দূরের দুরবিনে

অজয় দাশগুপ্ত

শুক্রবার , ১২ জুলাই, ২০১৯ at ৮:০১ পূর্বাহ্ণ
23

উন্নয়ন ঠেকাতে হলে ফিরে তাকাতে হবে

উন্নয়ন যদি টেকস ই করতে হয় অচিরে যে বিষয়গুলোর দিকে নজর দিতে হবে তার ভেতর সবার আগে সামাজিক নিরাপত্তা। এটা মানতে হবে এই জায়গায় ভয়ংকর এক শূন্যতা বিরাজ করছে। ক দিন পর পর হত্যা ধর্ষণ আর নোংরা খবরে জনজীবন অতীষ্ঠ। এভাবে কি আলসে সমাজ বাঁচতে পারে? কোন দেশে কোনকালে যৌনতা ছিলো না? কোন সমাজে যৌন অনাচার নাই? কিন্তু এমনধারা কান্ড কে কবে কোথায় দেখেছে? দেখে শুনে মনে হয় মানুষের না আছে আর কোন বিনোদন না কোন খোয়াব। কেবল ধর্ষণ আর যৌনতাই সব।
এখন তো এমন হয়েছে কোলের শিশু দুধের বাচ্চা ও বাদ পড়ছে না। বিস্ময়ের আর শেষ বলে কিছু থাকলো না। যাদের বুদ্ধি ফোটেনি যাদের শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ এখনো ঠিক ভাবে বেড়ে ওঠেনি তারাও লালসার শিকার। এ কেমন বিকৃতি? এতে কি আনন্দ? কি সুখ? সমাজে এখন এগুলো মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। এগুলোর বিহিত করা না হলে কেউ নিরাপদ থাকবে না। ধর্মীয় লেবাস ধারী যেসব মানুষ এমন করে তাদের অচিরে আইনের আওতায় আনা উচিত। কারণ এরা ডাবল ট্রিপল অপরাধী। একদিকে ধর্মীয় মুখোশ আরেকদিকে ধর্মকে টেনে নামানো। এদের কারণে পবিত্রতা আর বিশ্বাস আজ হুমকির মুখে।
সমাজ বিজ্ঞান কি বলে জানিনা তবে খোলা চোখে মনে হচ্ছে আমাদের সমাজ বা আজকের বাংলাদেশ নষ্টের শেষ সীমায় চলে গেছে।
একটা কথা মানতেই হবে সামাজিক ন্যায় বা শৃঙ্খলা বলে কিছু নাই। যারা মনে করবেন ধান ভানতে শীবের গীত গাচ্ছি তাদের চোখের ঠুলি সরিয়ে দেখতে অনুরোধ করছি। এই কারণে সব ঘটনার পেছনে কিন্তু সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনাচার দায়ী। যেমন ধরুন সেই কবে থেকে একশ্রেণির মানুষ উস্কানী দিয়ে হিন্দুদের জায়গা দখল করছে। মূর্তি ভাঙা এখন উল্লাসের ব্যাপার। আছে নির্যাতন আর প্রতিরোধবিহীন অত্যাচারের দায়। এগুলো কি ছেড়ে কথা বলবে? যারা প্রতিশোধ দূরে থাক প্রতিরোধ করতে পারে না বা যাদের সে সাহস ও বল কোনটা নাই তাদের কথা প্রকৃতি শোনে। সময় তাদের হয়ে বিচার করে। তা ছাড়া এসব ঘটনা যেহেতু আইন ও বিচারের কাছে পাত্তা পায় নি, কারো তেমন সাজা বা শাস্তিও হয়নি। তাতে কিহয়েছে? যে যারা অপরাধী তারা ধরে নিয়েছে কারো সাধ্য নাই আমাদের ঠেকায়। এরাই এখন নানা ছত্রছায়ায় বেপরোয়া। এদের কারসাজি আর অংগুলি হেলনে আজ সংখ্যাগুরু মানুষের বাচ্চা মেয়ের ধর্ষক ও কোন না কোন ভাবে রেহাই পেয়ে যেতে পারে।
সে কবে থেকে পাহাড়ে অনাচার চলছে? কত আদিবাসী মেয়ের শ্লীলতা হানি ঘটেছে খবর রাখেন? খবর রাখেন রোহিঙ্গাদের নিয়ে কি হচ্ছে? এই টাইমবোমা আমরা ডেকে এনেছি। ডেকে এনেছি বলতে তারা বাধ্য হয়ে আসলেও আমাদের নেতা কর্মী থেকে সাধারণ মানুষের আবেগ দেখে রোহিঙ্গারাই থ বনে গেছে। কোন দেশে শরণার্থীকে তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে এমন বিশেষ খাতির আর আবেগ সত্যি বিরল। লাকী রোহিঙ্গারা সেসব বুঝতে পেরে নিজেদের মোকসেদ পূরণে কাজ করছে। কি কাজ? সন্তান পয়দার রেকর্ড করতে চলা শরণার্থীরা আর না যাবার জন্য ও আজ মরিয়া। আপনি প্রায় ই খবরে দেখবেন মারমারি হয়েছে। জেনে অবাক হবেন না বীর বাঙালি মার খেয়ে পিছু হটেছে কিংবা বেদম প্রহারে আহত হয়ে কাতরাচ্ছে। মারলো কারা? আপনারা একবেলা খেয়ে যাদের খাওয়ানোর শপথ করেছিলেন তারা। বুঝুন এবার।
