মাহে রমজানের সওগাত

মুহম্মদ মাসুম চৌধুরী

বুধবার , ১৩ জুন, ২০১৮ at ৫:১৯ পূর্বাহ্ণ
10

পবিত্র কোরানে মহান আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন, ‘তোমরা যে সুদ দিয়ে থাক, মানুষের সম্পদ বৃদ্ধি পাওয়ার জন্য তা মূলত আল্লাহর কাছে বৃদ্ধি পায় না। তোমরা যে যাকাত দিয়ে থাক তাই বৃদ্ধি পায় এবং বহুগণে সম্পদপ্রাপ্ত হয়। (সূরা রূম৩৯)

এই আয়াতের অর্থ গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝা যায়, মানুষ সুদ গ্রহণ করলে সম্পদ বাড়ে, তা আমরা বাহ্যিক দৃষ্টিতে দেখতে পেলেও প্রকৃতপক্ষে তাতে সম্পদ বাড়ে না। সুদের কারণে গরীবের টাকা ধনীর হাতে চলে যায়। ফলে গরীবের ক্রয় ক্ষমতা কমে যায়। এই অবস্থায় অর্থনৈতিক চাকা অচল হয়ে পড়ে। যাকাতের কারণে দরিদ্রের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে ধনীর পণ্য বাজারে বিক্রয় বেশি হয়। ফলে ধনী আরো ধনী হয় কিন্তু গরীব দিন দিন গরীব হয়। সুদের কারণে মানুষ শোষিত হয়। দিনে দিনে গরীব হয়। মানুষ ইহকাল পরকালের উভয় অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অর্থনৈতিক সুব্যবস্থা ছাড়া সমাজে শান্তি আসতে পারে না। কারণ মৌলিক অধিকার অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যাকাত হলো ইসলামের সেতু। (তাবরানীবায়হাকী)

যাকাতের কারণে ধনী দরিদ্রের ব্যবধান কমে। অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমে দরিদ্র ধনীর কাছাকাছি আসতে পারে বলে যাকাতকে ইসলামের সেতু বলা হয়েছে। তাই পবিত্র কোরানে নামাজের সাথে যাকাতের কথা যুক্তভাবে একাধিক বার বর্ণনা করা হয়েছে।

মানুষ দাস প্রথাকে পরাজিত করেছে, বর্ণবাদকে পরাজিত করেছে, দারিদ্রতাকে পরাজিত করতে পারলে প্রকৃত মৃক্তি আসবে। মহানবী হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘দারিদ্রতা মানুষকে কুফুরীর দিকে টেনে নেয়।’

যাকাত দারিদ্রতা মুক্তির কর্মসূচী। অথচ বছরের পর পর যাকাত দিচ্ছে, মুসলমানদের দারিদ্রতা হতে সামান্যতম মুক্তি এলো না কেন? বুঝতে হবে, যাকাতের এই পদ্ধতিতে আমাদের কোথাও গলদ আছে। আমরা যাকাত ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছি।

ইসলাম মানবতার ধর্ম, কল্যাণের ধর্ম। এভাবে যাকাত দেওয়ায় কী কল্যাণ হলো! রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত তহবিল করে যাকাত আদায় করে দারিদ্র বিমোচন করাই ইসলামের বিধান। ব্যক্তিগতভাবে যাকাত প্রদান করলে প্রদানকারীর মনে অহংকার আসে এবং যিনি গ্রহণ করেন তাঁর মন ছোট হয়। কোন ব্যক্তি যখন রাষ্ট্রের পক্ষে হতে যাকাত গ্রহণ করে দারিদ্রমুক্ত হবে, সে মনে করবে গরীব হিসেবে রাষ্ট্রের পক্ষ হতে এটি তার অধিকার।

একজন মানুষ অনাহারে মরছে আমি তাদের খাওয়ালামআমরা যাকাতকে এ ধরণের দানের কাজে লাগাব না। তাঁকে খাওয়ানোর জন্য দান সদকা আছে। কিন্তু কেন অনাহারে মরছে তার কারণ অনুসন্ধান করে সমস্যার সমাধান করতঃ যাকাত কর্মসূচী দ্বারা অর্থনৈতিক মুক্তি দেওয়াই যাকাতের মূল উদ্দেশ্য।

বর্তমান যুগকে উন্নয়নের যুগ বলা হয়। এটি প্রকৃতপক্ষে বড় ধরণের কোন উন্নয়ন নয়। গবেষকরা বলেছেন, উন্নয়নের টিউমার। টিউমার যত বড় হবে, তত বেশি ঝুঁকি। ২০১৬ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, ১ শতাংশ মানুষের কাছে ৯৯ শতাংশ সম্পদ। মাত্র ৬২টি পরিবারের হাতে পৃথিবীর অর্ধেক সম্পদ। যাকাতের দর্শন মানুষের মিলনের দর্শন, সম্পদের ভাগ করার দর্শন। মহান আল্লাহ পাক মানুষকে সম্পদের পরিমিত ভোগের অধিকার দিয়েছেন, মালিকানা দেননি। সমস্ত সম্পদের মালিক মহান আল্লাহ পাক। তাই আমাদের সম্পদের অপব্যয়, অপচয়, মজুদ, ধ্বংস বা লুণ্ঠন করার অধিকার নেই। পৃথিবীর অনেক সেরা ধনী শোষন, নিপীড়ন, সুদ, ঘুষের মাধ্যমে সম্পদ অর্জন করেছে, যে সম্পদকে তারা নিজের মালিকানা মনে করে। যে কোন উপায়ে সম্পদ অর্জন এবং সম্পদ বর্জন যাকাতের দর্শন নয়। যাকাতের মূল দর্শন আত্মস্থ করে যাকাত ব্যবস্থা প্রচলন করলে অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে।

x