বাঁশখালী ও সাতকানিয়ায় টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের খোঁজখবর নিতে এবং তাদের পাশে দাঁড়াতে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এমপি। গতকাল শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামে পৌঁছে তিনি বাঁশখালী ও সাতকানিয়ার বিভিন্ন বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। বন্যা কবলিত এলাকা পরিদর্শন শেষে সাধনপুরের এক কমিউনিটি সেন্টারে মতবিনিময় ও বন্যাদুর্গতদের মাঝে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেন। এর আগে কালীপুর ইউনিয়নের পশ্চিম গুনাগরী জেলে পাড়ায় বন্যাকবলিত মানুষের সঙ্গে কোমরপানিতে নেমে কুশল বিনিময় করেন।
পরিদর্শন শেষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বক্তব্যের শুরুতে বলেন, আমার মত এরকম মেহমান দেখছেন কি আগে? মানুষ যখন তার নিজের এলাকায় ঘুরাফিরা করে তখন লুঙ্গি–গেঞ্জি পড়ে। আমিও আপনাদের সামনে গেঞ্জি পরে আসা মানে আমি আপনাদের মেহমান না, আপনাদের পরিবারের একজন।
তিনি বলেন, জাতির দুষমন, এরা কারা গ্রাম থেকে শুরু করে সচিবালয় পর্যন্ত যারা বসে আছে তারা। গ্রামের মেম্বার থেকে শুরু করে, যারা পার্লামেন্ট মেম্বার হয়েছিল। মন্ত্রী হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী হয়েছে, তাদের সবাইকে খারাপ বলছি না। তাদের মধ্যে বৃহৎ একটা অংশ ডাকাত ছিল। তারা দেশের সম্পদ লুট করেছে। জনগণের হক জনগণের কাছে পৌঁছায়নি। তাই আমাদের যুদ্ধ সব ধরনের দুনীর্তির বিরুদ্ধে, আমাদের যুদ্ধ সকল চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, যেখানে জনগণের দুর্ভোগ সেখানে আমরা ছুটে যাব, আমি আজ দুটি উপজেলার কিছু অংশ ঘুরে দেখেছি। তুলনামূলকভাবে বাঁশখালী বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই আমি এখানে ছুটে এসেছি। আমি সংগঠনের নেতাদের নির্দেশ দিয়েছি, যাদের যা আছে তা সহযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার জন্য। এ পর্যন্ত এ বিভাগে ৩১ জন মারা গেছে। আমাদের দলের পক্ষ থেকে প্রতিজনকে ৫০ হাজার টাকা সহযোগিতা করব এবং সরকারকে অনুরোধ করব সরকারি ট্রেজারি থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা করার জন্য। সরকারকে ভাল কাজে সমর্থন দেব, আর খারাপ কাজে বসে বসে আঙ্গুল চুসে বসে থাকব না। ক্ষতিগ্রস্তদের আমরা রিলিফ নয় উপহার দেব। আপনাদের কাছে সুখের দিনে আসতে না পারলেও দু:খের দিনে যাতে আপনাদের পাশে থাকতে পারি সে তৌফিক যেন আল্লাহ আমাকে দান করেন।
সমাবেশে শাহজাহান চৌধুরী এমপি বলেন, বাঁশখালীর সংসদ সদস্যের বাঁশখালীর জনগণের জন্য কি টান, প্রতিদিন সংসদে জনগণের জন্য একটা একটা দাবি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, বাঁশখালীকে জামায়াত বানাই ফেলাই পরিবু, পারিবানা তোয়াঁরা, এ সময় জনগণ হ্যাঁ সূচক জবাব দেয়।
সমাবেশে মাওলানা জহিরুল ইসলাম এমপি বলেন, যারা বাঁশখালীর এতিহ্যবাহী জলকদর খাল দখল করে রেখেছে, যারা প্রধান সড়কের উন্নয়ন করেনি, যারা উপকূলীয় বেড়িঁবাধের নামে টাকা লুটপাট করে খেয়েছে, তাদের কারণে আজ বাঁশখালীর এ দশা হয়েছে। জনগণ আমাদেরকে ম্যান্ডেট দিয়েছে, পর্যায়েক্রমে বাঁশখালীর সকল উন্নয়ন করা হবে।
পরিদর্শনকালে তাঁর সঙ্গে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহাজাহান, মহানগর আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম, চট্টগ্রাম অঞ্চল টিম সদস্য মুহাম্মদ জাফর সাদেক, দক্ষিণ জেলা আমির মুহাম্মদ আনোয়ারুল আলম চৌধুরী, উত্তর জেলা আমির আলাউদ্দিন সিকদার, মহানগরী সেক্রেটারি মুহাম্মদ নুরুল আমিন, ডাকসুর জিএস ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ, মহানগরীর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ফয়সাল মুহাম্মদ ইউনুস, সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ শামসুজ্জামান হেলালী, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন চট্টগ্রাম মহানগরীর সভাপতি এস এম লুৎফর রহমান, ড. আ ম ম মসরুর হোসাইনসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
