ভূগোলের গোল

ডা: কিউ এম অহিদুল আলম

মঙ্গলবার , ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ at ৪:২৯ পূর্বাহ্ণ
21

বেকারত্ব : কিছু কথা
১৯৭০ থেকে ৯০ পর্যন্ত অত্যন্ত দ্রুত গতিতে উন্নয়ন করছিল আফ্রিকার জনবহুল দেশ নাইজেরিয়া। লাগোস মেগাসিটিতে পরিণত হয়। অফিস-আদালতের সামনে দামি মার্কিনী গাড়ির বহর। নাইজেরিয়ার উন্নয়ন নিয়ে আমেরিকান অর্থনীতিবিদদের মাঝে আলোচনা-গবেষণার শেষ ছিল না। ৯০ এর পরে নাইজেরিয়ার অর্থনীতিতে যেই ধ্বস নামে তা এখনো চলছে।
বর্তমান বিশ্বে অর্থনীতিতে অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে আমাদের চোখের সামনে। আমাদের পূর্বে তথাকথিত এশিয়ান টাইগারদের অভাবনীয় উত্থান, এই উপমহাদেশে দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্য ‘কেরালা মডেল’ ইত্যাদি অর্থনীতিবিদদের নাড়া দেয়, বহুজাতিক কোম্পানীগুলো এসব দেশ নিয়ে যে উচ্ছ্বাস সব ছিল অল্প সময়ের জন্য। অর্থাৎ অর্থনীতির চমকটা স্থায়ী হয়নি বা টেকসই উন্নয়ন হয়নি। যেমন দক্ষিণ ভারতের কেরালায় দুই যুগ আগেই শিক্ষা, স্বাস্থ্য, গড়পড়তা আয়ুতে অনেক ইউরোপীয় দেশের কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। পরে দেখা যায় কেরালার উন্নতিটা ঐতিহ্যগত শিক্ষিত মানব সম্পদ এবং কেবলমাত্র “গালফ ফেনোমেনা” বা মধ্য প্রাচ্য নির্ভর। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের এই রেমিটেন্স সেখানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেনি। যেখানেই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি সেখানে উন্নয়ন যাত্রায় বিরতি ঘটেছে। মুক্তবাজার অর্থনীতি, ‘ট্রিকল ডাউন’ থিওরী’র মৃত্যু ঘটেছে। অর্থাৎ কর্পোরেটসহ কিছু মানুষ ধনী হলে তার ফলে নীচের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তরা ও ধনীদের প্রভাবে বিত্তবান হবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটৈছে তার উল্টোটা। ধনীরা গত দুই দশকে অস্বাভাবিক হারে বিত্তবান হয়েছে। বাকী বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ধন-সম্পদও বাড়েনি। আয় বৃদ্ধি ও খরচ-বৃদ্ধির ফারাক নেই, ক্রয় ক্ষমতা মুদ্রাস্ফীতির মূল্যমানে না বেড়ে বরং কমে গেছে। মোদ্দা কথায় গড় আয়ু নামক ‘মিসনমের’ বেড়েছে ও কর্মসংস্থান বাড়েনি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের। এটাকে বলা হচ্ছে কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি। এই প্রবৃদ্ধি কতটুকু টেকসই কতটুকু দেশের মান মর্যাদা বাড়ায় তার বাস্তব চিত্র দেখা গেছে নাইজেরিয়া, ভেনেজুয়েলা, ব্রাজিলসহ কতগুলো দেশে।
বাংলাদেশে ২০১৭ সালের তথ্য মতে প্রায় ৫% বেকার। ভারতে ৩.৫২%। তবে এই হিসেবটা জাতিসংঘের শ্রম সংস্থা আইএলওর। তাদের হিসেবটা উন্নত দেশের জন্য এরকম আর আমাদের মত দেশের জন্য অন্যরকম ও বেশ শিথিল। সেই বেকারত্বের সংজ্ঞা অনেকটা হাস্যকর। আইএলওর সংজ্ঞা অনুযায়ী মাসে কেউ ১ ঘ: কাজ করলেও তাকে বেকার বলা যাবে না। তার চেয়ে বরং বুরো অফ লেবার পরিসংখ্যান (ইখঝ-ট.ঝ) এর যে ক্রাইটেরিয়া তাকে অধিকতর যুক্তিপূর্ণ মনে হয়। বি.এল.