‘অন্তর মম বিকশিত করো– অন্তরতর হে’
সৈয়দ শামসুল হকের একটি জনপ্রিয় কাব্যনাট্য ‘ঈর্ষা’। সমালোচকরা বলেন, এই কাব্যনাটকের গল্প এতটাই জীবন থেকে জীবনে বিস্তৃত আর দ্বন্দ্ব–সংঘাতে মুখর, যা বর্ণনাতীত। সেই সঙ্গে আছে মানুষের সঙ্গে মানুষের এবং শিল্পীর সঙ্গে শিল্পীর প্রেম, ভালোবাসা; আছে মানব জীবনের আরেক অপরিহার্য এবং অত্যন্ত গোপন বিষয়– শারীরিক সম্পর্কের কথা। সৈয়দ শামসুল হক বলে গিয়েছিলেন, ‘প্রেম যদি প্রতারণা করে শিল্প দেবে আমাকে আশ্রয়। আমার শিল্পের হাত কেড়ে নেয় আছে সাধ্য কার?’
ঈর্ষা কিংবা হিংসা মূলত মানসিক রোগ। চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণা উঠে এসেছে : ‘ঈর্ষা, হিংসা ও ঘৃণা মানুষকে নানা ভাবে অশান্ত করে তোলে, কুড়ে কুড়ে খায়, স্ট্রেস তৈরি করে। এক কথায় এগুলো মানুষকে ভয়াবহ অসুস্থ করে তোলে। এমনকি পাগলও করে দিতে পারে।’ এই হিংসা বা ঈর্ষা চিরকালীন। এটি মানুষের একটি সহজাত প্রবণতা। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে চলছে তার ক্রিয়া–প্রতিক্রিয়া। কেউ আপনাকে ঈর্ষা করবে এটাই খুব স্বাভাবিক। মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, ‘আপনি কি সফল? পেশাগত সাফল্যে, পারিবারিক সুখে, আত্মিক শান্তিতে আপনি তৃপ্ত? চারপাশে তাকিয়ে দেখার সময় আপনার হয় না? তাহলেই আপনার প্রতি অন্যের ঈর্ষা বাড়বে।’ কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মনে হয় একটু বেশিই প্রত্যক্ষ করছি আমরা। বিশেষ করে লেখালেখির জগতে ঈর্ষা এতোটা প্রকাশ্যে প্রদর্শন চলছে, তাতে অসুস্থ বোধ করা স্বাভাবিক। নির্মলেন্দু গুণ তাঁর ‘স্বাধীনতা, এই শব্দটি কিভাবে আমাদের হল‘ কবিতায় লিখেছিলেন : কবির বিরুদ্ধে কবি,/ মাঠের বিরুদ্ধে মাঠ,/ বিকেলের বিরুদ্ধে বিকেল,/ উদ্যানের বিরুদ্ধে উদ্যান,/ মার্চের বিরুদ্ধে মার্চ …। একজন লেখক লিখছেন অন্য লেখকের বিরুদ্ধে। গোপনে নয়, প্রকাশ্যে। তাতে প্রকাশ পাচ্ছে মারাত্মক রকমের হিংসা। যা ক্ষতিকর। আমরা জানি, লেখালেখির জগতটা খুবই পিচ্ছিল, যা কখনোই পুরোপুরি মসৃণ ছিল না। একজন লেখককে অনবরত সংগ্রাম করে পথ এগোতে হয়। লড়াই করতে হয় সমাজের সংকীর্ণতা, কুসংস্কার ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয় নিজের আদর্শকে সম্বল করে। সাম্প্রতিক সময়ে একজন লেখককে শুধু এসবের সঙ্গে লড়াই করলেই হয় না; তাকে লড়তে হচ্ছে অন্যের বিরোধিতা ও ঈর্ষার সঙ্গে। লড়তে হচ্ছে দলবাজির সঙ্গে। লড়তে হচ্ছে পক্ষপাত ও অবমূল্যায়নের সঙ্গেও। ব্যক্তিগত আক্রমণ বা কটূক্তি যখন দৃশ্যমান হয়, তখন খারাপ লাগে। বিঘ্ন ঘটে সাহিত্যের উদ্দেশ্য সাধনে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন, সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য হলো সত্য ও ধর্ম। তাঁর মতে, ‘খ্যাতি বা অর্থ অর্জনের জন্য সাহিত্য নয়, বরং মানুষের কল্যাণ সাধন, নৈতিকতা রক্ষা ও সৌন্দর্য সৃষ্টিই সাহিত্যের কাজ।’ আমাদের সবসময় মনে রাখা দরকার, মানুষের কল্যাণ সাধন ও সৌন্দর্য সৃষ্টিই সাহিত্যের কাজ। যেখানে মানুষের অমঙ্গল, সেখান থেকে দূরে থাকা শ্রেয়।
