জয়ধ্বনি

নাজমুস সাকিব রহমান

মঙ্গলবার , ৭ আগস্ট, ২০১৮ at ৬:১৪ পূর্বাহ্ণ
20

একই সঙ্গে অল্পবয়সে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে একটা পাঠও হয়ে গেল। এখনকার পাঠ্যবই আর বাস্তবতা মেলালে এগুলো খুব কাজ দেবে। ইতিহাস সাক্ষী আছে, ‘সড়ক দুর্ঘটনা ও তার প্রতিকার’

এই রচনাটা আমরা পরীক্ষায় অনেকবার লিখেছি, কিন্তু সিরিয়াসলি নিইনি।

সব আন্দোলনেরই শেষ আছে। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনেরও শেষ হবে। তবুও ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থীদের ধন্যবাদ রাস্তায় সবার ক্লাস নেয়ার জন্যে। ধন্যবাদ তাদের শিক্ষক ও অভিভাবকদের।

২৯ জুলাই ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থীদের জয়ধ্বনি শোনা গেলো। যেই দেশ স্বাধীনতার সাতচল্লিশ বছরে এসেও রাস্তায় একটা ইমার্জেন্সি লেন করে দেখাতে পারেনি, শুধু বড় বড় কথা বলেছে, সেখানে তা দেখা গেল। রীতিমত অসম্ভব ব্যাপার। স্কুলকলেজের শিক্ষার্থীদের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। হতে পারে কয়েক মুহূর্তের জন্য, কিন্তু তাও বা কম কী। দেশের মানুষ বিস্মিত হয়ে দেখেছে এই দৃশ্য। এমন বাংলাদেশ আগে কখনো দেখা যায় নি। কেউ কেউ ভেবেছে হয়তো। কিন্তু স্কুলকলেজের শিক্ষার্থীরা তথাকথিত ‘ভবিষ্যৎ’ থেকে ‘বর্তমান’ হয়ে যাওয়ায় দেখা গেল।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, দাবি সবার সামনে বেশ কিছু ব্যাপার স্পষ্ট করে দিয়েছে। আমরা জানতে পারলাম : এ দেশের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদের গাড়ি ভুল লেনে চলে। আবার যাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস এসব দেখার কথা, তারা নিজেরাও সেসব রাখার প্রয়োজন বোধ করে না। যাত্রী কিংবা পথচারীদের প্রতি কর্তৃপক্ষের অবহেলার শেষ নেই। শিক্ষার্থীদের তুলে ধরা আয়নায় এইসব বিব্রত সুন্দর দৃশ্য উঠে এলো।

এগুলোর প্রয়োজন ছিল।

সড়ক দুর্ঘটনা কেন হয়, কী কারণে হয় তা সবাই জানে। জানার পরেও এই বারোমাসি মৃত্যুখাত রেখে দেয়া হয়েছে। কোনো মনোযোগ দেয়া হয় নি। এইরকম দুর্ঘটনায় আমরা অসাধারণ সব মানুষ হারিয়েছি। তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরদের পাশাপাশি আর একজনের নাম নেওয়া উচিত : ইমরান আহমেদ চৌধুরী মবিন। ‘উইনিং’ থেকে ‘ব্ল্যাক’ পর্যন্ত এত ভালো সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার বাংলাদেশ আর পায়নি। অবশ্য এই তালিকায় সাবেক মন্ত্রী থেকে জনগণ পর্যন্ত সবাই আছেন। এবার নিশ্চয়ই এই খাতের দিকে মনোযোগ দেয়া হবে। সহপাঠী হারানো শিক্ষার্থীরা জানিয়ে দিলেন, ট্যাকনিকাল কারণ ছাড়া আমরা নিজেরাও নিরাপদ সড়কের জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছি।

