করে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়। সেখানেই বাসের সহকারী সোলেমানকে (৪৫) কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। তার বাড়ি কক্সবাজার জেলার চকরিয়ায়। ঘটনায় গুরুতর আহত ৪ জনকে আশঙ্ক্ষাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার বিকেলে পথচারী পটিয়া উপজেলার ভাটিখাইন ইউনিয়নের আবুল কাশেম (৬৫) মারা যান।
পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. অরুপ চৌধুরী জানান, আহতদের মধ্যে একজন হাসপাতালে আনার আগেই মারা গেছেন। আরও কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অপর আহতদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া আহতদের মধ্যে রয়েছেন মিনাক্ষি (৩৮), জান্নাতুল ফেরদৌস (৩৫), তাসপিয়া (৭), আবদুর রহিম (৯), মো. ইব্রাহীম (৫৫), প্রবীর শীল (৪২), শাওরিন সুলতানা (২৫), সুলতানা রাজিয়া (৫১), আকতার বেগম (৫৪), ওয়াজিদা (৯), সুবাইকা জান্নাত (২০), ইউনুস (৩৮), ইসলাম খাতুন (৭০), আবু হানিফ (৩৮), মিরাজুল হক (১৪), মাইমোনা (৭), প্রান্ত শীল (১৭), জাহান (৪০), আদিত্য বিশ্বাস (১৩) এবং একজন অজ্ঞাত ব্যক্তি।
পটিয়া হাইওয়ে পুলিশ জানান, চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা হানিফ পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস কঙবাজার যাওয়ার পথে পটিয়া বাইপাস সড়ক অতিক্রম করার সময় এক পথচারীকে বাঁচাতে গিয়ে মহাসড়কের আইল্যান্ডে ধাক্কা লেগে ওল্টে যায়। এ ঘটনায় দুইজন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন পথচারী ও অপরজন বাসের সহকারী। দুর্ঘটনা কবলিত বাসটিকে উদ্ধার করে হাইওয়ে থানায় নেয়া হয়েছে। নিহতদের লাশ আইনি প্রক্রিয়া শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মীরসরাই প্রতিনিধি জানান, ঈদে বাড়ি যাওয়ার পথে মীরসরাই এলাকা অতিক্রমকালে দুর্ঘটনায় নিজের প্রাইভেট গাড়িতেই প্রাণ গেল এনামুল হক আইয়ুব নামের এক ব্যক্তির। ঈদের দিন শনিবার ভোর ৬টার দিকে উপজেলার ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের নয়দুয়ারিয়া এলাকায় ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসয়কের ঢাকামুখী লেনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, ভোর ৬টার দিকে ব্যক্তিগত প্রাইভেটকার চালিয়ে ঈদ উদযাপন করতে চট্টগ্রাম শহর থেকে ঢাকামুখী লেন ধরে কুমিল্লার দিকে যাচ্ছিলেন এনামুল হক। পথে মীরসরাই উপজেলার নয়দুয়ারি এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশে গাছের সঙ্গে ধাক্কা লাগে। এতে গাড়ির সামনের অংশ দুমড়ে–মুচড়ে ঘটনাস্থলে তিনি নিহত হন। খবর পেয়ে মীরসরাই উপজেলা ফায়ার সার্ভিস ও হাইওয়ে পুলিশের সদস্যরা দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করেন।
কুমিরা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাকির রাব্বানী বলেন, ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
লোহাগাড়া প্রতিনিধি জানান, লোহাগাড়ায় কাভার্ডভ্যানের নিচে চাপা পড়ে মোহাম্মদ ইশফাত (২২) নামে এক বাইক আরোহী যুবক নিহত হয়েছেন। তিনি উপজেলার সদর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের উজিরভিটা মজিদার পাড়ার মো. তৈয়বের পুত্র। ঈদের দিন শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে চট্টগ্রাম–কঙবাজার মহাসড়কে উপজেলার আধুনগর স্টেশন এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মো. রাফি (১৮) নামে অপর বাইক আরোহী গুরুতর আহত হয়েছেন। তিনি একই এলাকার মোহাম্মদ আবছারের পুত্র।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনাস্থলে চট্টগ্রামমুখী একটি দ্রুতগতির বাইক নিয়ন্ত্রণ হারায়। এতে বাইকে থাকা দুই আরোহী ছিটকে সড়কের উপর পড়ে যান। এ সময় কঙবাজারমুখী দ্রুতগতির কাভার্ডভ্যানের নিচে চাপা পড়ে তারা গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা তাদেরকে উদ্ধার করে উপজেলা সদরের এক বেসরকারি হাসপাতালে প্রেরণ করেন। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক ইশফাতকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত রাফিকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আশঙ্ক্ষাজনক অবস্থায় চট্টগ্রাম নগরে প্রেরণ করা হয়। ঘটনার পর কাভার্ডভ্যানসহ চালককে আটক করেন স্থানীয়রা। পরে তাকে থানা পুলিশে সোপর্দ করা হয়।
দোহাজারী হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সালাহ উদ্দিন চৌধুরী জানান, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ফোর্স পাঠানো হয়। কাভার্ডভ্যানটি হাইওয়ে থানা হেফজতে রয়েছে। এই ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
আনোয়ারা প্রতিনিধি জানান, চট্টগ্রাম নগরীর একটি অনুষ্ঠান থেকে আনোয়ারায় বাড়ি ফেরার পথে নতুন ফিশারি ঘাট এলাকায় বাইক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারালেন মো. সোলেমান (৩৫) নামে কাতার প্রবাসী এক যুবক। গত রোববার ঈদের পরদিন রাত ১০টায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত মো. সোলেমান আনোয়ারা উপজেলার বরুমচড়া ইউনিয়নের দিঘীর পাড় এলাকার মনিরুজ্জমানের পুত্র। ময়নাতদন্ত শেষে গত সোমবার সন্ধ্যা ৭টায় স্থানীয় মসজিদে নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, পরিবারে তার স্ত্রী, দুই পুত্র, মা ও ভাই–বোনেরা রয়েছে। দুই মাস আগে তিনি কাতার থেকে দেশে বেড়াতে আসেন। তিনি স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং দেশে এসে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। আগামী ৮ এপ্রিল কাতারে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল তার।
জানা যায়, গত রোববার বিকালে বন্ধুদের সাথে চট্টগ্রাম শহরে একটি অনুষ্ঠানে যান সোলেমান। সেখান থেকে রাত ১০টায় বাড়ি ফেরার পথে চট্টগ্রাম শহরের ফিশারি ঘাট এলাকায় দুই বাইকের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে তার মৃত্যু হয়। মর্মান্তিক এ ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে নিহতের পরিবার ও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
বাকলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোলাইমান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। পুলিশ একজনকে আটক করেছে। দুর্ঘটনাকবলিত একটি সুজুকি এবং একটি রয়েল ইনফিল্ড মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে।
চমেক পুলিশ ফাঁড়ির আইসি এসআই নুরুল আলম আশেক সাংবাদিকদের জানান, চট্টগ্রামের ফিশারি ঘাটে দুর্ঘটনার শিকার সোলেমানকে গুরুতর আহত অবস্থায় চমেক হাসপাতালে নিয়ে আসলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।