সামাজিক অনাচারের আরো কত কাহিনী। এই সেদিন রিফাত হত্যার পর স্বরাষ্টমন্ত্রী বেফাঁসে বলে ফেললেন বিশ্বজিৎ হটভার দায়ে ছাড় পেলেও এ বার কেউ ছাড় পাবে না। কেন আগের ঘটনায় ছাড় কেন? সেটাওতো এক নাটকের আরেক অভিন্ন দৃশ্য। তাও আবার ঢাকার রাজপথে। প্রশ্ন তবে দুটো। তাদের ছাড় পাবার কারণ তারা সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের কেউ? না কি বিশ্বজিৎ ধর্মীয় পরিচয়ে অমুসলিম বলে? এসব প্রশ্নের উত্তর পাবেন না। শুধু জানতে চাইবেন আর বিপদে পড়বেন। যেমন ধরুন এত এত ধর্মচর্চা আর এত আচারসর্বস্বতা তারপর ও এত বেনিয়ম এত দূর্নীতি এত হত্যা আর ধর্ষণ কেন? এ সব বললে আপনার জীবন নিয়ে বেঁচে থাকা মুশকিল হয়ে যাবে।
সমাজের পচনের জন্য নাকি খোলামেলা পোশাক আর উন্মাদনা দায়ী। আপনি এখন অবদি ক জন ব্লগার বা নাস্তিক ট্যাগধারীদের নাম দেখেছেন যারা কাউকে হত্যা করেছে? কোন নারীকে তারা তুলে নিয়ে গেছে বা শারীরিক অত্যাচার করেছে এমন খবর জানেন? তারপরও তারা খারাপ। ভালো যারা আদর্শ যারা যারা মুখে মুখে ধর্মের নামে ফেনা তোলে তাদের কথা শুনে জেনে সমাজ স্তব্দ হয়ে থাকে। মূল কথা হলো কোন জাববদিহিতা বা স্বচ্ছতা নাই। আইনে নাই বিচারে ও নাই। থাকলে এতদিনে দু দশটা ফাঁসীতে ঝুলতো। দেখতেন তখন আর কারো মুখে শব্দ থাকতো না। উল্টো এসব ধর্ষক পালিয়ে কুল পেতো না।
শুধু এক শ্রেণির মানুষকে দোষারোপ করে লাভ নাই। আমি ব্যক্তিগত ভাবে সুশীল নামধারী পন্ডিত বলে পরিচিত এমন অনেককে চিনি যারা অনায়াসে নারী নির্যাতনের দায়ে আসামি হতে পারে। জুকারবার্গের অনন্য আবিষ্কার ফেইসবুককে এরা কসাইয়ের ছুরি কিংবা ডাকাতের তলোয়ারের মত ব্যবহার করে। মধ্যরাতে নির্ঘুম বাংলাদেশ এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। যেখানে একজন আরেকজনকে যৌনতা আর ভালোবাসার নামে রীতিমত উৎপীড়ন করে চলেছে। এসব মানুষগুলোর বেশীরভাগ আবার সংখ্যালঘু নামে পরিচিত কথিত নীরিহদের দলভুক্ত। এরা তাদের পরিচয় আর খ্যাতির নাম ভাঙিয়ে এসব করেই চলেছে। তাদের শিকার নারীরা যদি টপাটপ করে ধরা দিতো আজ বাংলাদেশের যৌন ইতিহাস হতো আরো জঘন্য।
সব মিলিয়ে এ এক ভয়াবহ বিপদ। কোথায় যাবে মানুষ? বাচ্চা মেয়েটির বাবা আমার মত অনেক নিরীহ মানুষের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে। তিনি সোজা কথায় বলে দিয়েছেন বাচ্চাকে চোখে চোখে রাখতে না পারলে এমন হবেই। কাঁহাতক চোখে চোখে রাখা যায়? কতটা সম্ভব? ছাদে নিয়ে যাবে বলে যদি কেউ ধর্ষন করে আর মেরে ফেলে তাকে ঠেকাবে কারা? আইনের কঠোরতা বা বিচারের কঠিন প্রয়োগে যে কাজ হবে তেমন ও মানতে পারছি না। তবে এর যথাযথ প্রয়োগ না হলে ভবিষ্যতে মানুষ সরকার রাষ্ট্র কিছুর ওপর ভরসা রাখতে পারবে না।
তখন উন্নয়ন বা অগ্রগতি দিয়ে কি আসলে কোন লাভ হবে? না মানুষ তা মানবে? যারা বলেন মানুষ চুপ কারণ মানুষ ভালো আছে তারা মূলত বোকার স্বর্গে বাস করছেন। মানুষের সামনে বিকল্প নাই। তাদের হাত বা বাঁধা। তারা উন্নয়নকে অস্বীকার করছে না। তারা সুফল ও পাচ্ছে হাতে হাতে। কিন্তু এসব কিছুতেই দীর্ঘমেয়াদী হবে না যদি শান্তি না থাকে। নিরাপত্তা হীনতার নিকষ কালো অন্ধকার গ্রাস করছে আগামীকে। শিশু বৃদ্ধা তরুণী এমনকি বালক ও আজ অনিরাপদ। এসব শুনলে যেমন গা ঘিনঘিন করে তেমনি এর ভেতরেই আছে সমাজের পচে গলে এক হবার কুৎসিত চেহারা। এ সমাজ কে বাঁচাবে? কারা বাঁচাবে? তারুণ্য ও এখন এসবের শিকার। তাহলে পথ কোথায়? মুক্তি কোথায় বাংলাদেশের?
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

x