বদিউল আলম চৌধুরী : এক প্রতিবাদী পুরুষের প্রতিকৃতি

মুহাম্মদ নিযামুদ্দীন

বৃহস্পতিবার , ১০ অক্টোবর, ২০১৯ at ৫:২৩ পূর্বাহ্ণ
88

মানুষ ছিলেন এক, কিন্তু পরিচয় ছিলো তাঁর অনেক; তিনি ছিলেন বদিউল আলম চৌধুরী। কি ভাষা আন্দোলনে, কি স্বাধীনতা আন্দোলনে, কি স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে- সর্বক্ষেত্রে তিনি ছিলেন আপোষহীন এক আদর্শবাদী অগ্রসৈনিক। রাজনীতি ছিলো তাঁর রক্তের ভেতর। সে কারণে রাজনীতির সাথেও সম্পৃক্ত ছিলেন ওতপ্রোতভাবে। ভাষা হচ্ছে ভাবনার বাহন। পৃথিবীতে মানুষই একমাত্র প্রাণী, যে ভাষার মাধ্যমে নিজের ভাবনাকে প্রকাশ করতে পারে। যদি প্রকাশ করতে না পারতো, তাহলে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর মধ্যে পার্থক্য থাকতো না। এই যে ভাবনাকে রূপ দেয় যে ভাষা, তাতো মানুষের স্বপ্ন আশা ও ভালোবাসা। একজন মানুষ তো বেঁচে থাকে তার স্বপ্ন নিয়ে, আশা ও ভালোবাসা নিয়ে। এগুলো না থাকলে তো মানুষ মৃত। এগুলো বিবেচনায় রাখলে মানব জীবনে ভাষার গুরুত্ব যে কত বেশি, তা বলার বাকি রাখে না। প্রখ্যাত সাহিত্যিক অন্নদাশঙ্কর রায়‘প্রমথ চৌধুরীর মন’ শীর্ষক প্রবন্ধের একস্থানে লিখেছেন, ‘‘দেশকে স্বাধীন করার চেয়ে ভাষাকে স্বাধীন করা কম সাহসের কাজ নয়”। প্রমথ চৌধুরী প্রমুখরা বাংলা ভাষাকে সাধু ও সংস্কৃত থেকে সংস্কার ও স্বাধীন করার জন্য যে ‘সবুজ‘ সংগ্রাম করেছিলেন, সেদিকে লক্ষ্য করে তিনি কথাগুলো লিখেছিলেন। কথাগুলো বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটেও প্রযোজ্য। সে সময় সংস্কৃতের স্থান দখল করে নিয়েছিলো। কেবল দাপট দেখানোই নয়, দাফন করারও ব্যবস্থা করে ছিলো। বাংলার ছাত্র-জনতা সে সময় এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে বারুদের মতো গর্জে উঠেছিলেন, রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। সেদিন যদি তাঁরা এই ভূমিকা না নিতেন, তাহলে আমাদের ভাষার স্বাধীনতা ও ভৌগলিক স্বাধীনতা চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যেতো। সংগত কারণে ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রামী অধ্যায়। এই পর্ব প্রসঙ্গে কিছু পেশ বা প্রকাশ করতে গেলে প্রাসঙ্গিকভাবে প্রথমেই প্রবেশ করে তমদ্দুন মজলিশ নামক অরাজনৈতিক সংগঠনটির নাম বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র (পৃ. ৯১) একস্থানে লিখেছেন, ‘‘আমরা দেখলাম বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও তমদ্দুন মজলিশ এর প্রতিবাদ করল.. . ..। .. .. .. এই সময় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও তমদ্দুন মজলিশ যুক্তভাবে সর্বদলীয়ভাবে একটি রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে——। তখন চট্টগ্রামের কাট্টলীর বদিউল আলম চৌধুরী তমদ্দুন মজলিশের তরুণ তুর্কি হিসেবে সেই ভাষাসংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন।
