ইতিহাসের আড়ালে ইতিহাস

কাজী রুনু বিলকিছ

শনিবার , ২ মার্চ, ২০১৯ at ৬:১৭ পূর্বাহ্ণ
68

পরে সরকার তাকে মুচলেকা দিয়ে ছাড়ার প্রস্তাব দেয় কিন্তু তা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর সরকারি কর্মকর্তা স্বামীও তাকে মুচলেকা দিয়ে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান। তাতেও তিনি অস্বীকৃতি জানান।
এই ঘটনায় আব্দুল মান্নাফ মমতাজ বেগমকে ডিভোর্স দেন। ১৯৫৩ সালের শেষ দিকে দেড় বছর কারাভোগের পর মমতাজ বেগম
মুক্ত হন।

ভাষার মাস শেষ। শুরু হয়েছে স্বাধীনতার আন্দোলনের আগুন ঝরা মার্চ মাস। কি আশ্চর্য সুন্দর এই জোড়া মাস। বাঙালির অস্তিত্বের জাগরণের আত্মপরিচয়ের মাস। বাঙালি মাথা উঁচু করে একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়ে ওঠার মাস। কত মানুষের কত পরিবারের আত্মত্যাগ জড়িয়ে আছে আমাদের লাল সবুজ পতাকায়। একুশ বলতেই আমরা উজ্জীবিত হয়ে উঠি। এই একুশ কোনো তারিখ নয় এটি আমাদের চেতনার নাম। পাকিস্তানিদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রথম জেগে ওঠা, প্রথম প্রতিবাদ, প্রথম অর্জন।
যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে ভাষা হিসেবে বাংলার এই প্রতিষ্ঠা ও স্বীকৃতি বিশ্বজুড়ে, যে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বাংলাভাষী জনগণ সেই ভাষার নামে একটা দেশ পেয়েছে সেই চির চেনা ভাষা শহীদ সালাম, রফিক, জব্বার, শফিউরের প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। তাদের এই আত্মদান বৃথা যায়নি। যতদিন বাংলা ভাষা বেঁচে থাকবে তারাও অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে আমাদের ইতিহাসে। ইতিহাসের আরও কিছু দায় আছে। বাংলাদেশের নারী সমাজ ’৫২ এর ভাষা আন্দোলন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান ’৭০ এর নির্বাচন ও ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধসহ প্রতিটি আন্দোলনে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে। আমাদের প্রতিটি আন্দোলনে, প্রতিটি অর্জনে নারীদের ভূমিকা অভূতপূর্ব। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানকে খণ্ডিত করা হয়েছে। সীমিত করা হয়েছে একটি নির্দিষ্ট জায়গায়। সেটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নারী সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। সহায়ক শক্তি হিসেবেও কাজ করেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর অভাবনীয় ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছে। ভাষা আন্দোলনে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু ইতিহাস পক্ষপাতবিহীন না হওয়ার কারণে আমাদের জানা হয়ে ওঠে না অনেক কিছু। আমাদের অজানা থেকে যায় অনেকের অবদানের কথা। রাণী ভট্টাচার্য, প্রতিভা মুৎসুদ্দী, হালিমা খাতুন, অধ্যাপক ড. সুফিয়া আহমেদ, রওশন আরা, মমতাজ বেগমকে আমরা কতটুকু জানি? পুরুষ নির্মিত ইতিহাসে উনাদের স্থান কি হয়েছে? খুব অবাক হওয়ার মত ব্যাপার হচ্ছে প্রথম ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মেয়েদেরই দল। প্রথম রক্তভেজা রাজপথে পড়ে থাকা মাথার খুলির ছবি মেয়েদের হাত থেকেই পত্রিকায় যায়।
রাণী ভট্টাচার্য : বরিশালে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলেন তিনি। মাতৃভাষার স্বীকৃতির প্রশ্নে নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে রাজপথে ছিলেন তিনি। বরিশালের স্বারস্বত বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। আন্দোলনের স্বার্থে সকল ছাত্রীদেরকে নিয়ে রাজপথে নামেন। স্বারস্বত স্কুল থেকে বের হওয়া সবচেয়ে বড় মিছিলটির নেতৃত্ব দেন রাণী ভট্টাচার্য। শুধু তাই নয় পরবর্তীতে তিনি মুক্তিযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেন। ২০০৭ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