সবচেয়ে দুঃখ লাগে তখন, রবীন্দ্রনাথও যখন এই আক্রমণের শিকার। ঢাকা শিল্পকলা একাডেমির সামনে তাঁর প্রতিকৃতিতে কালিমা লেপন কিংবা তাঁকে ঘিরে অবমাননাকর বক্তব্য, তাঁর সম্পর্কে পুরোনো–অপ্রমাণিত অভিযোগ নতুন করে প্রচার–এসবের মধ্যে একজন প্রাতঃস্মরণীয় কবির প্রতি অশ্রদ্ধা প্রকাশ দুঃখজনক ও রীতিমতো অপরাধও। কেননা রবীন্দ্রনাথ শুধু একজন কবি নন, তিনি বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংগীতের অনন্য সত্তা। তিনি আমাদের আশ্রয়। বাংলা সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই যে, তিনি হাত রাখেন নি। আর, হাত রাখার সাথে সাথে বেরিয়ে এসেছে সোনায় মোড়ানো একেকটি জিনিস। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ছড়া, নাটক, সংগীত –কোনোটাই তাঁর অচর্চিত নয়, যা–ই ধরেছেন, পরিণত হয়েছে স্বর্ণে এবং সেজন্যে তিনি সবার গুরু হয়ে আসীন আছেন তাঁর আসনে, দীক্ষা দিচ্ছেন কবিতায়, দীক্ষা দিচ্ছেন গল্পে, প্রবন্ধে, ছড়ায় ও অন্য মাধ্যমে।
রবীন্দ্রনাথ আমাদের মনে জ্বালিয়ে দিয়েছেন কল্পনার আলো। আমরা কবিতা পড়তে ভালোবাসি। কবিতা পড়তে পড়তে আমরা প্রায় চতুর্দিকে দেখি কবিতাকে। কবিতাকে কখনো আমরা এড়াতে পারি না, আলাদা হতে পারি না কবিতা থেকে এবং তাই কখনো, কোন সময়েই আলাদা হতে পারি না রবীন্দ্রনাথ থেকেও। এমন পরিস্থিতিতে এই লেখাতেও আমি আশ্রয় নিলাম রবীন্দ্রনাথের :
‘কণ্ঠ আমার রুদ্ধ আজিকে, বাঁশি সংগীতহারা,
অমাবস্যার কারা
লুপ্ত করেছে আমার ভুবন দুঃস্বপনের তলে,
তাই তো তোমায় শুধাই অশ্রুজলে–’
২.
বাঙালি শিশুর জন্য শিশুপাঠ কেমন হওয়া উচিত–সেই পথ প্রথম দেখালেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সহপাঠী বন্ধু মদনমোহন তর্কালঙ্কার। ১৮৪৯ সালে ‘শিশু শিক্ষা’ গ্রন্থমালা লিখে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। এই বইয়ে প্রচুর নীতিশিক্ষা রয়েছে। তবে কোনো বিশেষ ধর্মীয় নীতিবোধের চেয়ে সর্বজনীন মূল্যবোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিশুসাহিত্য সে হিসেবে আনন্দ আর শিক্ষার অপূর্ব সমন্বয়। প্রমথ চৌধুরী বলেছেন, ‘শিশুসাহিত্য আনন্দের আশ্রয়ে চরিত্রগঠন ও শুভবুদ্ধির সঞ্চার মাতৃস্নেহ, পিতৃনিয়ন্ত্রণ এবং খেলার সাথীর সাহচর্য–এই তিনটির উপরেই নির্ভর করে’। শিশুসাহিত্য গবেষকদের নানা মতকে আমরা যদি বিশ্লেষণ করি, তাহলে এই ধারণায় উপনীত হওয়া যায় যে শিশুসাহিত্য হলো ছোটোদের এক রঙিন জগৎ। তাদের মনে বিশুদ্ধ আনন্দরস সঞ্চারের জন্য যে সাহিত্য রচনা করা হয়। যে রচনা পড়ে ছোটোরা মজা পায়, আনন্দ পায়, পরিতৃপ্ত হয়। কিন্তু শিশুসাহিত্যের পাঠক কেবল কি ছোটোরাই? শিশুসাহিত্য একান্তভাবে ছোটোদের জন্য লেখা হলেও সব বয়সের পাঠকের কাছেই তা পরম আস্বাদ্য। বুদ্ধদেব বসু অনেক আগেই বলেছেন, ‘এমন মত পোষণ করা সম্ভব যে শিশুসাহিত্য স্বতন্ত্র কোনো পদার্থ নয়, কেননা তা সত্যিকার সাহিত্য হলে বড়রাও তাতে আনন্দ পান’। আশা গঙ্গোপাধ্যায়ও ‘শিশুসাহিত্যের স্বরূপ’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ‘যথার্থ শিশুসাহিত্য বলিতে তাহাই বুঝিব, যাহা সর্ব্ব বয়সের নরনারীর কাছেই একটি রসাস্বাদ আনিয়া দেয়, বয়সের পার্থক্য অনুসারে আস্বাদনের ব্যাপারে কিছু বিভিন্নতা ঘটিতে পারে–কিন্তু সর্ব্বস্তরের মানুষকে আনন্দ দান করিবার মত শিল্পগুণ তাহাতে থাকিবেই।’ ছোটোদের রুচি গঠন ও মানবিক মূল্যবোধ তৈরিতে সহায়ক এমন রচনাই আমাদের কাম্য। আমাদের দেশে এই শিশুসাহিত্যের ব্যাপক চর্চা হচ্ছে। ভালো লাগছে। এই প্রবহমান ধারাকে আরো সুসংহত করতে এবং আমাদের রচনাকে আরো সমৃদ্ধ করতে আমরা নানা সময়ে নানা আয়োজন করে থাকি। তার ধারাবাহিকতায় প্রতি বছরের মতো আগামী ৩০ ও ৩১ অক্টোবর ২০২৬ (শুক্র ও শনিবার) চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমির গ্যালারি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে দুদিনব্যাপী ‘শিশুসাহিত্য উৎসব ২০২৬’। বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য একাডেমি আয়োজিত এই উৎসবে থাকছে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, লেখা পাঠ, শিশু–কিশোর সমাবেশ, শিশু–কিশোর আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, শিশুসাহিত্যিক সম্মাননা, গ্রন্থ–সুহৃদ সম্মাননা প্রভৃতি। এবারের ‘বাংলাদেশ শিশুসাহিত্য একাডেমি সম্মাননা ২০২৬’ পাচ্ছেন দেশের তিন কৃতী লেখক। তাঁরা হলেন: শিশুসাহিত্যিক দিলারা মেসবাহ (১৯৫০), দীপংকর চক্রবর্তী (১৯৫১) ও ওবায়দুল সমীর (১৯৬৭)। ‘গ্রন্থ–সুহৃদ সম্মাননা’ পাচ্ছেন বাঁশখালী বাহারচরা রত্নপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও উপকূলীয় ডিগ্রি কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও শিক্ষা–সংগঠক মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান।
উৎসবের বিভিন্ন পর্বে অতিথি থাকছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত ১২ লেখক। তাঁরা হলেন : হরিশংকর জলদাস (২০১২ সাল), সুজন বড়ুয়া (২০১৫ সাল), মারুফুল ইসলাম (২০১৭ সাল), রহীম শাহ (২০১৯ সাল), আনজীর লিটন (২০২০ সাল), বিশ্বজিৎ চৌধুরী (২০২১ সাল), ঝর্না রহমান (২০২১ সাল), রফিকুর রশীদ (২০২১ সাল), মুহাম্মদ শামসুল হক (২০২২ সাল), তপন বাগচী (২০২৩ সাল), জি এইচ হাবীব (২০২৪ সাল), ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী (২০২৫ সাল)। এ উৎসব উপলক্ষ্যে বেশ কয়েকটি বই প্রকাশিত হচ্ছে। তন্মধ্যে রয়েছে– দীপক বড়ুয়ার ‘রাঙা পায়ে বিকেল চলে’, সৈয়দ জিয়াউদ্দীনের ‘জুম সবুজের পাহাড়ে’, ইফতেখার মারুফের ‘পাক্কা রাঁধুনি’ চন্দ্রশিলা ছন্দার ‘শ্রাবণ দিনের চিঠি’, ইসমাইল জসীমের ‘গুহার ভেতর একদিন’, কাসেম আলী রানার ‘বাবার জন্য লাল গোলাপ’ লিটন কুমার চৌধুরীর ‘ঘুঘু ডাকা রোদের দুপুর’, সুবর্ণা দাশ মুনমুনের ‘পকেটে তার হাওয়াই মিঠাই’, কানিজ ফাতিমার ‘ঘাসের ডগায় শিশির নাচে’, রূপক কুমার রক্ষিতের ‘তারুণ্য ও সফলতার স্বপ্ন’, ফারহানা ইসলাম রুহীর ‘জঙ্গলে রহস্যময় পাহারাদার’, রাসু বড়ুয়ার ‘নীল নীলিমায় রঙিন ঘুড়ি’, জি এম জহির উদ্দীনের ‘মেঘের দেশে সূর্য হাসে’, ইলিয়াছ হোসেনের ‘আমায় ডাকে সন্ধ্যাতারা’, জোনাকি দত্তের ‘দুরবিন মামার চাঁদ দেখা’, অরুণ শীলের ‘চট্টগ্রামের শিশুসাহিত্য’, মারুফুল ইসলামের ‘টুইক টুইক বেড়ালছানা’, রুনা তাসমিনার ‘সোনালি জানালার রহস্য’ ও রাশেদ রউফ–এর ‘চট্টগ্রামের ছড়া কবিতা পুঁথি ও অন্যান্য। এছাড়া এ উৎসবে প্রকাশিত হচ্ছে রাশেদ রউফ সম্পাদিত সংকলন ‘শিশুসাহিত্য’ এবং নিজামুল ইসলাম সরফী সম্পাদিত ‘সুকুমার বড়ুয়া স্মারকগ্রন্থ’। দু’দিনব্যাপী শিশুসাহিত্য উৎসবকে ঘিরে এতোসব আয়োজন সত্যিই আনন্দের। এটা শিশুসাহিত্যিকদের জন্য স্বপ্নের আয়োজন। সবার যোগে সফল হোক উৎসব।
লেখক : সহযোগী সম্পাদক, দৈনিক আজাদী; ফেলো, বাংলা একাডেমি।












