জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে হবে

বুধবার , ১১ জুলাই, ২০১৮ at ৬:৫১ পূর্বাহ্ণ
41

আজ বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস। পরিবার পরিকল্পনা ও জনগণের উন্নয়নের অভিপ্রায় নিয়ে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও দিবসটি নানা কর্মসূচির মাধ্যমে উদযাপিত হবে। উল্লেখ্য, ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির গভর্নিং কাউন্সিল জনসংখ্যা ইস্যুতে গুরুত্ব প্রদান ও জরুরি মনোযোগ আকর্ষণের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী ১১ জুলাই বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৬.২৯ কোটি, যা ২০৩০ সালে ১৮.৫ কোটি এবং ২০৫০ সালে ২০.৩৩ কোটিতে রূপান্তরিত হতে পারে। বর্তমানে আমাদের মোট জনসংখ্যাকে যদি বয়স অনুসারে ভাগ করা হয়, তবে দেখা যায়, জন্ম থেকে ১৪ বছর বয়সী মোট জনসংখ্যার শতকরা ২৯.৪ ভাগ, ১৫৫৯ বছর বয়সী শতকরা ৬৩.৬ ভাগ, ৬০ ঊর্ধ্ব ৭ ভাগ এবং ৮০ ঊর্ধ্ব ০.৯ ভাগ। বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ অর্থাৎ প্রায় ১০ কোটি মানুষের বয়স ১৫ থেকে ৫৯ বছরের মধ্যে যারা অধিকাংশ কর্মক্ষম। আগামী ১৫ বছরে অর্থাৎ ২০৩০ সালের মধ্যে কর্মক্ষম ব্যক্তি আরও যোগ হবে প্রায় ৫ কোটি পক্ষান্তরে কর্মক্ষমতা হ্রাস পাবে প্রায় ৫০ লক্ষ ব্যক্তির। বিশ্লেষকদের মতে, আমাদের এই বিশাল কর্মক্ষম মানব সম্পদকে যদি সঠিক এবং পরিকল্পনা মাফিক ব্যবহার করা সম্ভব হয় তবে আমরা আমাদের জনসংখ্যাকে অভিশাপ না বলে আশীর্বাদ বলতে পারব।

বর্তমান সরকার জনসংখ্যাকে বোঝা হিসেবে না ভেবে সম্পদ হিসেবে নিয়েছে এবং সেই লক্ষ্যে কাজ করছে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অনেকেই বলে থাকেন আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা জনসংখ্যা। আমি বলি এটা কোনো উদ্বেগের ব্যাপার নয়। যদি তাদের শিক্ষা দিয়ে দক্ষ করে তৈরি করতে পারি তাহলে তারাই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তিনি বলেন, বর্তমানে নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা কমেছে। জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনই সরকারের মূল লক্ষ্য। তাই কারিগরি শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০৪০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় স্টুডেন্টের হার ৫০ শতাংশে করা বর্তমান সরকারের লক্ষ্য বলে জানান তিনি।

আমাদের মানব সম্পদের একটি বড় অংশই প্রবাসী। বর্তমানে প্রায় এক কোটিরও বেশি মানুষ বিভিন্ন দেশে কর্মরত আছে এবং মূল্যবান রেমিটেন্স পাঠানোর মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসাবে কাজ করছে। আবার এ কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, আমাদের প্রবাসীরা মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকার বিভিন্ন দেশে কর্মরত আছে যাদের অধিকাংশই অদক্ষ শ্রমিক হিসাবে কাজে নিয়োজিত। তাই দক্ষতার অভাবে আমাদের মানব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে না এবং আমরা রেমিটেন্সের পরিমাণও তুলনামূলক কম পাচ্ছি। এই জন্য মানব সম্পদের সঠিক এবং সর্বোচ্চ ব্যবহারের নিশ্চয়তার লক্ষ্যে আমাদের অধিক হারে দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে হবে এবং দক্ষ কর্মী প্রেরণের নতুন বাজার খুঁজতে হবে। নানা সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে জাপান, জার্মানি, ইংল্যান্ড, স্পেন, পর্তুগাল, ইতালি, আমেরিকাসহ প্রায় ৪৮টি উন্নত দেশের জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমতে থাকবে এবং এই সকল দেশে ৬০ ঊর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা ২০৩০ সালে ২৮% এবং ২০৫০ সালে ৩৪% হবে। ফলে এসব দেশে প্রচুর পরিমাণে দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন পড়বে। এটি আগামী ২০৩০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে সব থেকে বড় শ্রম বাজার হিসাবে বিবেচ্য হবে। ইউরোপসহ সকল উন্নত দেশসমূহের শ্রমবাজার ধরতে হলে এশিয়া এবং আফ্রিকার অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আমাদের মানব সম্পদকে শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। কেননা এশিয়া এবং আফ্রিকার অন্যান্য অনুন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোও টার্গেটকৃত শ্রমবাজার ধরতে চেষ্টা করবে। তাই আমাদের সেভাবেই দক্ষ কর্মী হিসাবে গড়ে তুলতে হবে।

দক্ষ জনশক্তিই একটি দেশ ও জাতির সামষ্টিক উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে সক্ষম। জ্ঞানভিত্তিক দক্ষতা ও প্রায়োগিক দক্ষতার সমন্বয়ে মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষাকে ঢেলে সাজাতে হবে। তাই কারিগরী শিক্ষাকে পর্যায়ক্রমে মূল ধারার শিক্ষায় সম্পৃক্ত করতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি দেশের জনসংখ্যা বোঝা নয়। সাড়ে ১৬ কোটি মানুষ আমাদের এক অমূল্য সম্পদ। দক্ষ মানবসম্পদের চেয়ে কোনো সম্পদই বড় নয়। জনশক্তিকে জনসম্পদে পরিণত করার জন্য বিজ্ঞান এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সমপ্রসারণ করা জরুরি।

x