এস এর তথ্য মতে চার মাস এক নাগাড়ে চেষ্টা করেও চাকরি না পেলে তাকে বেকার বলা হয়। এই সূত্র ধরলে বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা ১২% এর উপরে-যা যে কোন অর্থনীতির জন্য অখঅজগওঘএ বা ভয়াবহ মনে করা হয়। বাংলাদেশের ওয়ার্কফোর্সের অর্থাৎ শ্রম সম্ভব মানুষের ৪০% কাজ করে কৃষিতে। তারা ৩৬৫ দিনে কয়দিন কাজ করে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আবার শ্রম সম্ভব মানুষের ৮৫% ইনফরমাল সেক্টরে কাজ করে। এই ইনফরমাল সেক্টর অর্থনীতির চালিকা শক্তি। কিন্তু সমস্যা হল যে এখানে না আছে আয়ের গ্যারান্টি, না আছে অবসর পরবর্তী জীবনে কোন অর্থ-প্রাপ্তি। এই পুরো সেক্টরের সাথে জড়িত সবাই অর্থনৈতিকভাবে নড়বড়ে। তারা কখনো লাভ, কখনো ক্ষতিতে সর্বস্বান্ত হয়। আবার কোন সন্তানের বিয়ে শাদী বা কঠিন রোগে আক্রান্ত হলে সর্বস্বান্ত তো হয়ই, রুজী রোজগার ও বন্ধ হয় আর দেনায় আটকে পড়ে। এই হচ্ছে বাংলাদেশের ইনফরমাল সেক্টরের নিয়োজিত ৮৫% শ্রম-সম্ভব জনগোষ্ঠীর অবস্থা।
বলা হচ্ছে ব্যাংকিং খাতে ১৭% প্রবৃদ্ধি হচ্ছে বাংলাদেশে। কিন্তু এত প্রবৃদ্ধির ফলে কর্মসংস্থান কত হয়েছে তা জানানো হয়নি। প্রতি বছর ৩০ লাখ চাকরি প্রার্থী শ্রম বাজারে আসছে। এদের ভাগ এর ও ফর্মাল সেক্টরে চাকরি হচ্ছে না। প্রতি বছর শিক্ষিত অশিক্ষিত ১০ লাখ লোক বাইরে যায়। এখন মধ্যপ্রাচ্য থেকে কত লোক বেকার হয়ে দেশে ফিরে আসছে তাদের পরিসংখ্যান কই? আমরা যারা কিছুটা পাবলিক রিলেশন যুক্ত পেশায় আছি আমরা কিছুটা টের পাই। এ সমস্ত বেকার লোকদের যে দুর্বিসহ মানসিক অবস্থা তা না টের পাবে কোন অর্থনীতিবিদ না টেরপাবে সুবিধাভোগী কোন কর্মকর্তা।
অর্থনীতিতে বেকারত্বের পাঁচটি বা ছয়টি রকমভেদ আছে। আমাদের দেশে সেই বিবেচনায় মাত্র দেড় থেকে দুই কোটি মানুষ পূর্ণ চাকরিতে নিয়োজিত বাকী বেকার শ্রম সম্ভব বিপুল জনগোষ্ঠীকে মনীষী কার্লমাক্স “শ্রমের রিজার্ভ আর্মি” নামে অভিহিত করেছেন। যে কোন দেশের স্বাভাবিক জীবন প্রবাহের জন্য, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য এই বেকার আর্মি এক ভয়াবহ হুমকি (মৎবধঃ ঃযৎবধঃ).
কাউফমেন ফাউন্ডেশন ২০১৪ সালে এক গবেষণা চালিয়ে দেখে যে বড় মেগা ব্যবসাতে প্রতি দশ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে এটি চাকরি সৃষ্টি হয়। অথচ ক্ষুদ্র শ্রমঘন এবং কৃষিতে প্রতি দশ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের বিপরীতে ৩০টি চাকরি সৃষ্টি হয়। মেগাপ্রজেক্টে গুটি কয়েকজন মুনাফা পায়। কিন্তু ক্ষুদ্র বিনিয়োগে অধিক সংখ্যক মানুষের লাভ হয়। মার্কিন মুল্লুকে গত বার বছরে শ্রম ঘন অটোমোবাইল শিল্পে ৩০ লাখ মানুষ চাকরি হারায়। তার বিপরীতে তথ্য-প্রযুক্তি বার লাখ চাকরি সৃষ্টি করেছে।
বর্তমানে চাকরির হুমকিতে নব্য সংযোজন রোবটিক প্রযুক্তি বা আর্টিফিসিয়েল ইনটেলিজেন্স। আগামী দশ বছরে এই শিল্পের ফলে সারা বিশ্বে ৫ কোটি চাকরি সৃষ্টি হবে। কিন্তু এই শিল্পের ঠেলায় ৮ কোটি মানুষ চাকরি হারাবে।
তাহলে আমাদের মতো দেশে কি হবে? চাউলের দাম বাড়লে মানুষকে এদেশে কেক খাওয়ার উপদেশ দেয়া হয়। দেশের প্রায় রিটি হতে হবে কোথায় বিনিয়োগ করলে কর্মসংস্থান হবে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি হবে। অতি উৎসাহী কিছু লোক কেবল মেগা প্রজেক্টে বিনিয়োগ করতে চায় কেবল প্রত্যক্ষ লাভ দেখে।
পরোক্ষভাবে জনগণের বাস্তুচ্যুতি, পরিবেশ ক্ষতি ও আনুপাতিক কর্মসংস্থান বিবেচনা এবং জনগণের উপর অতিরিক্ত করের বোঝার হিসাবটা অগোচরে থেকে যায়। বড়লোক বালুর বিনিয়োগ থেকে সরে না আসলে আমাদের অবস্থাও নাইজেরিয়ার মত হবে।
বর্তমানে সামাজিক ও পারিবারিক বিপর্যয়-যা প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তা প্রায় সবই বেকারত্ব ও অনৈতিক ভোগবাদী সংস্কৃতির এফেক্স। বৃহত্তর এই জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ধীরগতি হলে উন্নয়ন বিপর্যস্ত হবে।
doctorohid81@gmail.com

Advertisement