কোরবানির ইতিহাস

আব্দুস সালাম

বুধবার , ৮ আগস্ট, ২০১৮ at ৭:৫১ পূর্বাহ্ণ
44

তোমরা অনেকেই জানো যে মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুটি। একটি ‘ঈদুল ফিতর’ অন্যটি ‘ঈদুল আযহা’। প্রতিবছর হিজরি সনের জিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখে ‘ঈদুল আযহা’ উদযাপন করা হয়। এই দিনটা শুধু আমাদের কাছেই না, মহান আল্লাহ্‌র কাছেও সেরা দিন। প্রিয় নবী (সাঃ) বলেছেন: আল্লাহ্‌র নিকট দিবসসমূহের মাঝে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন হলো কুরবানির দিন, তারপর পরবর্তী তিন দিন। কুরবানি এর অর্থ হলনৈকট্য অর্জন করা, কাছে আসা, জবাই করা, উৎসর্গ করা, শিকার করা। ইসলামি শরীয়তের পরিভাষায়, যে কাজের মাধ্যমে স্রষ্টার নৈকট্য অর্জন করা যায় তাকে কুরবানি বলা হয়। এছাড়াও নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট পন্থায়, নির্দিষ্ট পশু জবাই করাকে কুরবানি বলে।

আজ তোমাদেরকে কোরবানির ইতিহাস সম্পর্কে বলব। এটি প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগেকার ঘটনা। তোমরা জানো যে, মুসলিম জাতির পিতা নবী হযরত ইব্রাহীম (.)। তিনি ৮৬ বছর বয়সে পুত্র সন্তানের বাবা হন। তার নাম হযরত ইসমাঈল (.)। তিনিও পরবর্তীতে আল্লাহর নবী হয়েছিলেন। একদা হযরত ইব্রাহীম (.) স্বপ্নযোগে তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তুকে কুরবানি দেয়ার জন্য আদিষ্ট হন। এরপর তিনি পরপর ৩ দিন প্রতিদিন ১০০টি করে মোট ৩০০টি পশু (উট) কোরবানি করেন। কিন্তু তা আল্লাহর দরবারে কবুল হলো না। বারবারই তাকে স্বপ্নযোগে আদেশ করা হলো, ‘তোমার প্রিয়বস্তুকে কোরবানি কর।’ অবশেষে হযরত ইব্রাহীম (.) বুঝতে পারলেন যে তার কলিজার টুকরা হযরত ইসমাঈল (.)-ই হলো তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু। তাকেই মূলত কোরবানি করার জন্য আদেশ দেওয়া হচ্ছে। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) এর প্রতি এটা ছিল আল্লাহ’র পরীক্ষা। তখন ইসমাঈল (.) এর বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। বাবা তার পুত্রকে সব ঘটনা খুলে বলেন। তিনি আরও বলেনআমি স্বপ্নে দেখেছি যে তোমাকে জবাই করছি, এখন তোমার অভিমত কী? পুত্র বললো, হে পিতা! আপনি যা আদিষ্ট হয়েছেন তাই করুন। ইনশাআল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন।

তারপর কী হলো জানো? একদিন পিতা ও পুত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে কুরবানীর নির্দেশ পালনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। এ কাজ সমাধার জন্য তারা মিনা প্রান্তরে গমন করেন। তখন পুত্র ইসমাঈল আ. পিতা ইবরাহীম আ. কে বললেন আব্বাজান! আমার হাত পা খুব শক্ত করে বেঁধে নিন যাতে আমি নড়াচড়া করতে না পারি। আর আপনার পরিধেয় বস্ত্রাদি সামলে নিন, যাতে আমার রক্তের ছিটা না পড়ে। জবাহের পূর্বে আপনার ছুরিটি ভালোভাবে ধার দিয়ে নিন এবং আমার গলায় দ্রুত ছুরি চালাবেন, যাতে আমার প্রাণ সহজে বের হয়ে যায়। বাবা হযরত ইব্রাহীম (.) পুত্র হযরত ইসমাঈল (.)-কে কাত করে মাটিতে শুইয়ে দেন। একটি ধারাল ছুরি দিয়ে তাকে জবাই করার চেষ্টা করলেন। শত চেষ্টা করেও হযরত ইব্রাহীম (.) এর ধারালো ছুরি হযরত ইসমাঈল (.)-এর একটি পশমও কাটতে পারল না। সেই ছুরিটা এতটাই ধারাল ছিল যে হযরত ইব্রাহীম (.) যখন রাগে সেটি ছুড়ে ফেলেন তখন ছুরিটির আঘাতে একটি পাথরের খন্ড দুই টুকরা হয়ে যায়। অথচ সেই ছুরিটি হযরত ইসমাঈল (.)-এর একটি পশমও কাটতে পারেনি। এর ফলে পুত্র বাবাকে বললআপনি আপনার চোখ দুটো কাপড় দিয়ে বেঁধে দেন আর আমার মুখটি একটি কাপড় দিয়ে ঢেকে দেন। তাহলে দেখবেন আপনি সফল হয়েছেন। পুত্রের কথা শুনে বাবা তাই করলেন। চোখের পলকে আল্লাহর হুকুমে জিব্রাইল (.) বেহেশত থেকে জান্নাতি দুম্বা এনে হযরত ঈসমাইল (.)-কে সরিয়ে একই স্থানে ওই দুম্বাটি রেখে দেন। হযরত ইব্রাহীম (.) তার প্রাণ প্রিয় পুত্রের পরিবর্তে ওই দুম্বাটিই জবেহ করেন। ইব্রাহীম (.) চোখ খুলে দেখেন একটি দুম্বা কোরবানি হয়েছে। আর তার পাশেই ইসমাঈল (.) দাঁড়িয়ে আছেন। এভাবেই পিতা ও পুত্র অগ্নি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

পৃথিবীর বুকে এটাই ছিল স্রষ্টার প্রেমে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ কোরবানি। আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য নবী ইব্রাহীম (.) যে ত্যাগের সুমহান ও অনুপম দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন তা চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য আল্লাহ প্রিয় রাসুল হয়রত মুহাম্মদ (সাঃ) এর উম্মতের উপর পশু কোরবানী ওয়াজিব করে দিয়েছেন। তাই প্রতিবছর আমরা সবচেয়ে ভালো, স্বাস্থ্যবান ও বলিষ্ঠ চতুষ্পদ পশু কোরবানি করে থাকি। পশু কোরবানির মাধ্যমে মূলত : আমরা আমাদের মনের মধ্যে বিরাজমান পশুত্ব, ক্রোধ, লোভ, লালসা, পরনিন্দা, পরশ্রীকাতরতা ইত্যাদি রিপুগুলোকে পরিত্যাগ করি। কোরবানির শিক্ষা মুসলমাদের নিকট অপরিহার্য। পশু কোরবানির এ বিধান রোজ কেয়ামতের আগ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।

x