এখন কেউ কাউকে সম্মান করতে চায় না। সম্মানিত ব্যক্তিরাও সম্মান পায় না। গুণীজনদের সম্মান করতেও অনীহা। গুরুজনেরাও সম্মান থেকে দূরে থাকে। বয়োজ্যেষ্ঠদের কথা ভাবা যায় না। বড়রা ছোটদের কাছ থেকে সম্মানের আশা করে না। মানী লোকেরা মান সম্মানের ভয়ে থাকে। জ্ঞানীরাও কম ভয়ে থাকে না। জ্ঞানী গুণী সবাই সম্মান নিয়ে ভাবনায় থাকে। কথায় আছে মানীর অপমান বজ্রাঘাততুল্য। বজ্রঘাত কেউ সহ্য করতে পারে না। অনেকের মৃত্যু হয়। অপমান ও অসম্মান সহ্য করা যায় না। মরে যাওয়ার কথা। তারপরও বেঁচে থাকতে হয়। সহ্য করে বাঁচতে হয়। সবকিছু ভূলুণ্ঠিত হওয়ার পরও বেঁচে থাকে। মান সম্মান বলে আর কিছু থাকে না। তারপরও বেঁচে থাকে।
একে অন্যকে সম্মান না করা এককথা। আবার অন্যকে অসম্মান করা আরেক কথা। তবে সম্মান না করার প্রবণতা সর্বত্র। এমন এক ধারণা সম্মান না করলে কী হয়। এতে করে সম্মান না করার মানসিকতা দিন দিন বেড়ে যায়। সম্মান না করলে কিছু যায় আসে না, এ ধরনের মানসিকতা গড়ে ওঠে। অনেকের সম্মান করার প্রতি অনীহা তৈরি হয়। আরেক জনকে সম্মান করলে নিজেও যে সম্মানিত হয় এ কথা আর বোধগম্য হয় না। এরকম কথা শুনলেও তা আর গ্রহণযোগ্য মনে করে না। কেউ কেউ আবার নীতিকথা মনে করে। নীতিবাক্য অনেকে বলে কিন্তু কেউ মেনে চলে না।
অন্যকে সম্মান না করার প্রবণতা অসম্মানের দিকে নিয়ে যায়। সম্মান পাওয়ার যোগ্য কাউকে যথাযথ সম্মান না দেখানো অনেকটা অসম্মান করার মতো। এজন্য সম্মানিত ব্যক্তিকে সম্মান দেখাতে হয়। এটা শুধু সামাজিক রীতিনীতি নয়। মানবিক মূল্যবোধও এর সাথে সম্পৃক্ত। একসময়ে শিক্ষকদের আলাদা মর্যাদা ছিল। সমাজের সবাই তাদের সম্মানের সাথে দেখতো। সম্মান দিয়ে কথা বলতো। শিক্ষকদের জ্ঞানী গুণী মনে করতো। অনেকে তাদের কাছ থেকে পরামর্শ নিতো। এখন এসব কিছু নেই। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মানে না। সম্মান দেখায় না। সুযোগ পেলে অসম্মান করে। অপদস্থ করে, অপমান করে। এমনকি লাঞ্ছিত করে। পদত্যাগে বাধ্য করে।
এখন সম্মান না দেখিয়ে এক ধরনের আনন্দ পায়। আবার অসম্মান করে তার চেয়ে বেশি পায়। বিশেষ করে সম্মানিত কাউকে অসম্মান করার মাঝে কেমন যেন মজা পায়। সম্মানিত ব্যক্তির সাথে তামাশা করতে স্বাচ্ছন্দবোধ করে। শুধু অসম্মান নয় অপমান করতেও দ্বিধাবোধ করে না। নিজে না করলেও অন্য কেউ করলে তাতে তৃপ্তি পায়। মানী লোককে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার মধ্য দিয়ে যেন নিজেদের সমান করতে চায়। নিজেদের কাতারে নিয়ে আসতে চায়। এরা যে সমাজের সম্পদ তা আর ভাবতে পারে না। কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করলে যে তিনি হেয় হয়ে যাবেন, এমন ধারণা থেকে করে থাকে। এতে নিজেরা যে হেয় প্রতিপন্ন হয়ে পড়ে একথা বুঝার মতো সক্ষমতা তখন কারো থাকে না। যারা বুঝতে পারে তারা অসহায় নিরূপায় হয়ে বসে থাকে।
