ভৌতবিজ্ঞানের অন্যতম অদ্ভুত পরীক্ষা বলা হয় দ্বি–চিড় পরীক্ষাকে। এই পরীক্ষা এতটাই অদ্ভুত ফলাফল প্রদর্শন করে যে স্বয়ং আইনস্টাইন এই পরীক্ষার ফল মেনে নিতে দ্বিধা করেছিলেন!
তাহলে সেই পরীক্ষাটা একটু ব্যাখ্যা করা যাক। প্রথমে আমাদের জানতে হবে পরমাণু নিয়ে। আমাদের চারপাশে যা কিছু দেখা যায়, তার সবকিছু পরমাণু দিয়ে তৈরি। তাই, সকল পদার্থের ক্ষুদ্রতম অংশ বলা হয় পরমাণুকে। এমনকি বাতাসও একটি পদার্থ। যাহোক, এই পরমাণু তৈরি হয় প্রোটন, নিউট্রন ও ইলেক্ট্রনের মতো কণিকা দিয়ে। প্রোটন ও নিউট্রন পরমাণুর কেন্দ্রে অবস্থান করে এবং এদের একত্রে নিউক্লিয়াস বলে। আর, ইলেকট্রন নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে কক্ষপথে ঘুরতে থাকে ঠিক যেভাবে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে। কিন্তু পরমাণুর কক্ষপথের ব্যাপারটা ভিন্ন। সেটা মাধ্যমিকের রসায়ন বইয়ে জানতে পারবে। তাপ বা চাপ দিয়ে পরমাণুর শেষ কক্ষপথ হতে ইলেকট্রন আলাদা করা যায়। একটি পরমাণুর আকার অনেক ছোট। তাহলে একটি ইলেকট্রনের আকারও সহজে অনুমেয়। মানে, ইলেকট্রন আরো ছোট। আমরা এগুলো চোখে দেখতে পাইনা। কিন্তু, ক্ষুদ্র সেই জগতটিকে ব্যাখ্যা করার জন্য বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন কোয়ান্টাম জগত। দ্বি–চিড় পরীক্ষা সেই জগতেরই একটি পরীক্ষা।
পরীক্ষাটি করার জন্য খুবই ছোট দুটো দেয়াল প্রয়োজন। খুবই পাতলা এবং ছোট দেয়াল। দুটোকে পরপর একটির সামনে আরকটি সাজিয়ে রাখতে হবে। প্রথম দেয়ালে দুটো আয়তকার ছিদ্র থাকবে এবং পরের দেয়ালটি ছিদ্রহীন। ছিদ্রগুলো এমন হতে হবে যাতে তা দিয়ে সহজে ইলেকট্রন যাতায়াত করতে পারে। এবার প্রথম দেয়ালের সামনে একটি এমন যন্ত্র স্থাপন করতে হবে যা দেয়ালের দিকে ইলেকট্রন ছুড়ে দেবে।
এবার পরীক্ষা শুরু করার পালা। প্রথমে একটি ছিদ্র বন্ধ করে ইলেকট্রন ছুড়তে হবে। ফলে অপর ছিদ্র দিয়ে ইলেকট্রন গিয়ে পিছের দেয়ালে দাগ সৃষ্টি করবে। তবে একটু পরে তা ফুটে উঠবে। যাহোক, দাগটা ছিদ্রের আকারেই হবে এবং বরাবর স্থাপিত হবে। এবার আগের ছিদ্র খুলে অপর ছিদ্র বন্ধ করে পরীক্ষাটি করলে একই ফলাফল পাওয়া যাবে। এবার চূড়ান্ত পর্ব। দুটো ছিদ্র খুলে ইলেকট্রন প্রবেশ করালে দেখা যাবে, পিছনের দেয়ালে সুন্দর নকশা তৈরি হয়েছে! এই নকশার বদলে দুটি সোজা দাগ হওয়ার কথা ছিল। এই পরীক্ষা যদি বড় পরিসরে টেনিস বল দিয়ে করা হতো তাহলে দেখা যেত তা পিছের দেয়ালে সোজা দাগ তৈরি করছে। তাহলে কোয়ান্টাম জগতে তা ঘটে না কেন? এখানেই কোয়ান্টাম মেকানিক্সের সৌন্দর্য। সাধারণ জগতের ব্যতিক্রম অনেক ঘটনা এখানে পরিলক্ষিত হয়।
যখন হতে এই পরীক্ষাটির কথা প্রচলিত হলো, অনেক বিজ্ঞানী অনেকভাবে এবং অনেক জায়গায় এই পরীক্ষা করেছেন। কিন্তু, ফলাফল একই। কারণ বিশ্লেষণের চেষ্টাও হয়েছে প্রচুর। তত্ত্বগতভাবে বিশ্লেষণ করে অনেক ধারণা বাদও হয়েছে। দিনশেষে, এই ঘটনার আসল কারণ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। অনেক বিজ্ঞানী অবশ্য এই ধারণার সাথে একমত যে, অনেক ইলেকট্রন একত্রে ছোটার কারণে হয়তো একটি আরেকটির সাথে ধাক্কা খেয়ে এরকম নকশা তৈরি করে। তাই পরে একটি একটি ইলেকট্রন ছুড়ে পরীক্ষাটি করা হয়। তবে ফলাফল একই থাকে। এই কারণে কোয়ান্টাম জগৎ অনেক অদ্ভুত। এই কারণেই তো স্বয়ং আইনস্টাইন এটি মেনে নিতে পারেন নি!
বহু চেষ্টা হচ্ছে কোয়ান্টাম জগতের অদ্ভুত বিষয়গুলো ব্যাখ্যা করার। ইদানিং প্রতিবছর নোবেল পুরষ্কারে ভূষিত পদার্থবিদরা নোবেল পাচ্ছেন এই বিষয়ে ভূমিকা রাখার কারণে। তবুও, প্রকৃতির কিছু জিনিস ব্যাখ্যাতীত হওয়াই সুন্দর।








