ড. মঈনুল ইসলামের কলাম

বৃহস্পতিবার , ১১ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৪৬ পূর্বাহ্ণ
45

একজন উদ্বিগ্ন নাগরিকের দৃষ্টিতে চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা সমস্যার রাজনৈতিক অর্থনীতি
চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা সমস্যা প্রকৃতপক্ষে গুরুতর সংকটে পরিণত হয়েছে গত তিন দশকে নগরীর আকার-আয়তন ও জনসংখ্যার দ্রুত প্রবৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ পানি-নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলায় ব্যর্থতার কারণে। বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশক পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরীতে পানি-নিষ্কাশন ব্যবস্থা যে বড় বড় খাল ও নালাগুলোর উপর নির্ভরশীল ছিল সেগুলো প্রয়োজনের তুলনায় যথাযথ ছিল। পানি অতিদ্রুত কর্ণফুলি নদীতে নেমে যেতে পারত। (অবশ্য, অতিবৃষ্টির সময় ষাটের দশকেও চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় পানি জমে যেত স্বল্প সময়ের জন্যে, কিন্তু জলাবদ্ধতা হতো না।) বরং, ঐ সময় খালগুলোতে অনেকদূর পর্যন্ত দিনে নিয়মিত দু’বার জোয়ার-ভাটা হওয়ায় ওগুলোর মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যে নৌ-পরিবহনের ব্যবস্থা চালু ছিল। জল-দূষণেরও সমস্যা তাতে বাড়তে পারত না। ষাটের দশকে যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম তখন ঢাকার জলাবদ্ধতার সমস্যা দেখে মাঝে মাঝে সহপাঠিদেরকে ঠাট্টা করতাম এই বলে, আমাদের চট্টগ্রাম ইনশাআল্লাহ এই সমস্যায় ভুগবে না। চট্টগ্রামে বার্ষিক বৃষ্টিপাত যদিও সিলেটের পর দেশের অন্যান্য জেলার চাইতে অনেক বেশি হয় তবুও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা কখনো গুরুতর সমস্যা হয়ে উঠতে পারে সেটা আমাদের উপলব্ধিতে আসেনি তখনো। কিন্তু, আশির দশক থেকে খাল ও নালাগুলোর দু’পাশে জবরদখলের সংস্কৃতি ক্রমেই বাড়তে শুরু করে। গত চার দশকে নগরীর দ্রুত বিকাশের সাথে পাল্লা দিয়ে প্রায় সবগুলো খাল এখন সরু নালায় পরিণত হয়েছে জবরদখলের শিকার হয়ে। তার সাথে যুক্ত হয়েছে গ্রীনহাউজ ইফেক্ট ও গ্লোবাল ওয়ার্মিং-এর কারণে বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফুলি নদীর পানির লেভেল বৃদ্ধির অবিরাম ও ক্রমবর্ধমান প্রবণতা। ফলে, এখন চট্টগ্রাম নগরীর চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ, হালিশহর ও আগ্রাবাদ এলাকার ক্রমবর্ধমান অংশ অমাবশ্যা ও পূর্ণিমার আগে-পরে সপ্তাহখানেক ধরে নিয়মিত জোয়ারের পানিতে ডুবে যাচ্ছে। আর, বর্ষাকালে মুষলধারে বৃষ্টি হলেই এখন নগরীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নিচু এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতা সমস্যা ভয়াবহ পর্যায়ে চলে যাচ্ছে বেশ কয়েকবার। ৭ জুলাই ২০১৯ তারিখে যখন কলামটি লিখতে শুরু করেছি, তখন নগরীর নিচু এলাকাগুলো আষাঢ় মাসের নিম্নচাপজনিত মৌসুমী ভারী বৃষ্টিতে হাঁটুপানি থেকে কোমরপানিতে ডুবে রয়েছে। নগরীর বেশ কয়েকটি এলাকায় নৌকা চলছে।
জলাবদ্ধতা সংকটের প্রকৌশলগত জ্ঞান আমার সীমিত হলেও আমি বিষয়টা নিয়ে লেখার জন্যে এতদ্‌সম্পর্কীয় প্রকৌশলগত টেকনিক্যাল লিটারেচার বিশদভাবে পড়ার পর বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সাথে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এ-সম্পর্কে প্রকাশিত লিটারেচার রিভিউ করে আমার ধারণা হয়েছে, ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ইউএনডিপি’র অর্থায়নে এবং ইউএনসিএইচএস (UNCHS) এর তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন ১৯৯৫-২০১৫ মেয়াদের জন্যে প্রণীত চট্টগ্রাম নগরীর মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্পের অংশ হিসেবে যে ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান রচিত হয়েছিল সেটা বাস্তবায়নে যথাযথ মনোযোগ না দেওয়াতেই গত ২৪ বছরে জলাবদ্ধতা সমস্যাটি এত গুরুতর সংকটে পরিণত হয়েছে। ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নের দায়িত্ব চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নাকি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সেটা ১৯৯৫-২০১৫ এই ২০ বছরেও ক্ষমতাসীন কোন সরকার চূড়ান্তভাবে নিষ্পন্ন করেনি। ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানের পাঁচটি ফেইজের মধ্যে প্রথম ফেইজটি নাকি জরুরী ভিত্তিতে সম্পন্ন করার সুপারিশ করা হয়েছিল, যা সম্পন্ন করা হলে জলাবদ্ধতা সমস্যার অনেকখানি সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু, ২০১৫ সালে ঐ মাস্টার প্ল্যানের সময়সীমা অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও আজো ঐ প্রথম ফেইজের একটি প্রকল্পও গৃহীত হয়নি, সম্পন্ন করা তো দূরের কথা। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাস্টার প্ল্যান নাকি দেওয়াই হয়নি! এই ২০ বছরে বিচ্ছিন্নভাবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন কোটি কোটি টাকা খরচ করে নানা প্রকল্প গ্রহণ এবং সম্পন্ন করলেও ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানের সুপারিশে অন্তর্ভুক্ত একটি কাজও সম্পন্ন করেনি। ফলে, টাকাগুলো স্রেফ অপচয় হয়েছে। (এমনকি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কারো সাথে আলোচনা না করে মহেশখালের মুখে বাঁধ দেওয়ায় জলাবদ্ধতা সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল। পরে, ঐ বাঁধ আবার ভেঙে ফেলতে হয়েছে। অপচয় আর কাকে বলে!) হয়তো দুটো সংস্থাকেই ড্রেনেজ সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব সুনির্দিষ্টভাবে বাঁটোয়ারা করার প্রয়োজন ছিল, যা এখনো করা হয়নি।
এমনও হতে পারে, এই দুটো সংস্থার বৈরী সম্পর্ক ও সার্বক্ষণিক টানাপড়েন ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নকে ১৯৯৫-২০১৫ এই পুরো ২০ বছর ধরে আটকে রেখেছিল। এখন ঐ মাস্টার প্ল্যানের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় হয়তো নতুন আরেক দফা মাস্টার প্ল্যান করার তোড়জোর চলছে। (দেখা যাচ্ছে, চট্টগ্রাম ওয়াসাও ড্রেনেজ প্রকল্প গ্রহণের জন্যে সরকারের উর্ধতন মহলের কাছে জোর দেনদরবার শুরু করেছে। তারা প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়ন করে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করেছে মর্মে খবরও প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। এটি চট্টগ্রাম নগরীর ড্রেনেজ সম্পর্কে বৈদেশিক সাহায্যে প্রণীত পঞ্চম প্রকল্প-প্রস্তাব। আগের প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নের যেখানে হদিশ মিলছে না, সেখানে আরো একটি নতুন প্রস্তাব কেন?) আর.তখন যেহেতু চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ছিলেন প্রয়াত এ, বি, এম, মহিউদ্দিন চৌধুরী তাই সিডিএ এবং সিটি কর্পোরেশনের সম্পর্ক একেবারেই বৈরী ছিল বিএনপি সরকারের মেয়াদের ঐ সময়টায়। পরবর্তীতেও ড্রেনেজ ও জলাবদ্ধতা নিরসনে আমরা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কোন তৎপরতাই দেখতে পাইনি ১৯৯৫-২০১৫ সময়ে। বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলে সিডিএ’র সাবেক চেয়ারম্যান জনাব আবদুচ সালাম ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সরকারের কাছ থেকে প্রভূত প্রকল্প-অর্থায়ন আকর্ষণ করতে সমর্থ হলেও তাঁদেরই প্রণীত ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়নের কোন জোরালো উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলে শোনা যায়নি। বরং, চট্টগ্রাম সিটি কপ্যোরেশনের প্রাক্তন মেয়র জনাব মনজুর আলমের সময় বহদ্দারহাট থেকে কর্ণফুলি নদী পর্যন্ত যে খাল খনন প্রকল্পটি সিটি কর্পোরেশনের প্রকল্প হিসেবে একনেকে ২০১৪ সালে পাশ হয়েছিল সেটার বাস্তবায়ন শুরুর প্রাক্কালে হঠাৎ করে প্রকল্পটির দায়িত্ব সিডিএ-কে অর্পণ করা হয়েছিল। এখন সেনাবাহিনীর প্রকৌশল কোরের সহায়তায় জলাবদ্ধতা নিরসনের যে ৫৬১৬ কোটি টাকার মেগা-প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্যে সিডিএ-কে অর্থ-বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সেখানে সুপরিকল্পিতভাবে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ, ড্রেন পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের। ফলে, এবছরও এই দুই সংস্থার কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাব ও ক্ষমতার টানাপড়েন জলাবদ্ধতা সমস্যাকে আরো সংকটজনক করে তুলছে। (বর্ষা শুরুর আগেই সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন, এবার জলাবদ্ধতা সংকট আরো গুরুতর রূপ ধারণ করবে!)
ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানের অনেকগুলো সুপারিশ বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন জনের লেখায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রকৌশলী আলি আশরাফের বই চট্টগ্রাম নগরীর পরিকল্পিত উন্নয়ন: সমস্যা ও সম্ভাবনা থেকে আমরা জানতে পারছি, চট্টগ্রাম নগরীর জন্যে প্রথম ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানটি ১৯৬৯ সালে প্রণীত হয়েছিল মার্কিন কনসালটেন্ট ফার্ম জন আর স্নেল এন্ড কোম্পানীর মাধ্যমে। তারা পতেঙ্গার চট্টগ্রাম নেভাল একাডেমী থেকে কালুরঘাট ব্রীজ পর্যন্ত কর্ণফুলি নদীর সাথে ৩৪ টি খালের সংযোগ আছে উল্লেখ করেছিল। সম্প্রতি, চট্টগ্রাম ওয়াসার নিয়োজিত কনসালটেন্ট গ্রন্টমিজ এ/এস ঐ একই এলাকায় ২২ টি খাল খুঁজে পেয়েছে, বাকি ১২ টি খাল গায়েব হয়ে গেছে।
১৯৯৫ সালের ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যানটি প্রণীত হয়েছে কনসালটেন্ট ফার্ম বিনী এন্ড পার্টনার্সের নেতৃত্বে, যে প্ল্যানের ফার্স্ট ফেইজে প্রধান প্রধান যে প্রকল্প সম্পন্ন করতে বলা হয়েছিল সেগুলো ছিল: ১) বহদ্দারহাট থেকে কর্ণফুলি নদী পর্যন্ত ৬০ ফুট প্রশস্ত খাল খনন, ২) পাহাড়তলি-নাসিরাবাদ রেলওয়ে ট্র্যাকের পাশ দিয়ে একটি নতুন খাল খনন, ৩) চাক্তাই খাল ও মহেশখাল সহ অনেকগুলো খালের মুখে টাইডাল রেগুলেটর ও ফ্ল্যাপ গেইট নির্মাণ, ৪) প্রতিটি বড় নালা ও খালের সুনির্দিষ্টভাবে চিন্থিত স্থানে যথাযথ সংখ্যক সিল্ট ট্র্যাপ বা বালির ফাঁদ নির্মাণ এবং ঐসব ফাঁদে আটকে পড়া বালি ও পলি নিয়মিতভাবে অপসারণের ব্যবস্থা করা, ৫) নালা ও খালের ওপরের সড়কের ব্রীজ ও কালভার্টগুলোর উচ্চতাবৃদ্ধি, ৬)নগরীর উত্তর ও উত্তর-পূর্বের পাহাড়ে উপযুক্ত স্থান বাছাই করে বাঁধ দিয়ে অতিবৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্যে বেশ কয়েকটি জলাধার প্রতিষ্ঠা করা, এবং ৭) কয়েকটি খালকে সংযুক্ত করে নতুন খাল খনন। উক্ত মাস্টার প্ল্যানে চট্টগ্রাম নগরীকে ১২ টি বিভাগে ভাগ করে প্রতিটি বিভাগের জন্যে বিস্তারিত ড্রেনেজ প্ল্যান প্রণীত হয়েছিল, যেগুলোর বর্ণনা দেওয়া এই কলামে অপ্রয়োজনীয়। আমার আকুল আবেদন, জলাবদ্ধতা সংকট সমাধানের অযোগ্য কোন সমস্যা নয়। আসল সমস্যা হলো, দেশের ক্ষমতাসীন মহল এবং চট্টগ্রামের স্থানীয় রাজনীতির ঐক্যবদ্ধ ও পরিকল্পিত সমাধানের প্রয়াসের সীমাহীন ব্যর্থতা, সমন্বয়ের প্রকট অভাব এবং প্রকল্পের অর্থ নয়ছয় করার লজ্জাকর বাস্তবতা। চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনকে ড্রেনেজ সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে দিলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। তাই, চলমান মেগা-প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট অংশের বাস্তবায়নে সিটি কর্পোরেশনকে সম্পৃক্ত করা সময়ের দাবি। আমাদের প্রত্যাশা, এবারের মেগা-প্রকল্পটি আগামী বছর বর্ষার আগে যদি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সবচেয়ে জরুরি প্রকল্পগুলো সম্পন্ন করতে সমর্থ হয় তাহলে চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতার অনেকখানি নিরসন হবেই ইনশাআল্লাহ। আমরা অপেক্ষায় রইলাম।

লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসর,
অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

x