জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি

সোমবার , ৪ মার্চ, ২০১৯ at ৭:০৬ পূর্বাহ্ণ
67

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব সম্পন্ন বাণিজ্য নগরী। কিন্তু এই নগরীর অনেক সমস্যা। জলাবদ্ধতা তার মধ্যে একটি। সামান্য বৃষ্টিতেই নগরীর বহু এলাকা তলিয়ে যায় পানির নিচে। পানি কোথাও হাঁটুপরিমাণ, কোথাও কোমর পর্যন্ত। জলাবদ্ধতায় স্থবির হয়ে পড়ে নগরের জীবন যাত্রা। বৃষ্টি না থাকলেও জোয়ারের পানিতে সকাল-সন্ধ্যা ডুবে যাচ্ছে শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকা। জোয়ারের পানির সাথে নিত্য ব্যবহার্য পানি মিশে গিয়ে শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে বিশেষ করে হালিশহর ও আগ্রাবাদ এলাকার জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী আকার ধারণ করছে। বলা যায়, প্রায় সব খালেরই তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। হাতে গোনা রিটেইনিং ওয়াল দেয়া কয়েকটি ছাড়া অধিকাংশ কাঁচা খালের দুই পাশে অবৈধ দখলের কারণে দ্রুত জমে থাকা পানি নিষ্কাশিত হতে পারছেনা। জলাবদ্ধতার কারণে শহরের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো হচ্ছে প্রবর্তক মোড়, ষোলশহর, বাকলিয়া, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, জিইসি মোড়, চকবাজার, কাপাসগোলা, বাদুরতলা, চান্দগাঁও, পাঁচলাইশ, নাসিরাবাদ, আগ্রাবাদ, পতেঙ্গা, হালিশহর, ইত্যাদি। এছাড়া প্রতিবছরই শহরের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রাম শহরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান দুইটি ধারা হচ্ছে, মির্জা-নয়া-চাক্তাই ও নাসির-মহেশখাল ড্রেইনেজ সিস্টেম। এর সাথে বেশ কিছু সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি খালও সংযুক্ত। এছাড়া বেশ কয়েকটি স্বতন্ত্র খাল, হালদা, কর্ণফুলী এবং বঙ্গোপসাগরে মিশেছে। চাক্তাই খালের দু’পাশে রয়েছে ভোগ্যপণ্যের অন্যতম বৃহত্তম পাইকারী বাজার, চাক্তাই ও খাতুনগঞ্জ। খালের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে চোখে পড়ে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা ও মাটির স্তূপ। এছাড়া অনেক সংযোগ স্থলে শাখা-প্রশাখার তলদেশ চাক্তাই খালের চেয়ে নীচে হওয়ায় পানি নদী ও সমুুদ্রে নির্গমন হতে পারে না, ফলে আশেপাশের এলাকা প্লাবিত হয়। খালের গভীরতা মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় ছোটখাট নৌযানও চলাচল করতে পারে না।
চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে সরকারের পক্ষ থেকে প্রচেষ্টার কোনো কমতি নেই। বহুমুখী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। একের পর এক প্রকল্প গ্রহণ করে চট্টগ্রামবাসীকে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তি দেওয়ার প্রয়াস আমরা প্রত্যক্ষ করছি অবিরাম। চাক্তাই হতে কালুরঘাট রিং রোড প্রকল্পগুলোও নগরীকে অস্বাভাবিক জোয়ার, জলোচ্ছ্বাস ও জলাবদ্ধতা নিরসনে সরাসরি ভূমিকা রাখার জন্যই নেওয়া।
গত শনিবার চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন ও চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বিষয়ক মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, বর্ষায় চট্টগ্রামে আগের মতো জলাবদ্ধতা হবে না। চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন ও নগরকে দৃষ্টিনন্দন হিসেবে গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিক প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম মেয়র ও সিডিএ চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ্য করে বলেন, বর্ষার আগে অতি দ্রুত কোন্‌ কাজটা করতে হবে, সেটা চিহ্নিত করুন। প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা দেখতে চান না। আপদকালীন সমস্যা দ্রুত সমাধান করুন, যাতে বর্ষায় চট্টগ্রামের মানুষ দুর্ভোগে না পড়ে। চট্টগ্রামের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী যথেষ্ট আন্তরিক। মন্ত্রী জানান, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পসহ চট্টগ্রামকে একটি দৃষ্টিনন্দন নগরে পরিণত করতে সিটি করপোরেশন ও সিডিএ যাতে সমন্বিতভাবে কাজ করে সেই বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তাদের মধ্যে সমন্বয় আছে।

চসিক ও সিডিএকে উন্নয়ন কাজে সমন্বয়ের লক্ষ্যেএলজিআরডি মন্ত্রীর তাগিদ জরুরি ছিল বলে অনেকে মনে করেন। কেননা, বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলাবদ্ধতা সমস্যার মূলে রয়েছে নাগরিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতার অভাব। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষ কিংবা বিদেশি কনসাল্ট্যান্ট, কারো কাছেই এমন কোনো জাদুকরী শক্তি নেই যে চাইলেই পরদিন জলাবদ্ধতা দূর করে দেবেন। তাই প্রযুক্তিগত সমাধানের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে একজন সুনাগরিকের দায়িত্ব পালন করার জন্য জনগণকে সচেতন এবং উদ্বুুদ্ধ করতে হবে। মহল্লার সর্দার, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, সামাজিক সংগঠনগুলো এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে পারে। নালা-নর্দমা ও খালে যাতে কেউ আবর্জনা ফেলতে না পারে সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই হবে। জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ড কাউন্সিলের কার্যালয়গুলোকে সক্রিয় ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিককেও ভাবতে হবে।

x