‘হে নূতন, দেখা দিক আর বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ’–রবীন্দ্রনাথের এই পঙ্ক্তিটি অক্টোবর এলেই কেন যেন আমার মনে গভীরভাবে অনুরণিত হয়। আমাদের পরিবারে অক্টোবর মাসের আগমন হতো নির্মল এক আনন্দের বার্তা নিয়ে। মাসের একেবারে শুরুতেই তুলা রাশির জাতক বাবাকে ঘিরে থাকত আমাদের একান্ত পারিবারিক ছোট্ট কিছু আনন্দের আয়োজন। তাঁর বিশেষ দিনটিকে ঘিরে বাড়িতে থাকত এক ধরনের প্রফুল্লতার আমেজ। খুব ঘটা করে উদযাপন না হলেও, এ মাসটি আমার কাছে বিশেষভাবে প্রিয় ছিল আরও অনেক আনুষঙ্গিক কারণে।
শরতের শুভ্র সাজে যেন বাংলার চিরায়ত কোমল রূপটি পূর্ণতা পায় অক্টোবরে। আজ বিদেশের মাটিতে বসে সেই রূপটিকে বড় বেশি অনুভব করি। মনে পড়ে মৃদুমন্দ বাতাসে সাদা কাশফুলের ঢেউ খেলে যাওয়ার দৃশ্য, মনে পড়ে ভোরের শিশিরে ভেজা শেফালি ফুলের মিষ্টি ঘ্রাণ। আমার মা ছিলেন ভারী পুষ্পপ্রেমী। প্রতিদিন সকালে বাগান থেকে শিউলি ফুল কুড়িয়ে এনে একটি ছোট্ট কাচের বাটিতে করে ঘরে সাজিয়ে রাখতেন। সেই সুবাসে চারপাশ ম–ম করত। সেই ঘ্রাণ আজও আমার স্মৃতিকে বিমোহিত করে।
অক্টোবরের আরেকটি সেরা আকর্ষণ ছিল বার্ষিক শারদীয় দুর্গোৎসব। সারা বছর আমরা অপেক্ষা করে থাকতাম এই সময়টির জন্য। সত্যজিৎ রায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, বিমল কর – প্রিয় সব লেখকের নতুন লেখা পড়ার জন্য আমরা মুখিয়ে থাকতাম। চট্টগ্রামের প্রসিদ্ধ কারেন্ট বুক স্টলে বাবা আগাম অর্ডার দিয়ে রাখতেন আনন্দমেলা, দেশ, কিশোর ভারতীসহ বিভিন্ন পত্রিকার পূজা সংখ্যা। বাসায় বইগুলো আসার পর রীতিমতো কাড়াকাড়ি পড়ে যেত কে আগে পড়বে তা নিয়ে। পাতা উল্টিয়ে রঙিন অলংকরণগুলি দেখতে দেখতে হারিয়ে যেতাম কল্পনার রাজ্যে। ছেলেবেলার সেই দিনগুলি কখনো বিস্মৃত হবার মতন নয়।
সেই সময়কে ঘিরে আরেকটি স্মৃতি আজও উজ্জ্বল। পূজায় যেদিন সরকারি ছুটি থাকত, বাবা সেদিন আমাদের নিয়ে মণ্ডপে ঘুরতে বের হতেন। প্রথমে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণের পূজা মণ্ডপ, তারপর চট্টেশ্বরী রোডের মন্দির – এই ছিল আমাদের চেনা পথ। চট্টেশ্বরী মন্দিরের সঙ্গে বাবার নিজের বাল্যকালের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে ছিল। প্রতিমা দেখার ফাঁকে ফাঁকে বাবা আমাদের তাঁর ছেলেবেলার গল্প শোনাতেন। কীভাবে বন্ধুরা মিলে দুষ্টুমি করতেন, সনাতন ধর্মাবলম্বী বন্ধুদের নিমন্ত্রণে একসাথে পূজামণ্ডপ দেখতে যেতেন –সেই সব গল্প শুনিয়ে বাবা নিজেও যেন আবার ছোট হয়ে যেতেন। আমাদের কাছে সেটাই ছিল বাড়তি পাওনা। মনে হতো বাবার ছেলেবেলার দিনগুলি কতেটা সহজ –সরল অথচ আনন্দে ভরপুর প্রাণবন্ত ও স্বাধীন ছিলো!
অক্টোবর মাসটি আরও একটি কারণে উল্লেখযোগ্য ছিল আমাদের বাসায়। এই মাসের শুরুতেই নোবেল পুরস্কার ঘোষণা শুরু হয়। পুরো বিশ্ব তাকিয়ে থাকে কারা পৃথিবীর সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কারটি পেলেন, সেদিকে। বাবা এই বিষয়ে বিশেষভাবে উৎসুক থাকতেন। প্রতিটি নোবেল ঘোষণার পর তিনি আমাদের নিয়ে আলোচনায় বসতেন – কে কোন বিষয়ে পুরষ্কার পেলেন, তাঁর গবেষণা কী, সাহিত্যে কী নতুনত্ব এল। বিশেষ করে বিজ্ঞান ও সাহিত্য ছিল বাবার সবচেয়ে প্রিয় বিষয়। আমাদের অজান্তেই তিনি আমাদের জ্ঞানের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে দিতেন।
আজ এত বছর পর, হাজার মাইল দূরে বসেও অক্টোবর এলেই সেই অমলিন দিনগুলো ফিরে আসে। কাশফুলের দোলা, শিউলির ঘ্রাণ, নতুন বইয়ের পাতার গন্ধ, বাবার হাত ধরে পূজা দেখতে যাওয়া আর গল্পচ্ছলে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা – সব মিলিয়ে অক্টোবর আমার কাছে শুধু একটি মাস নয়, এটি আমার শৈশব, আমার বাবার স্নেহ, আর আমার ফেলে আসা দেশের মাটির এক টুকরো স্বর্ণালী স্মৃতি।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী প্রকৌশলী ও গবেষক