প্রতিভা মুৎসুদ্দী : ১৯৫২ সালে চট্টগ্রাম জেলা ভাষা আন্দোলনের হয়ে আন্দোলন পরিষদে যোগ দেন। তিনি কারা ভোগ করেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে কুমুদিনীর মাধ্যমে নিজেকে ওতপ্রোতভাবে নিয়োজিত করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার, ওষুধ প্রদানসহ স্বাস্থ্য সেবার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭২ সাল থেকে তিনি কুমুদিনী কমপ্লেক্সের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। ১৯৯৮ সালে ভারতশ্বেরী হোমসের অধ্যক্ষের পদ থেকে অবসর নিলেও আজও শিক্ষা বিস্তারে তাঁর নিরলস চেষ্টা চলছে। তিনি চিরকুমারী।
অধ্যাপক ড. সুফিয়া আহমেদ : তিনি ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যেসব মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে সেগুলোতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ছাত্রীদের সংগঠিত করার দায়িত্বও পালন করেন। ১৯৫২ সালে ২১ শে ফেব্রুয়ারি তারিখে ঐতিহাসিক আমতলায় অনুষ্ঠিত ছাত্র জনতার সমাবেশে তিনি উপস্থিত ছিলেন। ঐ সমাবেশ থেকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত হয়। মেয়েদের যে দলটি প্রথম বের হয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ড. সুফিয়া আহমেদ ছিলেন সেই দলে। তাছাড়া ভাষা আন্দোলন পরিচালনার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়। সুফিয়া আহমেদ ও লায়লা সামাদসহ বেশ কয়েকজন মেয়ে ভাষা আন্দোলনের জন্য অর্থ সংগ্রহের কাজ করেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা চাঁদা তুলেছেন। ভাষা আন্দোলনের স্বীকৃতিস্বরূপ ধানমন্ডিতে একটি সড়কের নামকরণ করা হয়েছে ভাষা সৈনিক সুফিয়া আহমেদ সড়ক। বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি প্রথম জাতীয় অধ্যাপক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
ড. হালিমা খাতুন : তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া খাতুন ও সুফিয়া খানের সাথে হুইসপারির ক্যাম্পেইনে যোগ দেন। প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভাষা আন্দোলনের সাথে যুক্ত হওয়া। বিশ্ববিদ্যালয় জুড়ে ছিল কড়া নিয়মকানুন। ছাত্রীদের জন্য ছিল আরও কঠিন নিয়মকানুন। সব সময় কড়া নজরদারিতে থাকতে হতো। ৫২’র সেই রক্তাক্ত দিনে আমতলায় সমবেত হয় ছাত্র জনতা, ছাত্রীদের কাজ ছিল বিভিন্ন স্কুল কলেজের ছাত্রীদের এই আন্দোলনে শামিল করা। মুসলিম গার্লস স্কুল ও বাংলা বাজার গার্লস স্কুলের আমতলায় নিয়ে আসার দায়িত্ব পড়ে হালিমা খাতুনের উপর। ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে বক্তব্যের পরে স্লোগানে স্লোগানে কেঁপে ওঠে চারপাশ। এবং মেয়েদের দলটি প্রথম ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে। ড. হালিমা খাতুন ছিলেন সেই দলের একজন।
একে একে মেয়েদের তিনটি দল বের হয়ে আসে পুলিশের লাঠিপেটা ও কাঁদানে গ্যাস উপেক্ষা করে। রাস্তায় ভাষা শহিদের তাজা রক্ত। আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার জন্য সবাই ছুটছে। রক্তে ভেজা রাস্তার মাঝে মানুষের মাথার মগজ ছিটিয়ে পড়া। ছাত্ররা মাথার খুলির ছবি তুলে ছেলেদের হলে রাখে। সেই বন্ধ রুম থেকে অন্ধকার রাতে জীবনবাজি রেখে পুলিশের সামনে দিয়ে ছবিটি নিয়ে আসেন বুকের ভেতর করে। বিভিন্ন পত্রিকায় পরের দিন সেই ছবি ছাপা হয়। ধরা পড়লে নিঃসন্দেহে মৃত্যুই হতো তার শাস্তি। কিন্তু তিনি মৃত্যুকে উপেক্ষা করে মাতৃভাষার প্রতি দায়িত্ব পালন করেছেন।