এরপর গতকাল শুক্রবার মহানগরীর চান্দগাঁও থানার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের টেকবাজার এলাকায় অতিবর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত নারী–পুরুষের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। এসময় সংক্ষিপ্ত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, আপনাদের জন্য সামান্য কিছু খাদ্যসামগ্রী নিয়ে এসেছি। প্রকৃতপক্ষে এগুলো আপনাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে পৌঁছে দেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তব সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা তা করতে পারিনি। আল্লাহতাআলা যেন আমাদের আরও বেশি মানুষের সেবা করার তাওফিক দান করেন, আপনারা সে জন্য দোয়া করবেন। জামায়াতে ইসলামী সবসময় জনগণের পাশে ছিল, আছে এবং ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতেও থাকবে। চান্দগাঁও থানা আমির মুহাম্মদ ইসমাইলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ শাহজাহান, চট্টগ্রাম মহানগরী আমির মুহাম্মদ নজরুল ইসলাম, উত্তর জেলা আমির আলাউদ্দিন সিকদার, মহানগরীর অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মুহাম্মদ উল্লাহ ও ফয়সাল মুহাম্মদ ইউনুছ। এর আগে ডা. শফিকুর রহমান চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে পৌঁছালে সেখানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য অধ্যাপক আহছানুল্লাহ, মহানগরীর নায়েবে আমির আমিরুজ্জামানসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সকালে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে দলীয় নেতা–কর্মীরা তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করেন।
বিডিনিউজ জানায়, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকার যে অঙ্গীকার করেছে, তার দৃশ্যমান অগ্রগতি ‘জনগণ দেখতে চায়’। সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর বলেন, দেশের চারটা বিভাগে মূলত এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর এবং ময়মনসিংহ বিভাগে। আর বাকি বিভাগগুলো অতটা ভাল না। কিন্তু এই চারটা বিভাগের অবস্থা ক্রমান্বয়ে খারাপের দিকে যাচ্ছে। তবে রংপুর বিভাগ বেশি হুমকিতে পড়বে যদি তিস্তার ওইদিক থেকে বাঁধ সব খুলে দেওয়া হয়। তাহলে যেটা প্রত্যেক বৎসরই হয়, এটা দুঃখ হয়ে আছে। সেই ঝামেলাটা দেখা দেবে। এজন্য আপনারা জানেন যে, ইতোমধ্যে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমাদের পক্ষ থেকে জোরালো দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। এবং সরকারের পক্ষ থেকেও এ ব্যাপারে অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছে। জামায়াত আমির বলেন, আমরা এখন সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অপেক্ষায় আছি। আমরা জানি প্রজেক্টটা অনেক বড়। সময় লাগবে। কিন্তু আন্তরিকভাবে কাজটা শুরু হোক, দৃশ্যমানভাবে, জনগণ এটা দেখতে চায়। চট্টগ্রামের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, যারা কষ্টে আছে, তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য এবং সরেজমিনে দেখে গিয়ে আমাদের করণীয়, সরকারে করণীয় সম্পর্কে আমাদের পক্ষ থেকে দাবি উত্থাপনের জন্য মূলত আমরা এখানে এসেছি। আমি সর্বপ্রথম সেই সমস্ত মানুষদের প্রতি সহানুভূতি জ্ঞাপন করছি এবং তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি, সমপ্রতি বন্যায় যারা নিহত হয়েছেন, পাহাড় ধসের কারণে বা বিভিন্ন কারণে। বিশেষভাবে আমরা খুবই উদ্বিগ্ন, চট্টগ্রাম মহানগরী হচ্ছে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী। কিন্তু একটু বর্ষা নেমে এলেই পুরা চট্টগ্রাম মহানগরীতে দুর্ভোগ দেখা দেয়। নালা নর্দমা উপচে পড়ে বিভিন্ন ধরনের অসুবিধার কারণে দুয়েকটা মৃত্যুর ঘটনাও গতবার ঘটেছে। শফিকুর রহমান বলেন, সরকারের দায়িত্ব মূলত এগুলো সমাধান করা। কিন্তু বিরোধী দল হিসেবেও আমাদের দায়িত্ব আছে বিষয়গুলো সরকারকে ধরে দেওয়া। এবং জনগণের হয়ে দাবি আদায় করা, কাজ করা। আমাদের আজকের আসাটাও অনেকটা সেরকমের।











