দূরের দুরবিনে

চামচামি আর উগ্রতা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমাদের ?

অজয় দাশগুপ্ত

শুক্রবার , ১০ আগস্ট, ২০১৮ at ৭:১৭ পূর্বাহ্ণ
39

বিবেকবোধ না থাকলে লেখালেখি করে কি লাভ? আমরা যারা বাংলাদেশকে ভালোবাসি বলে মনে করি আমাদের উচিৎ অনুচিৎ বা ভালো মন্দ বোধ কোন রাজনীতি দ্বারা প্রভাবিত না হলেই মঙ্গল। কিন্তু সবসময় তা মেনে চলা যায়না। না যাবার মূল কারণ এখন দেশে মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক আর ঝগড়া চলে। একদল এই বোধকে নিজেদের সম্পত্তি বানিয়ে নিয়েছে আরেক দলের কাছে এগুলো মূল্যহীন। গত ক দিন ধরে উত্তপ্ত দেশ আর বাচ্চাদের লড়াই এখন শান্ত হয়ে এসেছে। এই শান্তির জন্য যে মূল্য চুকাতে হয়েছে তা যেমন ভয়াবহ তেমনি এর পরিণাম ও ভালো হবার কথা না। এই দেশ স্বাধীন হয়েছিল আপন অধিকার আর শান্তিতে থাকার জন্য। সে অধিকারবোধ এখন প্রায় বিলুপ্ত।

আগে আমরা জানতাম মন্ত্রী মিনিষ্টার মানে জনপ্রতিনিধি। তাঁরা নিজেদের জনগণের সেবক মনে করেন। সেই সেবক এখন প্রভুর আসনে। আমি খুব বিস্ময়ের সাথে দেখলাম ডিজিটাল নামের দেশে এক মন্ত্রীর বালখিল্য আচরণ। আগুনে ঘি ঢালার কথা শুনেছি এ ছিলো আগুনে পতঙ্গের আত্মাহুতি। এই আগুন সারাদেশকে এমনভাবে জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে যার ধাক্কা সামলাতে অনেক বছর লেগে যাবে। বুঝলাম ছাত্র ছাত্রীরা বাধা মানেনি। বুঝলাম তারা বাড়াবাড়ি করেছিল। এও মানলাম মাঝপথে আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য আর নাশকতা এসে হানা দিয়েছিল। কিন্তু মানুষ কি দেখেছে? সরকারি দল নমনীয় হয়নি। তাদের কথাবার্তা বা আচরণে নমনীয়তা ছিলোনা। থাকলে আমার ধারনা বহু মানুষের বিবেক জাগ্রত হতো। সে জায়গাটায় হাত না দিয়ে কঠোর কথা আর কঠিন অবস্থানে আপাতত ঘটনা চাপা পড়লেও এর জের থেকে যাবে। আর দশটা ঘটনার মতো শেষতক এটিও বিবদমান দুই রাজনৈতিক শক্তির লড়াইয়ে পর্যবসিত হলো।

সরকারি দলের এখন অনেক কিছু ভাবার আছে। একা শেখ হাসিনার ওপর নির্ভরশীল দল এটাও প্রমাণ করেছে বাহিনীর সাহায্য ছাড়া তারা কোন কিছুর মোকাবেলা করতে পারেনা। অথচ এই আওয়ামী লীগ স্বাধীন দেশেও দীর্ঘকাল শুধু জনগণের ওপর ভর করে রাজপথে টিকেছিল। এমনকি সরকারি দলগুলোকেও ভয় পাইয়ে দেবার মতো জায়গায় থাকতো। আজ আমরা কি দেখলাম শামীম ওসমানকে আমরা যত গালমন্দ করিনা কেন তিনি ই পারলেন ভূমিকা রাখতে। আর ঢাকার মেয়র ও জনপ্রতিনিধিরা কে কোথায় কি করছিলেন কেউ জানেনা। অন্যদিকে রাজনৈতিক বৈরীতার মাশুল দিতে গিয়ে বিএনপি আবারো এক ভুলের ফাঁদে পা রেখে এখন দিশেহারা।