বদিউল আলম চৌধুরীর এক সাক্ষাৎকার (মাসিক চাট্টগাঁ ডাইজেস্ট, ফেব্রুয়ারি ২০০০; সম্পাদক সিরাজুল করিম মানিক, পৃ. ৮) পাঠে জানা যায়-১৯৪৮ সালে চট্টগ্রামের কৈবল্য ধাম পাহাড়ে তমদ্দুন মজলিশ আয়োজিত কেন্দ্রীয় ক্যাম্পে যোগদানের মাধ্যমে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সংগঠনটির সাথে, এর নাবিকদের সাথে সহযাত্রী হওয়ার সুযোগ লাভ করেন তিনি। সেই ক্যাম্পের কথা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে চট্টগ্রামের আরেক ভাষা সৈনিক ডা. মোহাম্মদ আলী লিখেছেন, ‘‘আমার যদ্দুর মনে পড়ে সেই বছরের (১৯৪৮ সালে) শেষের দিকে চট্টগ্রামের কৈবল্যধাম আশ্রমের অনতি দূরে, তমদ্দুন মজলিশের প্রথম তাঁবুবাস কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এই কর্মসূচিতে মজলিশের কেন্দ্রীয় নেতা কর্মী ও চট্টগ্রামের নেতা-কর্মীরা অংশ নেয়। এই সুবাদে অধ্যাপক আবুল কাশেম, অধ্যাপক শাহেদ আলী, অধ্যাপক আবদুল গফুর এর সাথে প্রত্যক্ষ পরিচয় ও ভাই সম্পর্ক গড়ে উঠে।’’ (শাহেদ আলী স্মারকগ্রন্থ, ৬ ডিসেম্বর ২০০২, পৃ-৮১)। সেই ক্যাম্পসমূহে বদিউল আলম চৌধুরীর উজ্জ্বল উপস্থিতির কথা উল্লেখিত হয়েছে ভাষা-সৈনিক অধ্যাপক চৌধুরী শাহাবউদ্দীন আহমদ খালেদের স্মৃতিচারণেও। (দ্র. শাহেদ আলী স্মারকগ্রন্থ)। সে সম্পর্কিত এক স্মৃতিচারণে স্বয়ংপ্রবীণ ভাষা-সৈনিক অধ্যাপক আবদুল গফুর লিখেছেন, ‘‘বদিউল আলম চৌধুরীর কথা উঠলেই মনে পড়ে তমদ্দুন মজলিশের সেই প্রথম ক্যাম্পের কথা, যে ক্যাম্পে তাকে প্রথম দেখছিলাম। তখন মজলিশের শিক্ষা ক্যাম্পের নাম ছিল তাঁবু জীবন টেন্ট লাইফ)। আর টিমের সাথে ঠিক রেখে ক্যাম্পের জন্য ব্যবস্থা থাকতো একাধিক তাঁবুর।’’ (বদিউল আলম চৌধুরী স্মারক সংকলন, অক্টোবর ২০১৪, পৃ. ৩)।
বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় যে রক্তাক্ত ট্রেজেডি হয়, সে খবর পরদিন পৌঁছালে দাবানলের মতো দ্রোহের আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে দক্ষিণ বাংলা। বীর চট্টলার বীর সন্তান বদিউল আলম চৌধুরী ও সেই দ্রোহে সামিল হন। মোমিন রোড থেকে মিছিল করে লালদীঘি মাঠে যান এবং সেখানে সমাবেশ করেন। মিছিলের আগে পিছে ছিলো পুলিশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা তাদেরকে উৎসাহিত করেন। ডা. খাস্তগীর সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকেও একটি মিছিল বের হয় হালিমা বেগমের নেতৃত্বে। খুনি নুরুল আমিনের ফাঁসি চাই। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই- প্রভৃতি স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে চট্টগ্রাম শহর। এক কথায় মিছিল মিটিং এর শহর হয়ে উঠে চট্টগ্রাম। চট্টগ্রাম কলেজে তখন যে শহীদ মিনারটি নির্মিত হয়েছিলো, সেটির সাথেও সম্পৃক্ত ছিলেন বদিউল আলম চৌধুরী। তখন শহীদের মাগফিরাত কামনা করে শহীদ মিনারে ফাতেহা পাঠ করা হতো। (মাসিক চাটগাঁ ডাইজেস্ট ঐ) বাংলাভাষার প্রতি তাঁর ভালোবাসা যে কত প্রগাঢ় ছিলো, তা তাঁর দিনলিপি পাঠ করলেও জানা যায়। বদিউল আলম চৌধুরী এতে লিখেছেন, ‘‘এই দিন কেবল মায়ের ভাষা বাংলাকে চিরদিনের জন্যে যে কোন প্রকার অশুভ ষড়যন্ত্রের হাত থেকে রক্ষা করার একটি অজেয় প্রাচীর সৃষ্টি করেনি, এই দিন মাটি, মা ও মায়ের ভাষাকে এক নতুন দৃষ্টিকোণ ও উপলব্ধির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করেছে।’’ (বদিউল আলম চৌধুরী স্মারক সংকলন, পৃ. ৯৪)। চুয়ান্নতে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্টের যে নির্বাচন হয়েছিলো, তাতে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন বদিউল আলম চৌধুরীর চাচা মাহমুদুন্নবী চৌধুরী। সেই নির্বাচন নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ড. মুহাম্মদ ইব্রাহীম (নোভেল বিজয়ী ড. ইউনূসের ভাই) ‘‘ঘরে, স্কুলে আর বাইরে শীর্ষক তাঁর এক লেখায় লিখেছেন,‘‘যুক্তফ্রন্ট নিয়ে বেশ কিছু প্যাঁচ লেগেছিল সারা প্রদেশেই- এত শারিকের মধ্যে নমিনেশন ভাগ করে দিতে গিয়ে। এরকম একটি নমিনেশন সমস্যার আলোচনা বসায় শুনে শুনে, তাতে আমার কিছু আগ্রহ জন্মেছিল। —– শুনেছি নমিনেশন নিয়ে এই সমস্যা প্রায় ভাঙনের পর্যায়ে চলে গিয়েছিল, দুই দলের কেউ ছাড়বে না। শেষ পর্যন্ত হক সাহেব বুদ্ধি করে ব্যাপারটি ফয়সালা করায় পুরো এখতিয়ার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা সোহরাওয়ার্দীর ওপর দিয়ে দিয়েছিলেন। আর সোহরাওয়ার্দী ভাঙান ঠেকাতে নিজের দলের এম এ আজিজের বদলে নবী চৌধুরীকেই দিয়েছিলেন। .. .. .. যুক্তফ্রন্টের প্রতীক নৌকা আর মুসলিম লীগের হারিকেন সারা শহর ঢেকে গিয়েছিল। জনসভায় আশ-পাশে তো প্রতীকের মচ্ছব লেগে যেত। ছোট ছোট মিছিল আসতো বিশাল বিশাল প্রতীক সঙ্গো নিয়ে।” (বাংলাদেশ প্রতিদিন ঈদ সংখ্যা ২০১৫) ঐ নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছিলেন যুক্তফ্রন্ট প্রার্থী মাহমুদুরন্নবী চৌধুরী। তাঁর ঐ বিজয়ের পেছনে বদিউল আলম চৌধুরীর অবদান কতটুকু ছিলো, সে সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সন্দীপের এক সময়কার সাংসদ ও ভাষা সৈনিক এ.কে.এম. রফিকউল্লাহ্‌ চৌধুরী লিখেছেন, “মাহমুদুন্নবী চৌধুরী নিবার্চনে বদিউল আলম চৌধুরী যে অবদান রেখেছিলেন, তাঁর সহকর্মীরা বহুদিন পর্যন্ত তাঁর অবদানের কথা ভুলতে পারেনি। সেই নির্বাচনে বদিউল আলম চৌধুরী বিভিন্ন সভা ও পথসভায় যে উত্তেজনাপূর্ণ বক্তৃতা দিয়েছিলেন, তা এখনো আমার কানে বাজছে। উক্ত নির্বাচনে বদিউল আলম চৌধুরীর বড় ভাই মরহুম খোরশেদ আলম চৌধুরীর কথাও আমরা ভুলতে পারি না। এই দুই ভাইয়ের অক্লান্ত পরিশ্রম ছাড়া নবী চৌধুরীর সাফল্যের আশা একপ্রকার অসম্ভব ছিলো।”(বদিউল আলম চৌধুরী স্মারক সংকলন, পৃ. ৫-৬) বায়ান্নর রক্তরাঙা পথ ধরেই আসে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ঊনসত্তরে যখন গণআন্দোলন আরম্ভ হয় তখন বদিউল আলম চৌধুরী ছিলেন তমদ্দুন মজলিশের রাজনৈতিক শাখা খেলাফতে রব্বানী পার্টির চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক। তিনি উক্ত দায়িত্ব গ্রহণ করা পর গণমানুষের দাবির সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে গণ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় পার্টির চট্টগ্রাম অধিবেশন থেকে। সে কর্মসূচির সংবাদ ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ এর দৈনিক আজাদী, দৈনিক ইনসাফ প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। গণ অভ্যুত্থানের সময় গণ মিছিলে অংশগ্রহণ করার গৌরবও অর্জন করেন তিনি।