আজ যে ইংরেজি বছর বা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার সমগ্র বিশ্বে সময় নির্ধারণের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, তার পেছনে রয়েছে মানব সভ্যতার কয়েক হাজার বছরের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান, সাংস্কৃতিক বিবর্তন ও ধারাবাহিক সংস্কারের ইতিহাস। সময় গণনা মানুষের জীবনে শুধু দিন–তারিখ জানার বিষয় নয়; এটি কৃষিকাজ, ধর্মীয় আচার, রাষ্ট্র পরিচালনা, বাণিজ্য ও বিজ্ঞানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই ইংরেজি বছরের ইতিহাস মূলত মানব সভ্যতার সময়চিন্তার ইতিহাস।
প্রাচীন মানুষ প্রথমে আকাশ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সময় নির্ধারণ করতে শেখে। সূর্যের দৈনিক উদয়াস্ত দিয়ে দিন, চাঁদের কলা পরিবর্তনের মাধ্যমে মাস এবং সূর্যের আপাত বার্ষিক গতিপথের মাধ্যমে বছরের ধারণা গড়ে ওঠে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখনই, যখন বোঝা যায় চাঁদভিত্তিক মাস ও সূর্যভিত্তিক বছরের দৈর্ঘ্য এক নয়। চাঁদের এক মাস গড়ে প্রায় ২৯ দশমিক ৫ দিন, অথচ পৃথিবী সূর্যকে একবার প্রদক্ষিণ করতে সময় নেয় প্রায় ৩৬৫ দিন ৫ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট ৪৬ সেকেন্ড। এই ভগ্নাংশ সময়কে উপেক্ষা করলে ক্যালেন্ডার ধীরে ধীরে প্রকৃত ঋতুচক্র থেকে সরে যেতে থাকে।
ইংরেজি বছরের শিকড় প্রাচীন রোমান ক্যালেন্ডারে। রোমানদের প্রাথমিক ক্যালেন্ডারে মাত্র ১০টি মাস ছিল এবং বছরের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩০৪ দিন। শীতকালকে তারা কার্যত ‘মাসহীন সময়’ হিসেবে গণ্য করত। পরে সময়ের সঙ্গে ঋতুর মিল ঘটাতে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাস যোগ করা হয়। তবুও এই ক্যালেন্ডার সূর্যবর্ষের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না এবং দ্রুতই এতে বড় ধরনের গরমিল দেখা দেয়।
খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ সালে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজার এই সমস্যার সমাধানে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের সহায়তায় জুলিয়ান ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন। এই ক্যালেন্ডারে এক বছরের দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হয় ৩৬৫ দিন এবং প্রতি চার বছরে একবার একটি অতিরিক্ত দিন যোগ করার নিয়ম চালু করা হয়, যা লিপ ইয়ার নামে পরিচিত। এটি সময় গণনায় একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনলেও পুরোপুরি নিখুঁত ছিল না। কারণ জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে ধরা ৩৬৫ দশমিক ২৫ দিনের বছর প্রকৃত সৌর বছরের চেয়ে প্রায় ১১ মিনিট বেশি ছিল।
এই সামান্য ভুল প্রথমে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে না হলেও শত শত বছর ধরে জমতে জমতে এটি বড় সমস্যায় পরিণত হয়। ১৬ শতকের মধ্যে ক্যালেন্ডার প্রকৃত ঋতুচক্র থেকে প্রায় ১০ দিন পিছিয়ে যায়। এর ফলে বসন্ত বিষুব, ধর্মীয় উৎসব ও কৃষিকাজের সময় নির্ধারণে জটিলতা সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতে ১৫৮২ সালে পোপ গ্রেগরি ত্রয়োদশ গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন।
গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে লিপ ইয়ারের নিয়ম আরও নিখুঁত করা হয়। এতে বলা হয় প্রতি চার বছরে লিপ ইয়ার হবে, তবে যেসব বছর ১০০ দ্বারা বিভাজ্য, সেগুলো সাধারণত লিপ ইয়ার হবে না; কিন্তু ৪০০ দ্বারা বিভাজ্য বছর আবার লিপ ইয়ার হিসেবে গণ্য হবে। এই নিয়মের ফলে গড় বছরে দিনের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৬৫ দশমিক ২৪২৫, যা প্রকৃত সৌর বছরের সঙ্গে অত্যন্ত কাছাকাছি। এই সংশোধনের মাধ্যমে সময় গণনার দীর্ঘদিনের সমস্যা অনেকটাই দূর হয়।
প্রথমে ইউরোপের ক্যাথলিক দেশগুলো গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করলেও ধীরে ধীরে এটি সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। আজ আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বৈশ্বিক বাণিজ্য, বিজ্ঞান গবেষণা, মহাকাশ অনুসন্ধান ও আধুনিক প্রযুক্তির সময় নির্ধারণ এই ক্যালেন্ডারের ওপরই নির্ভরশীল। ইংরেজি বছর তাই কেবল একটি পাশ্চাত্য সময়পদ্ধতি নয়, বরং বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি বৈশ্বিক সময়ব্যবস্থা।
ইংরেজি বছরের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সময় কোনো স্থির বা চূড়ান্ত ধারণা নয়। প্রকৃতির নিয়ম বোঝার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ সময়কে সংশোধন করেছে, উন্নত করেছে এবং আরও নিখুঁত করার চেষ্টা চালিয়ে গেছে। এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টাই আজকের ইংরেজি বছরকে আধুনিক সভ্যতার সময়চিন্তার ভিত্তিতে পরিণত করেছে।