বিষয়টা তেমন জটিল ছিলোনা। সড়কের এসব দুর্ঘটনা এদেশের জন্য নতুন কিছুনা। নতুনত্ব ছিলো ছাত্রছাত্রীদের জেগে ওঠা। যে বেদনা আর অপমান তাদের পথে নামিয়েছিল সেটা মাঝপথে ছিনতাই হলেও এর দাগ থেকে যাবে। বিশেষত মিডিয়ায় সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন সব ছবি আর কাহিনী এসেছে যা আগামী একদশক মানুষকে ভাবাবে। এটা কি জনমন থেকে চাইলেই মুছে ফেলা যাবে? বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন নির্মম নিষ্ঠুরতা খুব বেশী ঘটেনি। সব কিছু মুক্তিযুদ্ধ আর স্বাধীনতার নামে জায়েজ করার দিন শেষ। এটা বুঝতে হবে। এখন যে প্রজন্ম বড় হয়েছে বা বড় হচ্ছে তাদের মনের ভাষা আর মনোভঙ্গি বোঝে না রাজনীতি। এবারের ঘটনায় সেটাই প্রমাণ করলো। মন্ত্রী শাজাহান খান যেমন বোঝেননি বিএনপি নেতা আমীর খসরুও টের পাননি। একজন পাওয়ার গেইমে মত্ত আর একজন কিভাবে গদী লাভ করা যায় সে চিন্তায় দিশেহারা। দুজনের অভিন্ন বদ উদ্দেশ্যের শিকার হলো কোমলমতি ছাত্রছাত্রীরা। এরপর আমরা দেখলাম ভাঙচুর মারামারি আর হানাহানির এক নারকীয় বাস্তবতা। আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি এমন দৃশ্য দেখতে হবে। বারবার চোখ ভিজে আসছিলো। এমনকি যখন একের পর এক আক্রমণ আর উন্মত্ত ছাত্রসমাজের ছবি দেখছিলাম বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল এ দৃশ্য আমাদের দেশের। এমন তো কথা ছিলোনা।

এই মাটিতে কত বীর কত সাহসী সন্তানেরা ঘুমিয়ে। কেন তারা প্রাণ দিয়েছিলেন? দেশ ও সমাজ ভালো থকবে বলেই তারা তাঁদের প্রাণ দিয়ে গেছিলেন। এই কি তার নমুনা? যেসব ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় নেমে এসেছিল তারা গোড়াতে সরকার পতন বা এমন কোন আশা নিয়ে আসেনি। তাদের প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ ছিলো সামাজিক অন্যায় আর দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে। একসময় তার ওপর রাজনীতি ভর করে সবকিছু আপ সাইড ডাউন করে দিলো। আজকাল এমন এক পরিবেশ সবকিছু এমনকি স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক ও দুই দলের মতবাদে বিভক্ত। এখানেও তাই হলো। যে যার মত করে রাজনীতি করতে গিয়ে আসল ঘটনাকে ধামাচাপা দিয়ে শুরু করলো ষড়যন্ত্র। সে ষড়যন্ত্র বাংলার মানুষ আর নেয়না। নেয় না বলেই হয়তো এবারেও পার পাওয়া গেছে। কিন্তু কতদিন? সামনে নির্বাচন তার আগে এমন একটা ঘটনা কিভাবে হজম করবে রাজনীতি? কি হবে তার পরিণাম?