(দ্র. ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ এর ‘ইস্টার্ন এঙামিনার’ ও দৈনিক আজাদী)। ঊনসত্তরের সেই উত্তাল সময়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামসুজ্জোহার নিহত হওয়ার পর পত্রিকায় প্রেস রিলিজ পাঠিয়ে প্রতিবাদ করেন তিনি। সেই প্রেস রিলিজে বাঙালিদের ওপর সরকারের দমননীতির কঠোর সমালোচনা এবং শেখ মুজিব সহ সকল রাজবন্দীর মুক্তি ও তাদের নামে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহারের দাবি করে। তাঁর এই বিবৃতি ঊনসত্তরের ২০ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদী, ইস্টার্ন এঙামিনার প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। দৈনিক আজাদী এর ৩ ফাল্গুন ১৩৭৫ সংখ্যায় খেলাফতে রববানী পার্টি চট্টগ্রাম শাখার দু’দিন ব্যাপী অনুষ্ঠিত সম্মেলনের সংবাদ ছাপা হয়। সম্মেলনে গৃহীত এক প্রস্তাবে দমননীতির তীব্র নিন্দা করা হয় এবং পার্টির সকল কর্মীকে ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সহিত সক্রিয় সহযোগিতা করার এবং সমাজবিরোধী কার্যকলাপ হইতে আন্দোলনকে দূরে রাখার চেষ্টা করতে আহবান জানান হয়। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব তখন পরবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হতে মনস্থ করেছিলেন। জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে তিনি তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন। এর প্রতিক্রিয়ায় পত্রিকায় প্রদত্ত এক বিবৃতিতে বদিউল আলম চৌধুরী বলেন, “সংগ্রামী জনতার আন্দোলনের ফলে প্রেসিডেন্ট আইয়ুব আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিবেন না বলিয়া ঘোষণা করিতে বাধ্য হওয়ায় জাতি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলিয়াছে।” (দৈনিক আজাদী, ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯)। এভাবে তিনি গণ অভ্যুত্থানের সময় গণমিছিলে যোগ দিয়ে, গণ আন্দোলনে শরীক হয়ে, পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে গণমানুষের দাবির পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ান। সেই দারুণ দুঃসময়ে তাঁর এই দৃঢ়তা প্রবল দেশ প্রেমেরই দৃষ্টান্ত বহন করে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্সে ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। তার পরদিন ৮ মার্চ বদিউল আলম চৌধুরী ‘স্বাধীন নয়াবাংলা’-র স্লোগান নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। তারপর তো স্বল্পদিন পরে সুচিত হয়ে যায় স্বাধীনতা যুদ্ধ। সেই সংকটময় সময়ে স্বদেশের স্বাধীনতার স্বপক্ষে তাঁর ভূমিকা ছিলো সে সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কবি জহুর-উশ-শহীদ এক স্মৃতিচারণায় লিখেছেন, “তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করেন। আন্দরকিল্লাহ সিটি কর্পোরেশনের সম্মুখে পুলিশ বিটের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বক্তব্য রাখেন এবং বিশাল এক মিছিলের নেতৃত্বে