সব আন্দোলনেরই শেষ আছে। শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনেরও শেষ হবে। তবুও ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থীদের ধন্যবাদ রাস্তায় সবার ক্লাস নেয়ার জন্যে। ধন্যবাদ তাদের শিক্ষক ও অভিভাবকদের। এই আন্দোলনে এক অভিভাবককে দেখা গেলো, বাসা থেকে খাবার নিয়ে এসেছেন। ছেলেমেয়েরা নাখেয়ে আন্দোলন করছে। তিনি খাবার তুলে দিতেদিতে একজনকে বলছেন : ‘বাবা, সমুচা আরেকটা নাও. তোমার মুখ তো শুকিয়ে গেছে। নাখেলে আন্দোলন করবে কীভাবে?’ এইরকম সমর্থন অসামান্য ব্যাপার। অভিভাবকরা পেছনে এসে দাঁড়ানো মানেই শিক্ষার্থীরা ঠিক আছেন।

অনেকে অবশ্য শিক্ষার্থীদের ব্যানারপ্ল্যাকার্ডের ভাষা নিয়ে কথা বলছেন। আপত্তি জানিয়েছেন। এগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখার কিছু নেই। আন্দোলন নিজেই তার ভাষা ঠিক করে নেয়। তাছাড়া এই প্রজন্মকে বলা হয় মেমে (সবসব) প্রজন্ম। মেমে হচ্ছে অল্পতেই অনেক বলা। শিক্ষার্থীরাও বলেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যারা ধারণ করেন না, তাদের বিরুদ্ধে যেসব স্লোগান দেয়া হয়, তা নিয়ে কি আমরা কখনো প্রশ্ন তুলেছি? তুলিনি। কারণ, চাওয়ার ভাষা ভণিতাবিহীন হয়, সরাসরি হয়, ক্ষেত্রবিশেষে তির্যকও হয়। স্বতঃস্ফূর্ততার এই বৈশিষ্ট্যগুলো বাংলা সাহিত্যের লোকজন নিশ্চয়ই কাজে লাগাবে।

শিক্ষার্থীরা যেন এসব নিয়ে মন খারাপ নাকরেন। অল্পসময়েই তাদের অর্জন অনেক। প্রচুর জনসমর্থন, প্রধানমন্ত্রীর দাবি মেনে নেয়া, কর্তৃপক্ষের নড়েচড়ে বসা এসব তো জয়ধ্বনির ক্ষেত্রেই হয়। একই সঙ্গে অল্পবয়সে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে একটা পাঠও হয়ে গেল। এখনকার পাঠ্যবই আর বাস্তবতা মেলালে এগুলো খুব কাজে দেবে। ইতিহাস সাক্ষী আছে, ‘সড়ক দুর্ঘটনা ও তার প্রতিকার’ এই রচনাটা আমরা পরীক্ষায় অনেকবার লিখেছি, কিন্তু সিরিয়াসলি নিইনি। আপনাদের পরের প্রজন্ম খুব ভাগ্যবান, তারা পরীক্ষায় এই রচনা এলে নতুন আগস্টের কথা বলতে পারবে। আপনাদের গল্প লিখতে পারবে। কাজী নজরুল ইসলাম থেকে কোটেশন দিতে পারবে :

তোরা সব জয়ধ্বনি কর

ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখীর ঝড়

তোরা সব জয়ধ্বনি কর/…।’

আচ্ছা, আমরা কি এইবার আশা করতে পারি প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও যত আমলা আছেন, তারা গণপরিবহনে চড়বেন? কারণ, তারা যতদিন প্রাইভেট গাড়িতে চড়বেন, পৃথিবীর সবাই জানবে এই দেশের উন্নয়ন হয়নি। হাজার বিজ্ঞাপনেও কাজ হবে না। আর, দেশের গুরুত্বপূর্ণ লোকজন গণপরিবহনে নাচড়লে পরিবহনখাতে দুর্নীতি, যৌনহয়রানি, মানুষহত্যা, জ্যামট্যাম এসব চলতেই থাকবে। কমবয়সীদের তো নানাভাবে বোঝানো যায়, কিন্তু বড়রা বুঝবে কবে? নাকি একটা নিরাপদ বাংলাদেশের জন্য আরো অনেক জয়ধ্বনি দিতে হবে? সময় কিন্তু আবারো ইউনিফর্ম পরতে প্রস্তুত।

x