কলেজ ভার্সিটিতে আগে জুনিয়ররা সিনিয়রদের সম্মান করতো। সিনিয়ররা যেখানে বসতো জুনিয়ররা সেখানে যেতো না। এখন সিনিয়র জুনিয়র বলে কিছু নেই। কেউ কাউকে সম্মান করে না। যে যার মতো চলে। বিভিন্ন পদধারীরা পদে না থাকলে সম্মান পায় না। পদে থাকলেও সুযোগ পেলে অধস্তনরা অসম্মান করে। নাজেহাল করতে চায়। অপমান করে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। এমন সব অপবাদ দিতে থাকে যাতে লোকটির অসম্মান হয়। অফিস আদালত বিভিন্ন সেক্টরে এরকম ঘটনার শিকার হয় অনেকে। এর কোনও প্রতিকার নেই। উধ্বতন বা অধস্তন বলে কথা নেই। সহকর্মীরা কেউ কাউকে সম্মান করে না। ভুল ভ্রান্তি দোষ ত্রুটি নিয়ে একজন আরেকজনকে হেয় করতে চায়। একজন অন্যজনের পেছনে লেগে থাকে। কিভাবে অসম্মান করা যায় সে পথ খুঁজে বের করে। এতে করে পারস্পরিক যে সহমর্মিমতা তা আর থাকে না। একে অপরের প্রতি সহনশীল না হয়ে বৈরি ভাবাপন্ন হয়ে ওঠে। কাজ কর্মও আর ঠিকমতো চলে না।
কেউ আজীবন কর্মময় থাকতে পারে না। একটা নির্দিষ্ট সময়ের পর চাকরিজীবীদের অবসর নিতে হয়। ব্যবসায়ী ও অন্যান্য পেশার লোকজনকে অবসরে যেতে হয়। কর্ম থেকে দূরে সরে যেতে হয়। স্বাভাবিকভাবে এসব মানুষের গুরুত্ব কমে যায়। যে যে পদে থাকুক না কেন অবসরের পর আর পদমর্যাদা থাকে না। সাধারণ পদে যারা থাকে তাদের তেমন অসুবিধা হয় না। তারা পরিবার পরিজন নিয়ে নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু যারা উপরের পদে থাকে তারা কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে যায়। তারা আগের মতো ব্যস্ততায় থাকে না। অফিস নেই, কাজ কর্ম নেই। হঠাৎ করে কাজকর্মহীন হয়ে পড়ায় নিজেকে বেকার মনে হয়। দীর্ঘ এতো বছর অফিসে যাওয়া আসা করে কাজ কর্মে ব্যস্ত থাকে। আবার একদিনে সবকিছু থেমে যাওয়ায় কেমন যেন লাগে। নিজেকে গুরুত্বহীন বলে মনে হয়। অবসরে থাকে বলে কেউ আর কাছে আসে না, তেমন খোঁজ খবর নেয় না। কেউ আর সম্মান করে না।
শিক্ষক সবসময় শিক্ষক। অবসরে গেলেও শিক্ষকের মর্যাদা থেকে যায়। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে তা হয় না। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অবসরে যাওয়ার পর নিজেদের আর শিক্ষক মনে করতে পারেন না। শিক্ষকরা শিক্ষকতা ছাড়াও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করে থাকেন। কেউ প্রিন্সিপালের, কেউ প্রভোস্টের, কেউ ডীনের, কেউ ভিসির দায়িত্ব পালন করেন। এখানেও মান সম্মানের প্রশ্ন আসে। অনেকে সম্মান নিয়ে দায়িত্ব শেষ করতে পারেন না। অপমান অপদস্তের ঘটনা ঘটে। নানামুখী চাপের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয়। কাজের মধ্যে স্বাভাবিকতা না থাকলে অনিয়মের সম্ভবনা থাকে বেশি। স্বচ্ছতার অভাব হয়ে যায়। বিভিন্ন কারণে শিক্ষকরাও আর মর্যদা ধরে রাখতে পারে না। মান সম্মান নিয়ে শিক্ষকতা শেষ করতে পারে না।
সমাজে সবচেয়ে বেশি সম্মানিত বিচারপতিরাও। বিচারকদের আসন সবার উপরে। তাদের সংখ্যা একেবারে হাতে গোনা। সাধারণের সাথে তাদের সরাসরি যোগাযোগ তেমন হয় না। বিচারকরা যেখানে সেখানে যেতে পারে না। যেখানে সেখানে বসতে পারে না। এমনকি সবার সাথে মিশতেও পারে না। অনেক ধরা বাঁধা নিয়মের মধ্য দিয়ে তাদের চলতে হয়। বিচারকদের নিয়েও সমালোচনা হয়। ন্যায় বিচার নিয়েতো আলোচনার শেষ নেই। সবাই ন্যায় বিচারের কথা বলে। আসলে বিচার মানে ন্যায় বিচার। ন্যায় বিচার নিশ্চিত করা না হলে তা আর বিচার হয় না। হয়ে যায় অবিচার। এজন্য বিচারকরা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। মান সম্মানের প্রশ্ন তাদেরও আছে। সম্মানের জায়গায় বসে অসম্মানের সম্ভাবনাও থাকে। সম্মান যাদের বেশি থাকে হারানোর ভয়ও বেশি তাদের। পরবর্তীতে বিচারকদের অসম্মানের মুখোমুখি হতে হয়।
অনেকে মনে করে আমলারা নিরাপদে থাকে। তাদের অসম্মান করা যায় না। তারা নিজেদের সুরক্ষা করতে পারে। আমলাতন্ত্র ভেদ করে তাদের সহজে পাওয়া যায় না। তবে আমলারাও অসম্মানিত হয়। অবসরের আগেও হয়, পরেও হয়। মানুষ সম্মান যেভাবে করে আবার অসম্মান সেভাবে করে। ডাক্তার, প্রকৌশলী, আইনজীবী ও অন্যান্য পেশাজীবীর ক্ষেত্রে মান সম্মানের হিসাব চলমান থাকে। কেউ রেহাই পায় না। আলেম ওলেমা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধর্মগুরুরাও সম্মান অসম্মানে পতিত হয়। মানুষ মবতন্ত্রের শিকার হয়। দেশের সর্বোচ্চ পদের অধিকারী রাষ্ট্রপতিকেও সম্মান নিয়ে ভাবতে হয়। যদিওবা তিনি সবচেয়ে বড় সম্মানের অধিকারী। তাকে নিয়েও সমালোচনার শেষ নেই। অযাচিত সমালোচনা সবচেয়ে বেশি হয়। ভালো দিকগুলোর আলোচনা হয় না। অনেকে দুর্বল দিকগুলোর সমালোচনা করে বেশি। পদে থাকলে মহামান্য, পদ থেকে সরে গেলে হয়ে যায় অমান্য। পদ আর ব্যক্তি এককথা নয়। ব্যক্তি ছাড়া পদের কোন মূল্য নেই। আসলে সম্মানিত ব্যক্তিদের সম্মান করলে নিজেরা সম্মানিত হয়। সবার এ সত্য অনুধাবন করা প্রয়োজন।
লেখক: কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও ব্যাংক নির্বাহী।