দেন। এই মিছিল তখন আন্দরকিল্লাহ থেকে শুরু হয়ে কোতোয়ালী মোড় পর্যন্ত গিয়ে শেষ হয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মহল্লায় মহল্লায় কমিটি গঠন করে পাক-হানাদার বাহিনীর হাত থেকে এলাকাবাসীকে রক্ষা করার জন্য প্রতিরোধ কমিটির নেতৃত্ব দেন তিনি। অবশ্য স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিপক্ষে এসব কাজ চালানো উচিত কিনা এ ব্যাপারে বিভিন্ন স্থানে রবুবিয়ত আন্দোলনের যে সব গোপন সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো, তার সবকটিতে তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। আর সামগ্রিক বিপর্যস্ত পরিস্থিতির পর্যালোচনা শেষে স্বাধীনতার পক্ষেই তিনি সবসময় অটল থাকেন।” (বদিউল আলম চৌধুরী স্মারক সংকলন, পৃ: ২৮-২৯)। মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন অপারেশনের পরিকল্পনা ও নকশা প্রণয়নে তিনি ইঞ্জিনিয়ার আজিজুর রহমানের নেতৃত্বে সহযোগিতা করে। শুধু তাই নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়দান সহ তাদেরকে খাবারও সরবরাহ করেন তাঁর স্ত্রীর সহযোগিতায়। মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা প্রদানের অপরাধে আলবদর বাহিনী একাত্তরের ১৪ ও ১৫ ডিসেম্বর তাকে ধরে নেওয়ার জন্য কয়েকবার চেষ্টা চালায় এবং ব্যর্থ হয়। (তথ্যঃ বদিউল আলম চৌধুরী স্মারক সংকলন, পৃ: ঢঠ) মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ডা: মাহফুজুর রহমান তাঁর বাঙালির জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম শীর্ষক বিশাল বইয়ের একস্থানে লিখেছেন “চট্টগ্রামে খেলাফতে রব্বানী পার্টি নেতা ছিলেন রফিকউল্লাহ চৌধুরী, সোলয়মান, এ এস এম মোজফফর, হারুনুর রশীদ খান, বদিউল আলম চৌধুরী (জেলা সম্পাদক) আজিজুর রহমান চৌধুরী, মনোয়ার আহমদ, জামাল উদ্দিন চৌধুরী, এস এম তোফাজ্জল আলী, কে এম আবদুল ওহাব চৌধুরী শাহাবুদ্দিন খালেদ, ডা মোহাম্মদ আলী প্রমুখ। দলটি ইসলাম পন্থী হলেও এ দলের এক অংশ হারুনুর রশীদ খান, বদিউল আলম চৌধুরী, আজিজুর রহমান চৌধুরী প্রমুখের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। (প্রথম প্রকাশ ঃ ১৯৯৩, চট্টগ্রাম)। বর্তমান রাজনীতি মানে সেখানে মন্দ ও মিথ্যার মহোৎসব সেখানে বদিউল আলম চৌধুরী ছিলেন সৎ ও সত্যে সমর্পিত সময়ের এক সাহসীয় সন্তান। রাজনীতি তাঁর রক্তের মধ্যে থাকলেও, রাজনীতিকে কখনো তিনি রক্তাক্ত করেন নি, রাজা বনতে চান নি, বরং এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কিভাবে সেবা করা যায়, সেটাই চেয়েছেন মনে প্রাণে। রাজনীতিতে তাঁর অভিযাত্রা আরম্ভ হয়েছিলো খেলাফতে রব্বানী পার্টিতে যোগদানের মধ্য দিয়ে। দীর্ঘদিন তিনি এই দলের চট্টগ্রাম শাখার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬২ সালের দিকে ডেমোক্রেটিক ওয়ার্কাস ফ্রন্টের সাথেও সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। এটি প্রতিষ্ঠার কথা লিখতে গিয়ে প্রবীণ আওয়ামীলীগ নেতা ও চারণ কবি বদন দীদারি লিখেছেন, “আজিজ মিয়া গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্য একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার নাম ছিল ডেমোক্র্যাটিক ওয়ার্কাস ফ্রন্ট। এটার প্রথম সভা হয়েছিল জেএমসেন হলে। সে মিটিংয়ে ব্যারিষ্টার সাইফুদ্দিন সিদ্দিকী, চেম্বার নেতা ইদ্রিস মিয়া, রফিক উল্লাহ চৌধুরী, নবী চৌধুরীর ভাইপো খোরশেদ আলম চৌধুরী ও বদিউল আলম চৌধুরী সহ আরো অনেক উপস্থিত ছিলেন। আমীর হোসেন দোভাষ উক্ত মিটিংয়ে সভাপতিত্ব করেছিলেন। রফিকউল্লাহ চৌধুরী ফ্রন্টের যুগ্ম আহবায়ক ছিলেন।”(জননেতা আমীর হোসেন দোভাষ স্মারকগ্রন্থ, সম্পাদক-নাসিরুদ্দিন চৌধুরী, প্রকাশকাল নভেম্বর ২০১৩, চট্টগ্রাম, পৃ.৬৭)। ১৯৭৬ সালে বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে ইসলামী ডেমোক্রেটিক লীগ গঠিত হলে তিনি ঐ দলের বৃহত্তর চট্টগ্রামের সহ-সভাপতি মনোনীত হন। তাছাড়া দলটির চট্টগ্রাম মহানগরীর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। ১৯৭৯ সালে সম্মিলিত বিরোধী দল ‘গণফ্রন্ট’- এর মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নিজ নির্বাচনী এলাকা থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেন তিনি। রাজনীতির পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষা, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান যেমন- জমিয়াতুল ফালাহর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, কাট্টলী নুরুল হক চৌধুরী উচ্চ বিদ্যালয়, মুসলিম এডুকেশন সোসাইটি উচ্চ বিদ্যালয়, সেন্ট প্লাসিড্‌স হাইস্কুল, কাট্টলী জাকেরুল উলুম মাদ্রাসা, মুসলিম এডুকেশন সোসাইটি, তমদ্দুন মজলিস, চট্টগ্রাম চাঁদ দেখা কমিটি, চট্টগ্রাম ঈদ জামাত কমিটি- প্রভৃতির সাথেও গভীরভাবে জড়িত ছিলেন।
বদিউল আলম চৌধুরী ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেন, কিন্তু সাম্প্রদায়িক সংকীর্ণতাকে সামান্যতম স্থানও দেন নি- কি ব্যাক্তিগত জীবনে, কি ব্যবহারিক জীবনে। মহান আল্লাহর ওপর অটল বিশ্বাস ও আনুগত্য এবং রসুল (সাঃ) এর আদর্শ ছিলো তাঁর চলার পথের পুঁজি বা পথেয়। ১৯৯৭ সালে পবিত্র হজ্জব্রত পালন করেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বহু বুজুর্গানে দ্বীনের স্নেহসান্নিধ্য ও দোয়া লাভে সিক্ত হয়েছিলেন; যাঁদের মধ্যে মওলানা ওলী আহমদ নিযামপুরী (র.) মওলানা, আবদুল গণি (র.) মাদার্শার শাহ সাহেব হুজুর খ্যাত শাহ ফজলুল করিম (র.)কুমিল্লার মামা খ্যাত হযরত আলী বাদশাহী (র.) প্রমুখ ছিলেন অন্যতম। তাঁর জন্ম ১৯ জানুয়ারি ১৯৩২ সালে- চট্টগ্রামের বিখ্যাত বনেদী বাড়ি কাট্টলীর নাজির বাড়িতে। পিতার নাম ওহিদুল আলম চৌধুরী এবং মায়ের নাম সুলতানা আরা বেগম। প্রখ্যাত জমিদার ফয়েজ আলী চৌধুরী ছিলেন তাঁর পিতামহ। ২০০৭ সালের ১০ই অক্টোবর (২৭শে রমজান) মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন তিনি। এখন আমাদের দরকার তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখার। চট্টগ্রামের মাননীয় মেয়র মহোদয়ের কাছে আমাদের আবেদন তাঁর নামে একটি সড়কের নামকরণ করে তাঁর স্মৃতিকে ধরে রাখা হোক।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক

x