চট্টগ্রাম শহরের প্রাচীন জনপদ চন্দনপুরা। ব্যস্ত নগরজীবনের ভেতরেও এখানে টিকে আছে এক আধ্যাত্মিক ইতিহাসের নীরব সাক্ষী। সুফি সাধক হযরত মোল্লা মিসকিন শাহ (র.)-এর মাজার ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত তকিয়া আজও স্মরণ করিয়ে দেয় মুগল আমলের সেই ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের কথা, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছে।
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, মোল্লা মিসকিন শাহ সপ্তদশ শতকে চট্টগ্রামে ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি সুদূর আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ–পশ্চিমে অবস্থিত ইয়েমেন থেকে এসেছিলেন। জানা যায়, তাঁর পিতার নাম সিপাহ্দু এবং পিতামহ শেখ সারদু মুগলী সিদ্দিকী। ধারণা করা হয়, তাঁদের পরিবার মুঘল প্রশাসনের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ছিল এবং একই সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষার ধারাও বজায় রেখেছিল।
ছোটবেলা থেকেই মোল্লা মিসকিন শাহ দুনিয়াবি জীবনের প্রতি অনাগ্রহী ছিলেন। তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেন ধর্মীয় শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও আধ্যাত্মিক সাধনায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং মানুষ তাঁর কাছে আসতে শুরু করে ধর্মীয় পরামর্শ ও দোয়ার আশায়। মোল্লা মিসকিন শাহের ঐতিহাসিক গুরুত্বের অন্যতম প্রমাণ একটি মুগল ফরমান। সম্রাট আওরঙ্গজেবের জারি করা ওই ফরমান থেকে জানা যায়, ১১০৩ হিজরি (১৬৯১–৯২ খ্রিস্টাব্দ) সালে সুবাহ বাংলার ইসলামাবাদ সরকারের অধীন হাভেলী চট্টগ্রাম পরগণায় তাঁকে ‘মদদ–ই–মা‘আশ’ হিসেবে বিশ বিঘা জমি প্রদান করা হয়।
মুগল আমলে আলেম, সুফি সাধক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের জীবিকা নির্বাহের জন্য রাষ্ট্র থেকে এ ধরনের জমি অনুদান দেওয়ার প্রথা ছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, এই ফরমান থেকে বোঝা যায় যে মোল্লা মিসকিন শাহ সেই সময়ে একজন সম্মানিত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন। জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য সময় তিনি চট্টগ্রাম শহরের চন্দনপুরা এলাকায় কাটান। সেখানে তিনি একটি তকিয়া বা খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন। এই তকিয়া ছিল আধ্যাত্মিক সাধনা, জিকির ও ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্র। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দূর–দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসতেন দোয়া নেওয়া এবং আত্মিক প্রশান্তির সন্ধানে। ধীরে ধীরে এই তকিয়া ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
চন্দনপুরার প্রবীণ বাসিন্দা আব্দুল কাদের বলেন, “ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি, মোল্লা মিসকিন শাহের তকিয়ায় গেলে মানুষের মনে শান্তি আসে। এখনও অনেক মানুষ এখানে দোয়া করতে আসে।” তকিয়ার পাশেই পরবর্তীকালে একটি মসজিদ নির্মিত হয়, যা বর্তমানে মোল্লা মিসকিন শাহ মসজিদ নামে পরিচিত। স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে এটি মুগল আমলের বৈশিষ্ট্য বহন করে বলে মনে করেন স্থানীয় গবেষকরা। মসজিদটির ছয়টি গম্বুজ রয়েছে এবং চার কোণায় বুরুজ আকৃতির মিনার দেখা যায়। ইট ও চুন–সুরকির ব্যবহারে নির্মিত এই স্থাপনাটি চট্টগ্রামের প্রাচীন মসজিদগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। স্থানীয়দের মতে, মসজিদটি শুধু ধর্মীয় উপাসনার স্থান নয়, বরং চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক স্থাপত্য ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
