‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়/ ওরা কথায় কথায় শিকল পরায় আমার হাতে–পায়ে…./ কইতো যাহা আমার দাদায়/ কইতো তাহা আমার বাবায়’। কালজয়ী এই গানটির রচিয়তা, সুরকার ও শিল্পী আবদুল লতিফ। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত এই গানটি মাতৃভাষা রক্ষার অন্যতম গান হিসেবে পরিচিত।
হাজার বছরের বাংলা ভাষাকে ওরা (পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী) কোনোভাবেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা দিতে চায়নি। অথচ এদেশের মানুষ স্বপ্ন দেখে বাংলায়। কবিতা–গানে ভরপুর এ দেশ। এ দেশেই জন্মেছেন প্রাচীন যুগ থেকে আধুনিক যুগের কবি–সাহিত্যিকবৃন্দ। লালন–হাছন, মধুসূদন–রবীন্দ্রনাথ–নজরুল–জীবনানন্দ দাশের কবিতা গান, এ দেশের প্রতিটি মানুষের কণ্ঠে উচ্চারিত।
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজুদ্দৌল্লা যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে, তখন এদেশের কিছু চক্রান্তকারীর কথা শুনে ইস্ট–ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলে চলে যায় বাংলা। তারপর ব্রিটিশ শাসন। প্রায় দুশো বছরের বেড়াজাল ছিন্ন হয় ১৯৪৭ সালে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাঁচটি প্রদেশ নিয়ে গঠিত হয় পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তান হাজার মাইল ব্যবধানে একমাত্র প্রদেশ। এর ভাষা–সংস্কৃতি একেবারেই পশ্চিম থেকে আলাদা। শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ ছাড়া এ প্রদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সাথে তাদের সম্পর্ক খুবই অল্প।
তাই পাকিস্তানের জনক ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ খুবই সহজে বলতে পারেন-‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে কেবলই উর্দু।’ আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাঙালি, ছাত্রদেরও স্বাভাবিক উত্তর ছিল-‘না’। কেবল ‘না’ বলেই তারা থামেনি। ১৯৪৮ সাল থেকে পর পর চার বছর ১১ মার্চ তারা পালন করে ‘রাষ্ট্রভাষা’ দিবস। ১৯৫২ সালের জানুয়ারিতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন পুনর্বার রাষ্ট্রভাষা উর্দুর পক্ষে ঘোষণা দিলে পূর্ববাংলায় আগুন জ্বলে ওঠে। তারপর থেকে শুরু হয় বাঙালির প্রতিবাদ–প্রতিরোধ। ৪ ফেব্রুয়ারি পতাকা দিবস পালন করে তাদের সামর্থ্যের কথা পশ্চিম –পাকিস্তানিদের জানান দেয়। তারা ২১ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ধর্মঘটেরও ডাক দেয়। অন্যদিকে মুসলিম লীগ সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে সকল সভা–সমাবেশ নিষিদ্ধ করে।
ছাত্রসমাজ চুয়াল্লিশ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেদিন ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ সকাল থেকে মিছিলের পর মিছিল আসতে থাকে। কড়া পুলিশি প্রহরা মোকাবেলা করে ১৪৪ ধারা ভাঙতে উদ্যত হয় তারা। ছাত্রীরাও এতে সাহসী ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসে। ছাত্র–ছাত্রীদের সাথে হোটেলের বয়–বেয়ারা, পথচারী, রিকশাওয়ালা পর্যন্ত এতে অংশ নেয়।
শাসকচক্র রাস্তার মোড়ে মোড়ে সেদিন ঘাঁটি স্থাপন করে। কাঁটাতার, স্টেনগানের ব্যারিকেড ভেঙে ছাত্ররা পরিষদ ভবনের দিকে অগ্রসর হয়। বর্তমান জগন্নাথ হল ছিল তখন পরিষদ ভবন। ভবনের দিকে যেতেই পুলিশ গুলি চালায়। ফলে ৪ জন নিহত ১৭ জন আহত হয়। ভাষার জন্য দেশের জন্য প্রথম রক্তপাত।
এ ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ আপামর জনতা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে সমবেত হয়। তখন শরীরে জ্বর থাকা সত্ত্বেও ছটফট করতে লাগলেন মাহবুব উল চৌধুরী। চট্টগ্রামে বসে তিনি লিখলেন-‘ওরা চল্লিশজন কিংবা আরো বেশি/ যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে–রমনার রৌদ্রদগ্ধ কৃষ্ণচূড়ার গাছের তলায়/ ভাষার জন্য, মাতৃভাষার জন্য/ যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে/ আলাওলের ঐতিহ্য/ কায়কোবাদ, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের/ সাহিত্য ও কবিতার জন্য/ যারা প্রাণ দিয়েছে ওখানে/ পলাশপুরের মকবুল আহমদের/ পুঁথির জন্য/ রমেশ শীলের গাথার জন্য/ জসীমউদ্দীনের ‘সোজন বাদিয়ার ঘাটের’ জন্য/… সেই চল্লিশটি রত্ন যেখানে প্রাণ দিয়েছে/ আমরা সেখানে কাঁদতে আসিনি/ যারা গুলি ভরতি রাইফেল নিয়ে এসেছিল ওখানে/ যারা এসেছিল নির্দয়ভাবে হত্যা করার আদেশ নিয়ে/ আমরা তাদের কাছে/ ভাষার জন্য আবেদন জানাতেও আসিনি আজ/ আমরা এসেছি খুনি জালিমদের ফাঁসির দাবি নিয়ে।’ (‘কাঁদতে আসিনি ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি’)। ‘ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ/ দুপুর বেলার অক্ত/ বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায়/ বরকতেরই রক্ত।’ (একুশের কবিতা : আল মাহমুদ)।
এর মাঝে ১১ বছরের কিশোর, আরেকজন ছিল নাম না জানা কিশোর, পরে জানা যায় তার নাম ছিল অলিউল্লাহ। আর নাম জানা কিশোরের নাম ছিল আখতারুজ্জামান। সালাম–বরকত–রফিক–শফিক–জব্বারের পাশে ওদের নাম আজও ওদের নামও উচ্চারিত হয় না। ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘২১ ফেব্রুয়ারিতে যেমন ভাষার দাবিতে কিশোররা আহত ও নিহত হয়, ২২ ফেব্রুয়ারিতেও তেমনি শিশুর মাথায় বন্দুকের সঙ্গীন দ্বারা আঘাত করা হয়।’
ভাষা শহিদদের ইতিহাসে বড়োদের সাথে, তরুণ সমাজের সাথে কিশোর সমাজও এগিয়েছিল নির্ভীকতায়। নিজের জীবন বাজি রেখে বাংলা মায়ের দামাল খোকারা রক্তে ভিজিয়েছিল পকেটে রাখা ‘মায়ের চিঠি’। ভাষা–শহীদদের শুধু স্মরণ নয়, একুশ মানে জীবনের সকল পর্যায়ে বাংলার ব্যবহার। একুশ মানে আবদুল গাফফার চৌধুরীর লেখা ও আলতাফ মাহমুদের সুরে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ প্রভাতফেরির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। দিবসটি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত। বাংলা ভাষাকে আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ছড়িয়ে দিতে হবে।








