পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনে সবাইকে অংশ নিতে হবে

মঙ্গলবার , ১১ জুন, ২০১৯ at ১০:২০ পূর্বাহ্ণ
31

৫ জুন ছিল বিশ্ব পরিবেশ দিবস। পরিবেশ দূষণের হাত থেকে এ বিশ্বকে বাঁচানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রতি বছর ৫ জুন দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এ বছর ঈদের ছুটিতে দিবসটি অতিবাহিত হয়েছে নীরবে। ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের মানবিক পরিবেশ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) উদ্যোগে প্রতিবছর সারা বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে এ দিবস পালন করা হয়।
বর্তমান সময়ে যদিও আমরা পরিবেশ সম্পর্কে অনেক সচেতন হয়েছি। তবু অনবরত পরিবেশের বিপর্যয়ের কাজ করে যাচ্ছি। পৃথিবীকে আমরা বসবাসের অযোগ্য করে তুলছি। নিজেরা যদি গাছ না লাগিয়ে শুধু আন্দোলন করি পরিবেশ বাঁচাও তাহলে কাজের কাজ হবে না। পরিবেশ রক্ষার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে মানুষের প্রকৃত বন্ধু গাছ। এজন্য আমরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে স্লোগান দিয়ে থাকি-‘গাছ লাগান, গাছের পরিচর্যা করুন, পরিবেশ রক্ষা করুন’। গাছ লাগানোর পর তা পরিচর্যা করতে হবে আর যে গাছ বর্তমান আছে, তা ধ্বংস করে পরিবেশ রক্ষা হবে? তাছাড়া যে গাছ প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নিয়ে আমাদের রক্ষা করার কাজ করে সে বুঝি পরিবেশের বাইরে? গাছ না লাগিয়ে আমরা গাছ কাটছি।
আমরা সবসময় পরিবেশকে দূষণ করে চলেছি। বিশ্ব ব্যাংকের একটা তথ্য আমাদেরকে নতুন করে ভাবতে তাগিদ দিচ্ছে।
বিশ্ব ব্যাংক বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর যতো মানুষের মৃত্যু হয় তার ২৮ শতাংশই মারা যায় পরিবেশ দূষণজনিত অসুখবিসুখের কারণে। কিন্তু সারা বিশ্বে এধরনের মৃত্যুর গড় মাত্র ১৬ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দূষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত তার একটি বাংলাদেশ। গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, ৭ থেকে ৮ প্রবৃদ্ধির একটি উচ্চতর মধ্যম আয়ের দেশ হয়ে উঠতে হলে বাংলাদেশকে এখনই, বিশেষ করে শহর এলাকায় দূষণ রোধ করতে ও পরিবেশ রক্ষায় ব্যবস্থা নিতে হবে।
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তুলনা করতে গিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পরিবেশ দূষণজনিত কারণে বাংলাদেশে যেখানে ২৮ শতাংশ মৃত্যু হয় সেখানে মালদ্বীপে এই হার ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। ভারতে ২৬ দশমিক ৫। পাকিস্তানে ২২ দশমিক ২। আফগানিস্তানে ২০ দশমিক ৬। শ্রীলঙ্কায় ১৩ দশমিক ৭।
বিশ্বব্যাংক বলছে, দূষণের কারণে বাংলাদেশের বছরে ৬৫০ কোটি ডলার ক্ষতি হয় – যা মোট জাতীয় উৎপাদন বা জিডিপির প্রায় সাড়ে তিন শতাংশ।
বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেছেন, “নগরাঞ্চলে দূষণ ও পরিবেশের অবনতি হওয়ার কারণে বাংলাদেশকে অনেক মূল্য দিতে হচ্ছে। এর ফলে দেশটির ভালো প্রবৃদ্ধিও এখন হুমকির মুখে।” এজন্যে বিশ্বব্যাংক জলাভূমি দখল, ক্ষতিকর বর্জ্য ঠিকমতো না ফেলা ইত্যাদিকে দায়ী করা হয়েছে। আর এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে নারী, শিশু এবং দরিদ্র মানুষের। বিশ্বব্যাংকের হিসেবে দেখা গেছে, যে গার্মেন্ট খাত থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে সেই খাত থেকেই প্রতি বছর ২৮ লাখ টনেরও বেশি বর্জ্য তৈরি হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় ১০ লাখ মানুষ, যাদের বেশিরভাগই দরিদ্র, সীসা দূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে। এর ফলে শিশুদের বুদ্ধির বিকাশসহ স্নায়ুু-জনিত ক্ষতি হতে পারে। গবেষণাটি বলছে, এর ফলে নারীর গর্ভপাত এবং মৃত শিশুর জন্মদানের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেতে পারে। অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে ছোট ছোট শহরগুলোও পরিবেশ দূষণের শিকার হচ্ছে।
যদিও জানি, সরকার পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় অত্যন্ত আন্তরিক। রূপকল্প ২০২১ এবং ২০৪১ বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছে। উন্নয়নের সকল ক্ষেত্রে পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বায়ু, পানি এবং মাটির দূষণ রোধে এরই মধ্যে নানা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমরা বন্যপ্রাণীকে ধ্বংস করে দিচ্ছি। গাছ না লাগিয়ে বন জঙ্গল কেটে ধ্বংস করছি যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ।
নিজে বাঁচো এবং প্রকৃতিকে বাঁচতে দাও- এ মানবিকতাকে নিয়ে প্রকৃতি রক্ষা করার লক্ষ্যে যা করণীয় তা করার জন্য প্রতিটি গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। কারণ প্রকৃতি বাঁচলে আমরা বাঁচব। তাই পরিবেশ, প্রতিবেশ, বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় সকলকে সচেষ্ট হতে হবে। নতুন প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে আমাদের কাজ করতে হবে।

x