মমতাজ বেগম : মহান ভাষা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সৈনিক ছিলেন তিনি। তিনি চরমভাবে লাঞ্ছিত ও দীর্ঘ কারা ভোগ করেন। ১৯২৩ সালের ২০ মে কলকাতার হাওড়ার শিবপুরে তার জন্ম। তার পুরো নাম কল্যাণী রায় চৌধুরী, ডাক নাম মিনু। ১৯৪৪ সালে কলকাতার সিভিল সাপ্লাই অফিসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আব্দুল মান্নাফের সাথে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর তিনি মমতাজ বেগম নাম গ্রহণ করেন। তার বাবা রায় বাহাদুর মহিম চন্দ্র রায় ছিলেন জেলা জজ। পরে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি। ১৯৪২ সালে তিনি কলকাতার দি স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ায় যোগদানের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। দেশভাগের পর তিনি ময়মনসিংহে চলে আসেন। সেখানে বিদ্যাময়ী স্কুলে কিছুদিন শিক্ষকতা করেন। এরপর তিনি ১৯৫১ সালে নারায়ণগঞ্জের মর্গ্যান হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার সংগঠিত ভাষা আন্দোলনের মিছিলে পুলিশের গুলিতে ছাত্র শহীদ হওয়ার সংবাদে নারায়ণগঞ্জের রহমতুল্লাহ মুসলিম ইনস্টিটিউট মাঠে একটি বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। ঐ দিন মর্গ্যান স্কুলের ছাত্রীসহ মেয়েদের প্রথম মিছিল এই জনসভায় উপস্থিত হয়। তাছাড়া ভাষা আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য তিনি তৎকালীন রাজনৈতিক নেতা ও শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেন।
তিনি আদমজী জুট মিল শ্রমিকদের সঙ্গে বেশ কয়েকবার বৈঠক করেন এবং তাদেরকে আন্দোলনের তাৎপর্য বোঝাতে সক্ষম হন। দূরদর্শী ও দক্ষ সাংগঠনিক কর্ম তৎপরতায় হয়ে ওঠেন আন্দোলনের প্রধান প্রাণশক্তি। মমতাজ বেগমকে গ্রেপ্তার করতে পারলে আন্দোলন বন্ধ হয়ে যাবে এ লক্ষে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মর্গান স্কুলের তহবিল তসরূপের মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করে ১৯৫২ সালে ২৯ ফেব্রুয়ারি তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে সংগঠিত বিক্ষোভ মিছিল সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। ভারতের ঞযব ংঃধঃবসবহঃ পত্রিকায়ও এই খবর প্রকাশিত হয়।
২৯ শে ফেব্রুয়ারি পুরো শহর উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সরকারের নির্দেশে মমতাজ বেগমের জামিনের আবেদন না মঞ্জুর করে। আদালতের রায় শোনার সাথে সাথে নারায়ণগঞ্জবাসী উত্তেজনায় ফেটে পড়ে। মমতাজ বেগমকে বহনকারী গাড়িটি চাষাড়া মোড়ে এলে হাজার হাজার জনতা গাড়িটি আটকে রাখে। শত শত গাছ কেটে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। পুলিশের সাথে জনতার ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। শত শত লোক আহত হয়। পরে সরকার তাকে মুচলেকা দিয়ে ছাড়ার প্রস্তাব দেয় কিন্তু তা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর সরকারি কর্মকর্তা স্বামীও তাকে মুচলেকা দিয়ে বেরিয়ে আসার আহবান জানান। তাতেও তিনি অস্বীকৃতি জানান।
এই ঘটনায় আব্দুল মান্নাফ মমতাজ বেগমকে ডিভোর্স দেন। ১৯৫৩ সালের শেষ দিকে দেড় বছর কারাভোগের পর মমতাজ বেগম মুক্ত হন।
ভাষা আন্দোলনের অন্যতম নারী সৈনিক মমতাজ বেগম অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি দেশের জন্য, ভাষার জন্য সংসার পর্যন্ত বিসর্জন দিয়েছেন।
এই মহীয়সী নারী ও তাঁর সংগ্রামের কথা, তাঁর ত্যাগের কথা, তাঁর দেশ প্রেমের কথা, আমরা কতটুকু জানি, কতোটা মনে রেখেছি তাকে? কতোটা সম্মানিত করতে পেরেছি তাকে? ইতিহাস লৈঙ্গিক বৈষম্য থেকে বেরিয়ে আসলে আমরা নারীর দেশপ্রেমের অনেক উপাখ্যানের কথা জানতে পারব।

x