মোল্লা মিসকিন শাহ জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত চন্দনপুরার তকিয়াতেই সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন। সেখানেই তাঁর ইন্তেকাল হয় এবং তাঁকে একই স্থানে সমাহিত করা হয়। পরে তাঁর কবরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে একটি মাজার। বর্তমানে এই মাজার এলাকাটি আধ্যাত্মিক পরিবেশের জন্য পরিচিত। ধর্মপ্রাণ মানুষ ছাড়াও শিক্ষার্থী, গবেষক এবং ইতিহাসপ্রেমীরাও এখানে আসেন।
চট্টগ্রামের এক কলেজছাত্রী রিমা খাতুন বলেন, “মোল্লা মিসকিন শাহের জীবন সম্পর্কে জানতে পারা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক। এখানে এসে দোয়া করি এবং পড়াশোনায় মনোযোগ দেওয়ার শক্তি পাই।” একই এলাকার কলেজছাত্র জয় বলেন, “মাজারের পরিবেশ খুবই শান্ত। পড়াশোনার চাপের সময় এখানে এলে মনটা অনেকটা হালকা লাগে।” স্থানীয়দের কাছে এই স্থানটি ‘মোল্লা মিসকিনের তকিয়া’ বা ‘মোল্লা সাইনের খানকাহ’ নামেও পরিচিত। চট্টগ্রামের ইতিহাসে সুফি সাধকদের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। মোল্লা মিসকিন শাহ সেই ধারারই একজন প্রতিনিধি। তাঁর প্রতিষ্ঠিত তকিয়া, মসজিদ এবং মাজার আজও মুগল আমলের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
মোতোয়াল্লি আবদুল্লাহ মুহাম্মদ এহতেশাম বলেন, এখানে কোনো অনুদান গ্রহণ করা হয় না। নিজেদের প্রচেষ্টায় কার্যক্রম পরিচালনা করার চেষ্টা করছি। শরিয়তসম্মতভাবে মাজার ও মসজিদের কার্যক্রম পরিচালিত হয়। জিয়ারত ও ইবাদত–বন্দেগির উদ্দেশ্যে দূর–দূরান্ত থেকে আগত ভক্তবৃন্দ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আমাদের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রদান করা হয়।
মিছকিন শাহ (রহ.) মাজার মসজিদ প্রাঙ্গণে কবরস্থান নিয়ে অনেকের মধ্যে কিছু ভুল ধারণা রয়েছে। এখানে দাফন করার জন্য কোনো টাকা নেওয়া হয় কি না– এ বিষয়ে স্পষ্ট করে বলতে চাই, এখানে কবরস্থ করার জন্য কোনো অর্থ নেওয়া হয় না। কেবল যার যার কবর খননের খরচ বহন করে দাফনের কাজ সম্পন্ন করা হয়। তবে বাইরের কোনো ব্যক্তিকে এখানে দাফন করা হয় না। ওয়াকফ দলিলে উল্লেখ রয়েছে যে, ওয়ারিশদের এখানে কবরস্থ করা হবে। তবে আত্মীয়–স্বজনদেরও এখানে অনেক কবর রয়েছে। এছাড়া আত্মীয়দের অনুরোধে আরও কিছু ব্যক্তিকে এখানে কবর দেওয়া হয়েছে। কোনোভাবেই কবরের জমির মূল্য গ্রহণ করা হয় না।
প্রতি বছর মহররম মাসের ১৫ থেকে ২০ তারিখের মধ্যে যেকোনো একদিন বার্ষিক ফাতেহা শরীফ অনুষ্ঠিত হয়। আশপাশে অনেক কবর রয়েছে এবং মাজার ও মসজিদের আদব রক্ষার্থে বাইরের কোনো কমিউনিটি সেন্টারে বার্ষিক এই আয়োজন করা হয়। ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষা করে– অর্থাৎ পুরোনো স্থাপনা অক্ষুণ্ণ রেখ্তেবাহ্যিক অবকাঠামোর উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। ২০২৬ সালের শেষের দিকে উন্নয়ন কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। মাজার প্রাঙ্গণে আলোকসজ্জা, কবরস্থানে ওয়াকওয়ে ও বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণসহ অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ করা হবে, ইনশাআল্লাহ।
ইতিহাসবিদদের মতে, এ ধরনের স্থাপনা শুধু ধর্মীয় দিক থেকেই নয়, বরং আঞ্চলিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের প্রবাহে অনেক ঐতিহাসিক তথ্য হারিয়ে গেলেও চন্দনপুরার এই মাজার ও মসজিদ এখনো স্মরণ করিয়ে দেয় সপ্তদশ শতকের সেই সুফি সাধকের কথা, যিনি আধ্যাত্মিক সাধনাকে জীবনের মূল লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।












