অদম্য কন্যা নাধিরা আল হার্থির জীবন, সংগ্রাম এবং অমর অভিযাত্রা

রোকসানা বন্যা | শনিবার , ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ at ১০:০৪ পূর্বাহ্ণ

স্নিগ্ধ মৃত্যু কতো নিঃশব্দে আসে! ২০১৯ সালে প্রথম ওমানি নারী হিসেবে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় ওমানের পতাকা উড়িয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন নাধিরা আল হার্থি। এভারেস্ট জয়ের মাধ্যমে তিনি শুধু নিজের নামেই আলোড়ন তোলেননি, বরং সমগ্র গালফ স্টেটস বা উপসাগরীয় অঞ্চলের অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় নারীদের সামনে এমন এক দিগন্ত উন্মোচন করেছিলেন, যা ছিল কল্পনারও বাইরে। কিন্তু এভারেস্টের হিমশীতল হাওয়া থেকে শুরু করে বিশ্বের অন্যতম ভয়ঙ্কর শৃঙ্গগুলো জয় করা এই নারী শেষ পর্যন্ত কারাকোরাম পর্বতমালার তুষারঝড়ে প্রাণ হারান। নাধিরা আল হার্থি সহ ১০ অভিযাত্রীর এই চিরবিদায় পর্বতপ্রেমী গোটা বিশ্বের হৃদয়ে দীর্ঘ এক বেদনার গল্প হয়ে থাকবে।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজকাঠামো এবং রক্ষণশীল প্রথাগত পরিবেশের বেড়াজাল ভেঙে নারীদের এগিয়ে চলার ইতিহাস সব সময়ই কন্টকাকীর্ণ। যখন সেই এগিয়ে চলা সাধারণ গণ্ডি পেরিয়ে আকাশচুম্বী পাহাড়ের চূড়ায় কিংবা বরফাবৃত দুর্গম উপত্যকায় পদচিহ্ন আঁকে, তখন তা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য হয়ে উঠে না, তা হয়ে ওঠে সামগ্রিক নারীর মুক্তি ও সাহসের এক অনন্য রূপক। পুরুষতান্ত্রিক ক্রীড়াঙ্গন কিংবা পর্বতসংকুল অভিযাত্রার দুনিয়ায় নারীদের এই পথচলা কখনোই সহজ ছিল না। পদে পদে সামাজিক রক্ষণশীলতা, শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে অবমূল্যায়ন এবং মানসিক শক্তির কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয় তাঁদের।

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থায় নারীদের জন্য খেলাধুলা বা অ্যাডভেঞ্চারের জগৎ একসময় ছিল প্রায় অসম্ভব এক কল্পনার বিষয়। পারিবারিক ও সামাজিক অনুশাসনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সেই অচলায়তন ভাঙতে হয়েছে অদম্য জেদ, ধৈর্য আর ত্যাগের বিনিময়ে। প্রথাগত পোশাকের কঠোর সীমাবদ্ধতা, ঘরের বাইরের দুনিয়ায় একা পা রাখার সামাজিক নিষেধাজ্ঞা এবং পুরুষ সহকর্মীদের সমকক্ষ প্রমাণ করার অবিরাম মানসিক লড়াই সব মিলিয়ে একজন নারীর অভিযাত্রী হয়ে ওঠার প্রতিটি পদক্ষেপে থাকে রক্তের অক্ষরে লেখা সংগ্রামের ইতিহাস। এই কঠিন পথ পেরিয়ে যাঁরা নিজেদের অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান, নাধিরা আল হার্থি ছিলেন তাঁদেরই একজন উজ্জ্বল ও দীপ্তিময় নক্ষত্র।

নাধিরা আল হার্থির পুরো নাম নাধিরা বিনতে আহমেদ আব্দুল্লাহ আল হার্থি। ওমানের ঐতিহ্যবাহী ও সম্মানিত পরিবারে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। তাঁর পিতার নাম আহমেদ আব্দুল্লাহ আল হার্থি। রক্ষণশীল পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে নিজের স্বপ্নকে বড় করার পেছনে তাঁর পারিবারিক মূল্যবোধ এবং নিজস্ব মানসিক দৃঢ়তা গভীরভাবে কাজ করেছিল।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রে নাধিরা ছিলেন যথেষ্ট মেধাবী ও মননশীল। তিনি ওমানের স্বনামধন্য রুসতাক কলেজ অব এডুকেশন থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং পরবর্তীতে ভূগোল বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ভূগোল বিষয়ের প্রতি তাঁর এই গভীর একাডেমিক অনুরাগই হয়তো পরবর্তীতে তাঁকে প্রকৃতির কাছাকাছি নিয়ে যেতে এবং পাহাড়ের দুর্গম পথগুলোকে জয় করতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করে তিনি কিছুদিন শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এরপর তিনি ওমানের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে একজন নিবেদিতপ্রাণ সরকারি কর্মকর্তা বা সিভিল সার্ভেন্ট হিসেবে যোগ দেন। সরকারি কর্মজীবনে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন এবং মন্ত্রণালয়ের নাগরিকত্ব বিভাগের পরিচালক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পেশাগত দায়িত্বের শত ব্যস্ততা এবং কাঠখোট্টা প্রশাসনিক কাজের ফাঁকেই তিনি নিজের ভেতরের অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় মনটাকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন এবং পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার অসম্ভব স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছিলেন।

শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরির গণ্ডি পেরিয়ে নাদিরার জীবন মোড় নেয় অন্য এক রোমাঞ্চকর ঠিকানায়। ২০১৯ সালের ঐতিহাসিক সেই ক্ষণে তিনি যখন মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখেন, তখন সেটি ছিল ওমানের কোনো নারীর জন্য প্রথম এভারেস্ট জয়। এই অর্জনের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, ভৌগোলিক পরিচয় বা লিঙ্গ কোনো মানুষের স্বপ্ন পূরণের পথে স্থায়ী বাধা হতে পারে না।

এভারেস্ট জয়ের পর তিনি আর পেছনে ফিরে তাকাননি। একের পর এক অসম্ভবকে সম্ভব করার নেশায় তিনি জয় করেছিলেন বিশ্বের উচ্চতম ও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শৃঙ্গগুলো। এর মধ্যে রয়েছে পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এবং অত্যন্ত দুর্গম পর্বত কেটু , অদম্য মানসিকতার পরিচয় দিয়ে জয় করা মানাসলু এবং পর্বতারোহীদের কাছে ‘কিলার মাউন্টেন’ বা খুনি পাহাড় নামে পরিচিত নাঙ্গা পর্বত। প্রতিটি পাহাড় জয়ের মাধ্যমেই তিনি বিশ্বের দরবারে আরব নারীদের নতুন এক পরিচয় তুলে ধরেছিলেন।

পাহাড় মানুষের মন কেড়ে নেয়, আবার মাঝেমধ্যে কেড়ে নেয় তার জীবনও। পর্বতারোহণের দুনিয়ায় এটি এক নির্মম ও চিরন্তন সত্য। নাধিরা আল হার্থির মতো অভিজ্ঞ ও নির্ভীক অভিযাত্রীর জীবনের শেষ অধ্যায়টিও লেখা হয়েছিল প্রকৃতির এমন এক দুর্নিবার ও নিষ্ঠুর খেয়ালে। কারাকোরাম পর্বতমালার দুর্গম উচ্চতায় এক আকস্মিক ও সর্বগ্রাসী তুষারঝড় সবকিছু ওলটপালট করে দেয়। মুহূর্তের ব্যবধানে বাতাসের তীব্রতা আর বরফের প্রবল ধস জয়ের নেশায় ছুটে চলা অভিযাত্রীদের পথ রোধ করে দাঁড়ায়।

প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সামনে মানুষের লড়াই সেদিন হার মেনেছিল। নাধিরা আল হার্থিসহ ১০ জন অভিযাত্রী কারাকোরামের সাদা বরফের চাদরে চিরতরে হারিয়ে যান। যে পর্বতশৃঙ্গগুলোকে তিনি ভালোবেসেছিলেন নিজের ঘরের চেয়েও বেশি, শেষ পর্যন্ত সেই পাহাড়গুলোই হয়ে উঠল তাঁর স্থায়ী ঠিকানা। তুষারঝড়ের সেই কালো রাত পর্বতপ্রেমী গোটা বিশ্বের বুকে এঁকে গেছে এক গভীর ও অপূরণীয় শূন্যতা।

এই মর্মান্তিক পরিণতি কেবল ওমান বা উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে অ্যাডভেঞ্চার ও সাহসিকতার জগতে এক অপূরণীয় ক্ষতি। নাধিরা আল হার্থিও প্রস্থান একাধারে যেমন বেদনার্ত, তেমনি সেটি এক বিশাল অনুপ্রেরণার গল্প। তিনি প্রমাণ করে গেছেন যে, জীবন দীর্ঘ হওয়ার চেয়ে বড় কথা হলো তা কতটা অর্থবহ ও সাহসিকতাপূর্ণ ছিল। কারাকোরামের হিমশীতল বাতাসে তাঁর শারীরিক উপস্থিতি হয়তো হারিয়ে গেছে, কিন্তু তাঁর সেই অদম্য জেদ, বরফজয়ের রোমাঞ্চকর স্মৃতি এবং ওমানের পতাকা উড্ডীন করার বীরত্বগাথা আগামী প্রজন্মের নারী অভিযাত্রীদের হৃদয়ে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।

পূর্ববর্তী নিবন্ধবিভিন্ন স্থানে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) মাহফিল
পরবর্তী নিবন্ধমেয়েরা স্কুলে ভর্তি হচ্ছে, কিন্তু সবাই কি সমানভাবে এগোতে পারছে?