দক্ষিণ চট্টগ্রামের অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্যিক কেন্দ্র লোহাগাড়া উপজেলা সদর বটতলী স্টেশন নানা সমস্যায় জর্জরিত। স্থায়ী বাস টার্মিনাল নেই, নেই গণশৌচাগার ও যাত্রীছাউনি। ফুটপাত দখল, সুপেয় পানির সংকট, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ ও দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে ক্রেতা–বিক্রেতা, যাত্রী ও বিভিন্ন কাজে আসা লোকজনকে। দিন দিন এসব সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকার সচেতন মহল।
বাস টার্মিনাল না থাকায় বাড়ছে যানজট : চট্টগ্রাম–কক্সবাজার মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশে অবস্থিত বটতলী স্টেশনে কোনো স্থায়ী বাস টার্মিনাল নেই। ফলে দূরপাল্লার বাসগুলো সড়কের দুই পাশে দাঁড় করিয়েই যাত্রাবিরতি দেয়। চট্টগ্রাম থেকে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে যাওয়া ও সেখান থেকে ফেরার পথে প্রায় সব দূরপাল্লার গাড়ি এখানে ২০ থেকে ২৫ মিনিট অবস্থান করে।
টার্মিনাল না থাকায় বাসগুলো মহাসড়কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট লেগে থাকে। এতে কঙবাজার ও চট্টগ্রামগামী পর্যটকসহ সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। যানজটের কারণে পুরো স্টেশন এলাকার পরিবেশ শ্রীহীন হয়ে পড়ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালে শহরের উপকণ্ঠে পুরাতন বিওসি এলাকায় সড়ক ও জনপথ বিভাগের পরিত্যক্ত জমিতে বাস টার্মিনাল নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে জমিটি মৎস্য চাষের নামে ইজারা দেওয়া হয় এবং সেখানে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে ওঠে।
গণশৌচাগারের অভাবে চরম বিড়ম্বনা : বটতলী স্টেশনে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন সরকারি–বেসরকারি অফিস, ব্যাংক, বীমা কোম্পানি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে কাজের জন্য আসেন। স্টেশন এলাকায় অর্ধশতাধিক মার্কেট, প্রায় চার হাজার দোকান এবং তিন শতাধিক ভাসমান দোকান রয়েছে। কিন্তু এত বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্রে কোনো গণশৌচাগার নেই।
বহু মার্কেটে শৌচাগারের ব্যবস্থা নেই। অনেক রেস্তোরাঁর টয়লেট তালাবদ্ধ থাকে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। দূর–দূরান্ত থেকে আসা লোকজন ও ফুটপাতের দোকানদার–কর্মচারীদের প্রায়ই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়।
কলাউজান থেকে আসা সাবেকুন নাহার জানান, প্রয়োজনীয় কেনাকাটার জন্য প্রায়ই বটতলী স্টেশনে আসতে হয়। কিন্তু গণশৌচাগার না থাকায় বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে চরম সমস্যায় পড়তে হয়। মার্কেট বা রেস্তোরাঁর টয়লেট ব্যবহার করতে গেলে অনেক সময় অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। ব্যস্ত এ স্টেশনে একটি গণশৌচাগার নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মত দেন।
যাত্রী ছাউনি না থাকায় রোদ–বৃষ্টিতে দুর্ভোগ : বটতলী স্টেশনে যাত্রীছাউনি না থাকায় প্রতিদিন হাজারো যাত্রীকে খোলা আকাশের নিচে বাসের অপেক্ষা করতে হয়। বর্ষা মৌসুমে কাদা ও জমে থাকা পানির মধ্য দিয়ে বাসে উঠানামা করতে হয়।
স্টেশনে আসা চরম্বা এলাকার জমির উদ্দিন জানান, যাত্রীছাউনি না থাকায় রোদ, বৃষ্টি কিংবা ঝড়ে যাত্রীদের দোকান ও মার্কেটের সামনে আশ্রয় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এমন গুরুত্বপূর্ণ উপশহরে যাত্রীছাউনি না থাকা দুঃখজনক বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ফুটপাত দখল ও যানজট : স্টেশনের উভয় পাশে ফুটপাত দখল করে গড়ে উঠেছে অসংখ্য অস্থায়ী দোকান ও বিভিন্ন গাড়ির স্ট্যান্ড। ফলে পথচারীদের চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটছে এবং যানজট আরও বাড়ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি মহল এসব অস্থায়ী দোকান ও গাড়ির স্ট্যান্ড থেকে মাসোহারা আদায় করে। মাঝে মধ্যে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হলেও তা স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি। স্টেশনকে যানজটমুক্ত রাখতে ফুটপাত দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
সুপেয় পানির সংকট : এত বড় বাণিজ্যিক কেন্দ্র হলেও বটতলী স্টেশনে সুপেয় পানির নির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা নেই। সরকারি বা বেসরকারিভাবে পানির স্ট্যান্ড স্থাপন করা হয়নি। অনেক মার্কেটেও সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। ফলে ক্রেতা–বিক্রেতা ও দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষকে বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়। বিষয়টি দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
অপরিকল্পিত ভবন ও ড্রেনেজ সংকট : স্টেশন ও আশপাশ এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। কখনো নোংরা পানি সড়কে উপচে পড়ে দোকানে ঢুকে পড়ে, ফলে ব্যবসায়ীদের ক্ষতি হয়। নিয়মনীতি না মেনে ভবন নির্মাণের পাশাপাশি ভূমিকম্প বা অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে নিশ্চিত করা হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগ লোহাগাড়াকে পৌরসভা ঘোষণার প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করে, যা পরদিন গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী নির্ধারিত মৌজাসমূহকে শহর এলাকা ঘোষণার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এ অবস্থায় বটতলী স্টেশনের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তারা চট্টগ্রাম–১৫ (লোহাগাড়া–সাতকানিয়া আংশিক) আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর হস্তক্ষেপ কামনা করে দ্রুত বাস টার্মিনাল নির্মাণ, গণশৌচাগার ও যাত্রীছাউনি স্থাপন, সুপেয় পানির ব্যবস্থা, ড্রেনেজ উন্নয়ন এবং ফুটপাত দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।