বাংলাদেশে এখন কোন আন্দোলন বা প্রতিবাদ বেশি দিন টেকে না। সে কারণেই এটা টেকেনি। কারণ এখন দেশ বিদেশ সব পাল্টে আরেক চেহারা ধারণ করেছে। মানুষের মনে রাজনীতি বিষয়ে না আছে আবেগ না কোন অনুভূতি। তার কারণে যা খুশি তা করাটা কি ন্যায্য? আমি বিদেশেও দেখছি মানুষের মনে বড় চোট দিয়ে গেছে এটা। এর দাগ সহজে শুকাবেনা। একা শেখ হাসিনা আর কত সামাল দেবেন? বাকিদের নিষ্ক্রিয়তা বা বাকিদের ভাঙা ইমেজ এখন মানুষের কাছে কোন মূল্যই বহন করেনা। নেতারা সেটা বোঝেন না। বোঝেন না বলেই হাতের সামনে মুখের কাছে মাইক্রোফোন পেলেই যা খুশি বলতে শুরু করেন। যদি আন্দোলনটি বা ঘটনাটি রাজনৈতিক ইন্ধনমুক্ত হতো আমরা ধারণা বাংলাদেশে একটা নতুন ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারতো। আমাদের দুর্ভাগ্য বিএনপি জামাত সে সম্ভাবনা বারবার নষ্ট করে দিল কে যেন লিখেছেন মেয়াদহারানো বিএনপি আর মেয়াদহীন জামাত এর জন্য দায়ী। কথাগুলো মনে রাখার মত। সাথে যোগ হয়েছে আওয়ামী লীগের জন্য নতুন এক দুর্ভাবনা। এভাবে তারা জনবিচ্ছিন্ন হতে থাকলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে ভাবাও কঠিন বৈকি। সমাজ ও রাষ্ট্রের মূল বিষয় বা মূল ভাবনার জায়গা জনগণ। সেখানেই যদি ঘাটতি থাকে এক সময় কিন্তু দলের কপালে দুর্ভাগ্য আর বিপর্যয় নেমে আসবে। ট্রমা বলে একটা কথা আছে। সে ঘোরে পড়া তারুণ্য কিংবা কিশোর জীবন নিয়ে কেউ কিছু বলেননা। এই প্রজন্ম যা দেখলো যা শুনলো আর যার শিকার হলো সে দাগ কি চাইলেই মুছে যাবে? বাংলাদেশের যে মৌল বিষয়গুলো নিয়ে আমরা গর্ব করি তার সবগুলোই আজ আক্রান্ত। আজ মানুষ যেমন দিশেহারা তেমনি তার সামনে না আছে কোন বিকল্প না কোন সমাধান। বঙ্গবন্ধু কন্যার কাছে আমাদের আবেদন আপনি সময় থাকতে সঠিক সিদ্ধান্ত নিন।

দেরী হবার আগে আবর্জনা সরিয়ে দলে শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে দল ও দেশকে নিরাপদ করুন। সরকারে থাকার কারণে যারা ছদ্মবেশে ঘিরে আছে তাদের হঠান। আর বিরোধী দল নামে পরিচিতদের জন্য এখন করুণা ছাড়া আর কিছু করার নাই। তারা যেন তেন প্রকারে গদি পাবার জন্য তারুণ্য এমনকি কিশোর কিশোরীদের অপব্যবহার করতে মাঠে নামা বন্ধ করলে অচিরেই নিশ্চিহ্ন হবার বিকল্প থাকবে না।বুদ্ধিবৃত্তির কথা আর কি লিখবো? এতটাই নিম্নগামী আজ তারা চোখেও দেখেনা। আর দেখলেও মুখ খোলে না।

এমন সমাজ দেশ ডিজিটাল হলেও অন্ধ থেকে যাবে। তখন হাজার পুল লাখো সেতু বা পথ নির্মাণ করলেও উন্নয়ন টেকসই হবে না। এই বাস্তবতা এখন দৃশ্যমান। বাংলাদেশ এগোলে মানুষের কন্ঠ মুক্ত রাখতে হবে। সমস্যাকে সমস্যার আলোকে বিবেচনা করে সমাধান দিতে হবে। নেতৃত্বের এই বিশেষ গুণেই আমরা দেশ পেয়েছিলাম। আর সে গুণ হারাতে হারাতে শূন্যে নেমে এলে ভূমি থাকবে মানুষ থাকবে দেশ থাকবে হয়তো কিন্তু কোনদিনও মাথা উঁচু করা জাতি থাকবে না।

স্বাধীনতাকে গিলে খাচ্ছে চামচামি আর উগ্রতা। এর সমাধান কোথায় আমরা কি কেউ জানি আসলে?

x